আজ সাভারের আকাশটা যেন খুবই ভারি। যে কোন সময় আকাশ ঘন কাল হয়ে আসতে পারে বৃষ্টি। হয়তো ঘন কালো আকাশটাই আসতে পারে নেমে আমাদের মাঝে।

না বৃষ্টি তো হয় না। আজ তিন বছর হল বৃষ্টি হয় না। কিন্তু বৃষ্টি তো হওয়া দরকার। গন্ধটা যেন এখন অনেক বেশি লাগে নাকে। কিসের গন্ধ তা কি বলতে পারো? না তোমরা তো জানো না কিসের গন্ধ, জানার দরকারও নেই।

আমার নাম শহীদ। হ্যা আমি রানা প্লাজার ঘটনায় শহীদ। অনেককেই তো তোমরা শহীদ বলো, আমাকে শহীদ বলতে তোমাদের কোনো আপত্তি নেই তো। আমার নিজের নামটি এখন আর মনে পড়ে না।

আমাদের এখন আর কারো মনে পড়ে না। আজ অনেক দিন পর তোমাদের দেখলাম। গত তিন বছরে আমাদের নিয়ে রাজনীতি করেছে অনেকে কিন্তু আমাদের দেখতে এসেছো কয়বার, হয়তো বড় জোর তিনবার, হয়তো কেউ কেউ আরো কয়েকবার বেশি। আমার শরীরের গন্ধটা মনে হয় একটু বেশি পঁচা তাই না? তাই তো তোমরা আমাদের দেখতে আসো না।

আমার না এখানে থাকতে আর ভালো লাগে না। কেন জানো? আমি যেখানে থাকি এখানে আজ তিন বছর ধরে বৃষ্টি হয় না, এখানের মানুষগুলোর শরীর থেকে অনেক গন্ধ বের হয়, তাই এখানে থাকতে ভালো লাগে না। মানুষগুলো সারাক্ষণ শুধু চিৎকার চেচামেচি করে। এখানো থাকতে কারোই ভালো লাগে না। সবাই শুধু বের হওয়ার জন্য ছোটাছুটি করে। বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে।

সবাই না অনেক দিন ধরে না খেয়ে আছে। এখানে কোন খাবার নেই, পানি নেই, আছে শুধু হা হা কার। আর এখানে আছে শুধু গন্ধ।এখানে অনেক কষ্টে আছি। আমাদের কষ্টগুলো দূর না করে আমাদের নিয়ে কেনো সবাই রাজনীতি করে বুঝি না। কেনো আমরা গরীব বলে, গার্মেন্টস শ্রমিক বলে।

আমাদের কষ্টের কারণে কিন্তু দেশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু আমাদের তোমরা দাম দেও না কেনো। আমরা অশিক্ষিত বলে? কিন্তু আমরা তো কিছু পড়াশোনা জানি। যাই হোক আমরা কি এতোই খারাপ যে আমরা মরে পড়ে থাকবো, এরপর আমাদের লাশও পচেঁ যাবে এর পরও আমাদের হত্যার কোনো বিচার হবে না। এ কেমন বিচার তোমাদের দেশের।

একটা কথা বলি, আমার একদিন অনেক পিপাসা পেয়েছিল। তখন আমার অনেক মায়ের কথা মনে পড়েছিল। এখন যেমন শুধু তুমি আমার জন্য কাঁদো মা, আমার জন্য চিৎকার চেচামেচি। তখন আমি শুধু তোমাকে ডাকতাম। চিৎকার করে ডাকতাম মা। বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতাম।

আমার সাথে একটা মেয়ে ছিল, সে বলতো, জানেন আমার না সুন্দর একটা মেয়ে আছে। নাম হাসি। আমি তার দিকে তাকালেই শুধু হাসে। আমি এখন এখান থেকে যদি বের হতে না পারি তাহলে আমার মেয়েটার কি হবে ভাই। আমি তো কয়েকদিন না খেয়ে আছি কিন্তু আমার মেয়েটাকে আমি না খাওয়ালে তো ও খেতে চায় না, তাহলে ও কি না খেয়ে আছে এ কয়দিন।

আমি তখনও বেচেঁ ছিলাম। নিশ্বাষ নিতে খুব কষ্ট হতো তখন। অনেক দিন আটক তো, আলো বাতাস কিছুই আসে না। তাই হয়তো অক্সিজেন কমে গিয়েছিল। একদিন মনে হচ্ছিল আমার মাথার উপরে কে যেন ঠক ঠক করছিল। মনে হচ্ছিল মাথার উপরের ছাদে কেউ হাতুরি দিয়ে পেটাচ্ছিল। তখন অচেনা এক আশায় মনটা ভরে উঠছিল। মনে হয়েছিল হয়তো আমি বাঁচবো।

এরপর একদিন গেল, দুই দিন গেল, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ একদিন মনে হচ্ছিল কিসে যেন ভন ভন আওয়াজ হচ্ছে, এরপরই একটা আগুনের ফুলকি দেখলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। আমার শরীর টা যেন জ্বলে পুরে ছাই হয়ে গেল।

