ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিনকে ধূমপানম্ক্তু করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ইতিমধ্যে তারা ঘোষণাও দিয়েছে, মধুর ক্যান্টিনে ধূমপান করা যাবে না। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তা পালন শুরু করেছে। আবার তাদের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও।

অন্যদিকে বিষয়টিতে ভিন্নমত পোষণ করেছে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় ধূমপান মুক্ত করে কোনো লাভ হবে না। এটাকে যদি বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে দেশব্যাপী করতে হবে। যুব সমাজের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হলে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এককভাবে কোনো কাজ সফল হতে পারে না।

ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর বৈরিতার কারণে আদৌ মধুর ক্যান্টিন ধূমপানমুক্ত হবে কি না, এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, অন্তত এমন একটি বিষয়ে বৈরিতা না দেখিয়ে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে অনেক ভালো হবে। এ ছাড়া পাবলিক প্লেসে ধূমপান রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনত দণ্ডনীয়।

রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী, ছাত্রলীগের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ সনের ১১নং আইনের ৪নং ধারার ১নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহণে ধূমপান করিতে পারিবেন না। ১নং ধারার ২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি উল্লিখিত বিধান লঙ্ঘন করিলে তিনি অনধিক তিনশত টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরণের অপরাধ সংঘটন করিলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দণ্ডের দ্বিগুণ হারে দণ্ডনীয় হইবেন।

২(চ) ধারা অনুযায়ী ‘পাবলিক প্লেস’ অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র (ইনডোর ওয়ার্কপ্লেস), হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, বিমানবন্দর ভবন, সমুদ্রবন্দর ভবন, নৌবন্দর ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্নিমাল ভবন, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণী ভবন, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহণে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোনো স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক, সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা, সময় সময় ঘোষিত অন্য যে কোনো বা সকল স্থান।

ছাত্রলীগের এমন মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি লিটন নন্দী বলেন, ‘আমরা মধুর ক্যান্টিনের বাইরে ধূমপান করি কিংবা ভেতরেও করি, এ নিয়ে আমাদের মাঝে কোনো কথা নেই। তারা (ছাত্রলীগ) তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটি তাদের ব্যাপার। আমাদের মাঝে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম সংগঠনের মেয়েরা প্রকাশ্যে ধূমপান করে ছাত্রলীগের এমন মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।

ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক প্রীতিলতা বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিন ধূমপান মুক্ত করা আহামরি কিছু না। এটার মাধ্যমে সাময়িক পরিবেশটা ঠিক রাখা যায়, এর বেশি কিছু নয়। এর মাধ্যমে কাউকে ধূমপান মুক্ত রাখা সম্ভব হবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব না করে সারা দেশে যুব সমাজ যে অপসংস্কৃতির সয়লাবে মেতে উঠেছে, সে বিষয়ে কিছু করা উচিত।’

ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন মাসুদ বলেন, ‘ছাত্রলীগ এমন সিদ্ধান্ত কবে নিয়েছে, সেটি আমি জানি না। তারা কিছু করার আগে অবশ্যই সবার সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। আর যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে তাহলে সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’

ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাতে রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং পরিবেশ সুন্দর রাখে সেজন্য আমাদের এ উদ্যোগ। আমাদের এমন সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষার্থীও যদি সেটি বাস্তবায়ন করে, তা আমাদের জন্য অনেক। তবে অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে বলে আমি আশা রাখি।’

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি সবার স্বার্থে। প্রগতিশীল অন্যান্য সংগঠনগুলোকে আমরা এর জন্য বাধ্য করব না। তবে তারা আমাদের এমন উদ্যোগের সঙ্গে সহমত পোষণ করে রাজনীতির সূতিকাগার মধুর ক্যান্টিনের পরিবেশ সুন্দর রাখবে বলে আমি আশা করি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও আমাদের এ উদ্যোগে সহযোগিতা করবে বলে আমার বিশ্বাস।’

মধুর ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী অরুন কুমার দে বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিন রাজনীতির সূতিকাগার। বাংলাদেশের সকল রাজনীতির উত্থান-পতন এখান থেকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে যুগে যুগে। আমি অতীতের ছাত্র রাজনীতিও দেখেছি, বর্তমানেও দেখছি। তবে সম্প্রতি ছাত্রলীগ ধূমপান বন্ধের ব্যাপারে যে উদ্যোগটি নিয়েছে, সেটি খুব ভালো উদ্যোগ। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের উচিত বিষয়টি কার্যকর করতে হলে সবার সঙ্গে একটু বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. এম আমজাদ আলী বলেন, ‘ছাত্রলীগের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের সকল পাবলিক প্লেসে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি ছাত্রলীগ তাদের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের সহযোগিতা চায়, সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রশাসন করবে।’

ইআর