বাংলাদেশের ৭৮ নাগরিকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি আছে বলে পুলিশ সদরদফতর সূত্রে জানা গেছে।  তাদের মধ্যে সবশেষ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যাকান্ডের পর মানবপাচারকারীদের ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তারে রেড নোটিশ জারি করেছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।  এর মধ্যে দুইজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

মোস্ট ওয়ান্টেড ৭৮ জনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত পলাতকদের নামও আছে। আছে বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার আসামি নূর চৌধুরী, খন্দকার আব্দুর রশীদ, নাজমুল আনসার, শরিফুল হক ডালিম, আহমেদ শরিফুল হোসেন, মোসলেম উদ্দিন, রাশেদ চৌধুরীর নাম আছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় পলাতক মাওলানা তাজউদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভির নাম। এছাড়াও মৃত্যুবরণ করা বিএনপি নেতা হারিস চৌধুরীর নাম এবং ছবিও ছিল এই তালিকায়। হারিস চৌধুরীর নাম ইন্টারপোলের তালিকা থেকে বাদ দিতে তার মৃত্যু নিশ্চিত হতে তন্ত চলছে। মানব পাচারকারী, হত্যা মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিসহ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা পলাতক তাদের নামেও রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।

প্রায় ২ দশক আগে সরকার রাজধানীর শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এদের মধ্যে ৮ জনকে ধরিয়ে দিতে ১ লাখ টাকা এবং ১৫ জনকে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও ১ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। গ্রেপ্তারের পর ৮ জন বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছে। এছাড়া ১৩ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিস জারি রয়েছে। এদের মধ্যে ১ জন জিসান দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে বলে খবর আসলেও ইন্টারপোল ডেস্ক থেকে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। অন্য ১২ জনকে ধরতে রেড নোটিস ঝুললেও আটকের ব্যাপারে নেই কোনো তৎপরতা। যদিও পলাতক অবস্থায় এদের অনেকে নানাভাবে তৎপর বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ রয়েছে। তবে দুই দশকে অপরাধ জগতে অনেক নতুন মুখ গজিয়ে দাপিয়ে বেড়ালেও হালনাগাদ হয়নি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা।

জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দুবাই আদালতের মাধ্যমে মুক্ত হওয়ার পর আর কোনো আপডেট তথ্য নেই পুলিশের কাছে। অন্যকোনো অপরাধীর ব্যাপারেও সন্তোষজনক কোনো খবর নেই। তবে ইন্টারপোল ওয়ারেন্টধারীদের কারো তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে জানায়। পরবর্তী সবকিছু হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্ব^র তখনকার সরকার শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে। এরা হচ্ছেন- ত্রিমতি সুব্রত বাইন, খোরশেদ আলম রাসু, মোল্লা মাসুদ, আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস, আরমান, হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, কালা জাহাঙ্গীর, আব্দুল জব্বার মুন্না, শামীম আহম্মেদ ওরফে আগা শামীম, জাফর আহম্মেদ মানিক ওরফে মানিক, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেল, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, গোলাম রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর, মশিউর রহমান কচি, কামরুল হাসান হান্নান ওরফে পিচ্চি হান্নান, সানজিদুল ইসলাম ইমন, জিসান আহমেদ ওরফে মন্টি, মশিউর রহমান কচি, কামাল পাশা এবং আলাউদ্দিন। এদের মধ্যে পিচ্চি হান্নান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। গণপিটুনিতে নিহত হন আরেক সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন।

পুলিশের তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালে মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে। ২০০৯ সালের জুনে কাশিমপুর কারাগার-২ থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরই ওই সময় জেলগেটের সামনেই তাকে আবার গ্রেপ্তার করে গাজীপুর জয়দেবপুর থানা পুলিশ। ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্ব^র কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে গোপনে ভারতে পাড়ি জমায় বিকাশ। তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা জরিফ, আগারগাঁওয়ে জোড়া খুনসহ ৫টি হত্যা মামলাসহ ১৬টি মামলা রয়েছে। বিকাশের ভাই শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রকাশ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সপরিবারে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসবাস করছে।

আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয় ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছেন। কলকাতা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর তানভীর মুক্তি জেল থেকে পান। থাকেন কলকাতার বনগাঁও এলাকায়। জয়ের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। সানজিদুল ইসলাম ইমন রয়েছে কানাডায়। সেখানে তিনি মোবাইলের ব্যবসা করেন।  ২০০৫ সালের ৩ জুন ধানমন্ডি এলাকা থেকে আরমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। আরমান বড় মগবাজার এলাকার বাসিন্দা।

শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস কারাবন্দি আছেন। তার বিরুদ্ধে ৬টি হত্যাসহ ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিলার আব্বাস ঢাকার কাফরুল এলাকায় থাকতেন। অন্য শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে ঢাকা মহানগর পুলিশ ২০০৪ সালে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। টিটন হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এডভোকেট বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হয়। ২০০৪ সালের ২৬ জুন আশুলিয়ার বেরন গ্রামে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান নিহত হন।

২০০৩ সালের মার্চে হাতিরঝিল এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যার পর পালাতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয় সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন। শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর জীবিত না মৃত এ প্রশ্নের সদুত্তর নেই কারো কাছে। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ার ধুনট থানায়। পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জব্বার মুন্না ভারতে পালিয়ে আছেন। কামরুল হাসান হান্নান জার্মানি ও জাফর আহম্মেদ মানিক ওরফে মানিক ভারতের ত্রিপুরায় অবস্থান করছে। জব্বার মুন্নার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। ঢাকার রমনা থানার বাসিন্দা মোল্লা মাসুদ কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হয়ে কলকতায় আছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। শামীম আহমেদ কানাডায় আছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী কামাল পাশাকে তার বাবা মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে কৌশলে পুলিশে দিয়ে ধরিয়ে দেন। বর্তমানে ঢাকার কারাগারে আছেন তিনি।