ভালোবেসে মানুষ তাকে “ডাক্তার ভাই” বলে সম্বোধন করতেন। এই ডাকের মধ্যে কোন ভুল ছিল না; বরং এটাই যেন উপযুক্ত উপাধি ছিল তাকে দেয়ার মতো। নিজের মাতৃভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এসে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এক গ্রামের মানুষকে কয়েক দশক একনাগারে যিনি সেবা দিলেন, তাকে এমন উপাধি ছাড়া দারিদ্রপীড়িত গ্রামবাসীর আর কিইবা দেয়ার আছে? শৈশব থেকে লালিত মানবসেবায় উৎসর্গিত হওয়ার ব্রত পালনে নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দেয়ার নজীর বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।
এতক্ষণ ধরে যার কথা হচ্ছিল তিনি হলেন নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত ডাক্তার এরিক বেকার। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর ২০১৫) বেলা সোয়া দুইটায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনি চিরদিনের জন্য পারি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই ডাক্তার তার ৭৫ বছরের জীবনে প্রায় অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। নিজের প্রিয় মাতৃভূমি পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় ও সুন্দর দেশ নিউজিল্যান্ডের মায়া ত্যাগ করে, এমনকি সংসারের বাঁধনে না জড়িয়ে শুধুমাত্র গরীব মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে এভাবেই সারাটি জীবন কাটিয়ে দিলেন ডাক্তার বেকার।
বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি “পুলমোনারি হাইপারটেনশান (Pulmonary Hypertension)” রোগে ভুগছিলেন। শেষ পর্যন্ত এ রোগেই টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত গ্রামে নিজের স্থাপিত ক্লিনিক “কয়লাকুরি হেলথ কেয়ার সেন্টারে” শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ডাক্তার এরিক বেকার। মুহুর্তেই গ্রামের মানুষের মুখে মুখে শুধু একটি কথাই ছড়িয়ে পড়ে -“আমাদের ডাক্তার ভাই আর নেই”।

মৃত্যুর সময় ডাক্তার বাকের নিউজিল্যান্ডে তার মা, চার ভাই, দুই বোনকে রেখে যান। পাশাপাশি তাকে স্মরণ করতে ও তার জন্য ভালোবাসার অশ্রু বিসর্জনের জন্য তিনি রেখে যান টাঙ্গাইলের হাজার হাজার গরীব রোগীকে, যারা আর কোনদিন পাবেন না তাদের ডাক্তার ভাইয়ের নি:স্বার্থ সেবা।
ডাক্তার বেকারের মৃত্যুর সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার গ্রামবাসী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে জড়ো হন। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা উজাড় করে প্রিয় ডাক্তার ভাইয়ের মুখখানী একনজর দেখতে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলো। শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো গ্রামজুড়ে।
গ্রামের মানুষগুলো কেনই বা এমন করবেন না? গত তিন দশক ধরে টাঙ্গাইলের মধুপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এই প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করে গ্রামের মানুষগুলোকে প্রায় বিনে পয়সায় চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন ডাক্তার বেকার। ভিনদেশী অসহায় মানুষের সেবায় এমন ত্যাগের নজীর সত্যিই বিরল।
নিউজিল্যান্ডের এই ডাক্তার ১৯৮৩ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর ইউনিয়নে কয়লাকুরি গ্রামে স্থাপন করেছিলেন তার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি। এরপর থেকেই মৃত্যু অবদি তিনি বিরতিহীনভাবে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ দিয়েছেন গ্রামের গরীব মানুষগুলোকে।

