এরমধ্যে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে সারা দেশে গায়েবি মামলা ও গ্রেপ্তার এবং পুলিশের গুলিতে নেতা কর্মী নিহতের বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বিএনপি। আইজিপির কাছে ১৬৯ মামলায় ৬ হাজার ৭২৩ জনের তালিকা দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শাসকগোষ্ঠী বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও কারান্তরীণের পাশাপাশি বিরামহীন দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে।
জানা গেছে, গত ৩০ নভেম্বর আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে ভিড় করেন বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। জামিন নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, মিথ্যা বানোয়াট ও গায়েবি মামলায় তাদের আসামি করে মামলার নামে হয়রানি করা হয়েছে। কারো কারো দাবি, যে মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছে, সে মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না। শুধু প্রতিহিংসার জেরে তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী রোকনুজ্জামান সুজা বলেন, মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় ১৮৭ জনকে ও অজ্ঞাতনামা প্রায় ৫০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। সে মামলায় জামিনের জন্য আমরা আবেদন করেছি। এ প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত সময় সংবাদকে জানান, নাশকতার মতো গুরুতর অপরাধীদের আগাম জামিন দেয়া উচিত নয়। এমনকি আপিল বিভাগের যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে, সেই আলোকে এ ধরনের মামলায় আগাম জামিনের কোনো সুযোগও নেই।
এদিকে ঢাকায় বিএনপির সমাবেশের আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আবদুল্লাহ আল-মামুনের সঙ্গে দেখা করে ১৬৯টি ‘গায়েবী’ মামলার তালিকা দিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল আইজিপির দপ্তরে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি চিঠি পৌঁছে দেন, যেখানে এসব মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়। মহাসচিবের চিঠির সঙ্গে পুলিশ জানায়, ২২ অগাস্ট থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ১৬৯টি মামলার তালিকা দিয়েছে বিএনপির প্রতিনিধিদল।
এসব মামলায় ৬ হাজার ৭২৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ হাজার ৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৫৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে বিএনপির দাবি। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পর প্রতিনিধি দলের নেতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বাংলাদেশে যে গায়েবী মামলা হচ্ছে, প্রতিনিয়ত পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের লোকজন বোমা ফাটিয়ে আমাদের লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে, গ্রেপ্তার করছে, এর একটি স্মারকলিপি মহাসচিবের তরফ থেকে আমরা আইজিপিকে প্রদান করেছি।
সোমবার (৫ ডিসেম্বর) পৃথক দু‘টি মামলায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ভাঙচুর করার মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন তোফাজ্জল হোসেন এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। অন্যদিকে ২০২০ সালের রাজধানীর পল্টন থানার দায়ের করা নাশকতার অভিযোগের মামলায় বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তাদের বিরুদ্ধে পরোনায়া জারি করা হয়।
রিজভীর মামলায় আদালতের পেশকার আতিকুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার মামলাটির অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য দিন ঠিক ছিল। এদিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমীরসহ তিনজন হাজিরা দেন। রিজাভীসহ তিনজন আদালতে হাজির হননি। এজন্য বিচারক তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আগামী ২৯ মার্চ মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য দিন ঠিক করেন আদালত। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের কাজের অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি মিন্টু রোডের ইস্কাটন হয়ে মাতুয়াইলের দিকে যাচ্ছিল।
পথে কাকরাইলের বিজয়নগরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে ২০০-২৫০ জন লাঠি-সোটা নিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় গাড়ির চালক আয়নাল বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালে ফখরুলসহ নয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। চলতি বছরের ২ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিল থানার পৃথক দুই মামলায় রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর বাড্ডা থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। ২৫ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগ থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় রিজভী বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন মহানগর দায়রা জজ আদালত।
এছাড়া রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরী সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করে এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এ মামলায় গত ৬ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকা থেকে ইশরাক হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ওই দিন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শ্রমিক দলের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের পরই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওই দিন ইশরাকের আইনজীবী জামিন আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এ মামলায় জামিনে ছিলেন ইশরাক। গতকাল এ মামলায় ধার্য তারিখ ছিল। তিনি আদালতে হাজির না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন করেন।
শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচন বানচাল করার লক্ষ্যে আসামিরা একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপরীত পাশে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে গাড়িতে থাকা যাত্রীরা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা ইশরাকসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করেন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক আতাউর রহমান ভুইয়া।
গত ৪ ডিসেম্বর পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত অন্য দুই আসামি বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম নীরব ও নিপুণ রায় চৌধুরী।
গত ২৮ নভেম্বর জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে বিএনপির ৩০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলেন- জেলার মেলান্দহ পৌর বিএনপির সহসভাপতি আমিনুর রহমান রেনু (৫০), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. আজিজ (৪৫), পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব ফাহাদুজ্জামান নবীন (৩২), যুবদল কর্মী ছামিউল ইসলাম (২৬) এবং ছামিদুল ইসলাম (৩৫)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আতিকুল রহমান জানান, গোপন বৈঠকে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা চলছিল। এ সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় অধিকাংশরা পালিয়ে গেলেও ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় নাম উল্লেখ করে ৩০ জন ও অজ্ঞাত আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে বিশেষ ক্ষমতার আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পাবনার সাতটি উপজেলা ও থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে এক রাতে ১৮টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২০টি ককটেল জব্দ করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় জেলা ও উপজেলা বিএনপির ৬০০ নেতা-কর্মীকে আসামি করে ৭টি মামলা করা হয়েছে।
২২ নভেম্বর রাতে ও পরদিন বিকেলে মামলাগুলো দায়ের করা হয়। কোনো মামলায় পুলিশ আবার কোনো মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাদী হয়েছেন। তবে এসব মামলায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আর ককটেল বিস্ফোরণ, ককটেল উদ্ধার ও মামলাগুলোকে ‘সাজানো ও গায়েবি মামলা’ হিসেবে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা।
এন/ইউ/শো





