ভারতীয় পাসপোর্ট বাতিলের পর তিনি যে বাংলাদেশের নাগরিক তা প্রমাণ করতে হবে। এরপর প্রতারণার মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরি করে দুবাই যাওয়ার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। দুবাই পুলিশের হাতে আরাভ গ্রেফতার হলেও এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের পর তাকে কোন দেশে ফেরত পাঠানো যায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দী বিনিময় চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জেরে ভারতীয় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। আরাভ ভারতে কীভাবে ও কার সহযোগিতায় ভারতীয় পাসপোর্ট করেছে, দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা খতিয়ে দেখছে। ভারতে ফেরত পাঠানো হলেও ভারত-বাংলাদেশের বন্দীবিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফেরত আনা হবে। যদিও আরাভ খানের যাবতীয় তথ্যউপাত্ত ইন্টারপোলকে সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তারপরও অন্যান্য আসামীর ক্ষেত্রে ফেরত আনা যতটা সহজ আরাভের ক্ষেত্রে ততটা সহজ নাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতীয় দূতাবাসে পাঠানো চিঠিতে আরাভ খান বাংলাদেশের নাগরিক, এর সপক্ষে সব তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। জানানো হয়েছে ভারতীয় পাসপোর্ট বাতিলের অনুরোধ। চিঠিতে আরাভের বাংলাদেশী জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, তার মা-বাবার নাম এবং স্থায়ী ঠিকানা দেয়ার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তা খুনসহ তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এমন অবস্থায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হলেও, আরাভকে ফেরাতে তাকিয়ে থাকতে হবে ভারতের দিকে।
এদিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানিয়েছেন, পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান হত্যা মামলায় পলাতক আসামী রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই। তিনি বলেন, তাকে (আরাভ খান) কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যায় সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন আইজিপি। আইজিপি বলেন, আরাভ খানের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তাই নোটিশ জারি হলো।
তবে এখনো তাকে গ্রেফতারের কোনো খবর আমাদের কাছে আসেনি। রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান যেহেতু ভারতের নাগরিক এ ক্ষেত্রে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কোনো সমস্যা হবে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। এই মুহূর্তে পুরো বিষয়টি বলতে পারব না। ওয়ারেন্ট ছাড়া নেতা-কর্মীদের আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে গ্রেফতারের বিএনপির এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ওয়ারেন্ট ছাড়া কী কাউকে গ্রেফতার করা যায় না? পুলিশ যা করেছে আইন মেনেই করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দী বিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তবে এনসিবি ডেস্কের তথ্যানুসারে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির পর ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অন্তত ১৬ জনকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুজনকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এবং বাকি ছয়জনকে ইরান, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাতার এবং ওমান থেকে ফেরত পাঠানো হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে ফেরত আসা পলাতকদের বেশিরভাগই খুনের আসামী। বাংলাদেশ সরকার অভিযুক্ত লোকদের দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করার পর ইন্টারপোল কর্তৃক জারিকৃত সক্রিয় রেড নোটিশের সংখ্যা বর্তমানে ৬২ তে দাঁড়িয়েছে। তবে, রেড নোটিশ জারি করা সত্ত্বেও অনেক অভিযুক্তকে এখনও খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরাভ খানের দেশে ফেরানো নির্ভর করছে বাংলাদেশ, ভারত ও দুবাই সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক বা বোঝাপড়ার ওপর। তাকে দেশে ফেরাতে ভারতীয় পাসপোর্টও বাতিল করতে হবে। দুবাই সরকার আরাভ খানকে বাংলাদেশের কাছে দিতে রাজি হলে তাকে সেখানে গ্রেফতার করতে হবে। এরপর বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে ইস্যু করা ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে এই অপরাধীকে দেশে ফেরানো যাবে। বর্তমানে আরাভ খান দুবাই সরকারের নজরদারিতে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দুবাইয়ে আরাভ গ্রেফতার হলে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানো সম্ভব। যদি তার নামে ইস্যু করা ভারতীয় পাসপোর্ট বাতিল হয়, তাহলে ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজ হবে। এ জন্য প্রথমে আরাভারে ভারতীয় পাসপোর্ট বাতিলের কাজটি আগে করাতে হবে। আর সে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নিয়েছে বাংলাদেশ।