আমাকে কিন্তু তোমরা বাঁচাতে পারতে, আমার মত অনেককেই বাঁচাতে পারতে। যদি একটু বেশি আন্তরিক হতে। তোমরা অনেক শিক্ষিত। তোমরা কি জানতে না আটককৃত কোন স্থানের গ্যাস বিষাক্ত হয়ে যায়? এই গ্যাসগুলো আগুনের ছোয়া পেলে জ্বলে উঠে। আমরা তো গার্মেন্টসের কর্মী, শিক্ষিত না, আমরা তো এসব জানি না কিন্তু তোমরা তো জানো। তোমরা এতো কিছু জানার পরও কেন এমন করলে। আমাদেরও তো বাঁচার আকুতি ছিল। আমরা তো অনেক কষ্ট করে চেয়েছিলাম বাঁচতে।

তোমরা তো দেখেছো শ্রমিক ভাই-বোনদের অনেকেই তাদের একটি হাত বা পা কিংবা দুই পা ই আমাদের কাছে রেখে তোমাদের কাছে চলে গেছে। আমরাও তো তোমাদের পৃথিবীতে বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমরা তা দিলে না। বরং আমাদের লাশটাকেও তোমরা না বের করে মাটি চাপা দিয়ে দিলে। একবারও চিন্তা করলে না এই পচাঁ লাশের গন্ধের মধ্যে আমরা থাকবো কি করে।

তোমরা আমাকে বাঁচাতে না পারলেও হয়তো লাশটা আমার মায়ের কাছে পৌছে দিতে পারতে। কিন্তু তোমরা তা করোনি। আমাকে এই গন্ধ স্তুপের মাঝেই রেখে আমাদের বাবা-মা কে এখনো কাদাচ্ছো।
এখনও মাঝে মাঝে দেখি অনেক নেতার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার ছবি দেয়ালে ঝুলছে। কিসের ছবি জানো? আমাদের জন্য সাহায্য দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে টাকার চেক তুলে দেয়ার ছবি।

আমাদের পরিবারগুলো অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আয়-রুজি নেই তাই বাজার খরচও নেই। কিন্তু আবার আমাদের নামে আসা সাহায্যের টাকাও তোমরা মেরে খেয়েছো কেনো। এই টাকাগুলো আমাদের পরিবারকে দিরে কি তোমাদের খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত। কাজটা কিন্তু তোমরা ঠিক করো নি।

তোমরা সবাই আমার পর কিন্তু আমার মা আমার পর না। তাই তো তোমরা সবাই দেখো ২৪ এপ্রিল হলে আমার মা সাভার বাস স্ট্যান্ডের কাছে এসে আমাকে খুজতে থাকে। আর তোমরা আমার মায়ের কথা নিয়ে তোমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করো। আমার কথা মনে করে আমার মা অঝোরে কান্না করে, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে, আর তোমরা আমার মায়ের সেই অবস্থার ছবি তুলে সবাইকে দেখাও।

তোমার আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছো। আমরা সবাই আশা করি তোমরা আমাদের মা-বাবা, স্ত্রী সন্তানদের দেখবে। তারা সবাই যেন ভাল ভাবে থাকতে পারে, তোমরা সেই ব্যবস্থা করবে। আর আমাদের হত্যার জন্য যারা দায়ী তাদের কি কিছু হবে না? যারা আমাদের ঘটনার জন্য দায়ী তাদের বিচার অবশ্যই দ্রুত করবে তাহলে আমাদের আত্মা শান্তি পাবে, শান্ত হবে বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রমিকের আত্মা।

আমরা যেখানে আছি এই দালানটা কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়নি। এই দালানটা ঠিক মতো বানানো হয়নি। আমি চেয়েছিলাম সামনের মাসেই এখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিতে, আমার মা ও বলেছিল। কিন্তু সময় একটু দ্রুত চলে আসলো।

যাই হোক আমাদের নামে স্মৃতি স্তম্ভ বানিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা এখন কি চাই জানো শুধুই এক ঝাক বৃষ্টি। ন্যায় বিচারের বৃষ্টি, যে বৃষ্টিতে আমাদের পচাঁ লাশের গন্ধের সাথে ভেসে যাবে সোহেল রানার মত নিকৃষ্ট ব্যক্তিরা। এতে ঠান্ডা হবে আমাদের অশান্ত আত্ম। আমরা ধুকে ধুকে মরি, আর তোমরা এখনো বেঁচে আছ ভাল ভাবে তা তো হতে পারে না।

এখন খুব জোরে একটা ঝরো বৃষ্টি হওয়া দরকার যাতে আমাদের নিয়ে যারা রাজনীতি করে, যারা আমাদের টাকা মেরে খায়, যারা আমাদের নামে বক্তৃতা করে পেট চালায়, যারা আমাদের খাটিয়ে গাড়িতে চরে বেড়ায় তারা যেস ধুয়ে মুছে নিশ্বেষ হয়ে যায়।

ইআর