তার এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের তিন কিলোমিটারের মধ্যে যারা বসবাস করতেন তাদের কাছে ডাক্তার বেকার চেকআপ বাবদ ফি নিতেন ৫ টাকা। আর তিন কিলোমিটারের বাইরে যাদের বসবাস তাদের কাছ থেকে নিতেন ১০ টাকা। চেকআপ শেষে রোগীদের মেডিকেল সেন্টার থেকে ওষুধ দেয়া হতো। ওষুধের দাম দিতে যারা সক্ষম হতেন তারা দাম দিতেন, বাকিদের বিনামূল্যেই ওষুধ দেয়া হতো।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালাতে ডাক্তার বেকারকে ব্যাক্তিগতভাবে অনেকেই অনুদান দিতেন। পাশাপাশি আমেরিকা, ইংল্যান্ডে নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে ডোনেশান নিতেন তিনি। এছাড়া নিজ দেশ নিউজিল্যান্ডে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ডোনেশান পেতেন ডাক্তার বেকার। আর সব কিছু তিনি উজাড় করে দিয়েছেন বাংলাদেশের গরীব মানুষের সেবায়।
ডাক্তার বেকার ছিলেন একেবারেই আত্মপ্রচারবিমুখ। তবুও মাঝে-মধ্যে তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। বিভিন্ন সময়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন তিনি এমন সেবার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিলেন? উত্তরে গরীবের “ডাক্তার ভাই” বেকার শুধু বলতেন, বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই খুব ভালো। শুধুমাত্র গরীব হওয়ার কারণে তারা চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন-এটা তো হতে পারে না। শুধুমাত্র সামান্য একটু চিকিৎসা সুবিধা দিতেই আমি এই দেশকে বেছে নিয়েছি বলেও বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ডাক্তার বেকার।

নিউজিল্যান্ডের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন ডাক্তার এরিক বেকার। তিনি নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে অবস্থিত ওটেগো মেডিকেল কলেজ (Otego Medical College) থেকে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন।
ডাক্তারি পাসের পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ভিয়েতনামে সরকার পরিচালিত একটি মেডিকেল টিমের সাথে কাজ করেন। এর পর তিনি অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডে গমন করেন এবং শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বেশ কিছু কোর্স সম্পন্ন করেন।
ডাক্তার এরিক বেকার ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে আগমন করেন এবং মেহেরপুরে খ্রিস্টান মিশনারীদের পরিচালিত একটি হাসপাতালে যোগ দেন। দুই বছর পর তিনি মির্জাপুরের কুমুদিনি হাসপাতালে যোগ দেন এবং সেখানে প্রায় ৮ মাস কাজ করেন।
এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি মধুপুর উপজেলার থানারবায়েদ এলাকায় চার্চ অব বাংলাদেশ পরিচালিত একটি ক্লিনিকে যোগ দেন। এখানে কাজ শুরুর পর পরই তিনি বুঝতে পারেন-প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই সাধারণ মানুষগুলোকে চিকিৎসা সেবা দিতে হলে তাকে অবশ্যই বাংলা ভাষা রপ্ত করতে হবে। এক বছরের মধ্যেই তিনি বাংলা ভাষা বুঝতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে অতি দ্রুত তিনি বাংলা ভাষায় সুন্দরভাবেই রোগীদের সাথে মতবিনিময় চালানোর মত দক্ষতা অর্জন করেন।
অবশেষে ১৯৯৬ সালে তিনি কয়লাকুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (Kailakuri Health Care Centre) স্থাপন করে নিজেকে পুরোপুরি মানবসেবায় সঁপে দেন। আর শেষ পর্যন্ত এখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন গরীবের “ডাক্তার ভাই”। এদেশের মাটি ও মানুষকে এতটাই ভালোবেসেছিলেন এই যে তার ইচ্ছে অনুযায়ী বাংলাদেশের ওই প্রত্যন্ত গ্রামেই তাকে সমাহিত করা হয়।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন বুঝতে পেরেছিলেন তার সময় ফুরিয়ে এসেছে, জীবন প্রদীপ নিভতে আর বেশি বাকি নেই, তখন ডাক্তার এরিক বেকার বলেছিলেন-তার পরে এই সেবা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি একজনকে খুঁজছেন। বড় আশা করে বলেছিলেন-তিনি অপেক্ষা করছেন কেউ এগিয়ে এসে তার কাজে শরীক হবেন এবং তার ওপর দায়িত্বের বোঝা অর্পণ করে তিনি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলবেন।
সময় চলে যায় আপন গতিতে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের ডাক্তারি ডিগ্রী নিয়ে বের হন এই দেশে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি ডাক্তার ভাইয়ের দিকে। এমনকি মৃত্যুর সময়ও তিনি দেখে যেতে পারলেন না নিজের পরবর্তী কান্ডারিকে। ভিনদেশী হয়েও ডাক্তার বাকের যা করলেন এদেশের অসহায় মানুষের জন্য, স্বদেশী কেউ কি সেই পথে হাটবেন?
কেবি





