২৪ আগস্ট ‘জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ’ দিবস। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিনকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ধর্ষণের পর হত্যা করে। এ ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সারাদেশে। সেই থেকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে।

আমাদের দেশে প্রতিদিন কত নারী যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তার সঠিক হিসাব না থাকলেও এটা নিশ্চিত যে, নারীর প্রতি নির্যাতন যেন বেড়েই চলছে প্রতিনিয়ত এবং ঘটছে সহিংস ঘটনা। নির্যাতনের শিকার অনেক নারী বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে এক বছরে নারী নিযাতন বেড়েছে ৭৪ শতাংশ এবং গণধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে শতকরা ১৪ ভাগ।

পুলিশের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ২০১০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ১৭ হাজার ৭৫। ২০১৫তে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ হাজার ২২০। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই নির্যাতনের পর পুনরায় মানহানি ও হয়রানির ভয়ে আর আগুতে চায় না। বিচার প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ।

বিভিন্ন আইন থাকা সত্ত্বেও নারী ঘরে বাইরে নিরাপদ হতে পারেনি। বন্ধ হয়নি নারী নির্যাতন। এসিড সন্ত্রাস, যৌন নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, ধর্ষণ বা এর চেষ্টা, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ ও পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, বিশ্বের ৩৫ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারীই আপন গৃহে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক ও ৫৩ শতাংশ অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার।

প্রতিবছর ২৪ আগস্ট নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু আদৌ নারী নির্যাতন কমেছে কি? কেন মেয়েদের ইভটিজিংয়ের কারণে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হচ্ছে? কেন স্বামীর পরকীয়ার কারণে নিষ্পাপ শিশুসন্তানসহ আত্মহত্যা করবে নারীরা? যৌতুকের কারণে প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। যৌতুক দিতে না পারায় নববধূর শরীরে কেরোসিন ঢেলে জ্বলন্ত দগ্ধ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী-পরিচালক এডভোকেট সালমা আলী টাইমনিউজবিডিকে বলেন,‍"আগে আমাদের দেশে নারী নির্যাতন আইন অনেক কম ছিল, এখন নারী নির্যাতন দমনে অনেক বড় বড় আইন হচ্ছে। তবে আসল সমস্যা হলো এই আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। শুধু বাংলাদেশই নয় পৃথিবীজুড়েই যেন বড় চ্যালেঞ্জ আইনের প্রয়োগ।"

এডভোকেট সালমা আরও বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হল পারিবারিক নির্যাতন একটা অপরাধ এটা আইন দ্বারা সনাক্ত করা হচ্ছে। অনেকের মাইন্ড-সেটআপ হয়ে গেছে যে আমার স্বামী আমাকে মারতে পারে। অবশ্য যে সকল মেয়েরা অর্থনীতিকভাবে স্বাবলম্বী তাদের অনেকেই প্রতিবাদ করে থাকেন।"
তিনি বলেন,"একটি আইন হলে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন তা হলো সরকারের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। কিন্তু বর্তমানে এটারই বড় অভাব। আমাদের সিস্টেমটা এত জটিল যেখানে যার লোকবল ও শক্তি বেশি সে ততো ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ভোক্তভোগী সাক্ষী সুরক্ষা না থাকায় এবং নারীবান্ধব

পরিবেশ থানা থেকে শুরু করে সব জাগায় নেই, ফলে মামলা করতে গেলে দ্বিতীয়বার হয়রানির শিকার হতে হয়। এজন্যই মেয়েরা মানসিকভাবে প্রস্তুত না এর প্রতিবাদ করার। সব মিলিয়ে আমাদের কমিউনিটি, পরিবার ও সরকারসহ কেউই সঠিকভাবে দায়-দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না অনেক ক্ষেত্রেই। তবে আমাদের প্রতিবাদ্য হ্ওয়া দরকার আমরা আমাদের ঘরে ও বাহিরে কোথাও নারী নির্যাতন হতে দিব না"।
সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু টাইমনিউজবিডিকে বলেন, "নারী নির্যাতন থেকে উত্তরনের উপায় হলো প্রশাসনকে দুর্ণীতিমুক্ত হতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন যাতে ক্ষমতা এবং অর্থের কাছে নত না হয়।"

প্রতিনিয়ত কেন নারীরা এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে? আমরা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো কতটা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে নারীদেরকে।

ইসলাম ধর্ম নারীদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে অন্য অনেক ধর্মের চেয়েই বেশি সোচ্চার বলেই মনে করেন অনেকেই। কারণ, অন্য অনেক ধর্মেই নারীরা নির্যাতিত, অবহেলিত, অপমাণিত, নিষ্পেসিত ও তুচ্ছ। জাহেলী যুগে যেমন নারীরা শুধুমাত্র ভোগের পাত্রই ছিল,কন্যা সন্তান জন্ম দেয়া মানে ঘরের মধ্যে বিশাল অংকের টাকা অপচয় করার পথ তৈরি করা, কন্যা সন্তান জন্ম দেয়া তারা অপমাণ মনে করত। তারা নারীদেরকে জীবন্ত মাটি কবরস্থ করতো। ঘোরের মধ্যে থাকা সেই জীবন্ত কন্যার ডাক তাদের অন্তরে বিন্দু মাত্র দয়ার স্থান পায়নি।
একইভাবে বর্তমান সমাজে চলছে জাহেলী যুগের মতো নারীরা নির্যাতিত, অবহেলিত, অপমাণিত ও নিষ্পেসিত হচ্ছে পদে পদে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা জাহেলী যুগকেও যেন হার মানায়।

অথচ রাসূল (সাঃ) বলেছেন : যার একটি কন্যা আছে সে একটি বেহেস্তের মালিক। অন্য হাদীসে তিনি আরো বলেন, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। কিন্তু নবী (সাঃ) এখানে পিতার কথা উল্লেখ করেননি। রাসূল (সাঃ) মাতা-পিতার অধিকার ঘোষণা করতে গিয়ে পিতার কথা একবার বলেছেন। আর মাতার কথা তিনবার বলেছেন। প্রকৃত পক্ষে নারী আমাদের সমাজের বোঝা এটা চিন্তা করা কোরআন-সুন্নাহর বিরোধী। আর যারা কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী হয় তারা মুসলমানদের মধ্যে শামিল হতে পারে না।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাযতকারী পুরুষ ও স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাযতকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী এদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। (সূরা আল আহযাব আয়াত নং ৩৫)

মহান আল্লাহ বলেন :হে মানব জাতি! তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রভুকে, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক আত্মা (আদম) হতে এবং যিনি তা থেকে আরো সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া (হাওয়া), আর যিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দুজন থেকে অনেক নর-নারী।(সূরা নিসা-আয়াত নং ১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন : যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে, হোক সে পুরুষ অথবা নারী এবং সে ঈমানদার হবে, এরূপ লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। (সূরা নিসা-আয়াত নং ১২৪)
আমরা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো কোন ধর্মেই খারাপ কাজের কথা বলা হয়নি। আমাদের সবার আগে যেটা প্রয়োজন তা হলো ছেলে মেয়ে সবাই নিজেদের ভিতরে ধর্মীয় অনুভুতি জাগ্রত করা।তাহলে নারী নির্যাতন থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যাবে।

উল্লেখ্য যে ইয়াসমিন হত্যার ঘটনায় তীব্র আন্দোলনের মুখে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ওই মামলার রায়ও হয়। আর ইয়াসমিন ট্রাজেডীর আট বছর পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওই রায় অনুসারে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এমবিএইচ