প্রথমে হাইমচরের একটু ইতিহাস দিয়ে শুরু করি। লোকমুখে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার সাথে শরিয়তপুর জেলার গোসাইরহাট ও বরিশালের মুলাদী থানার সীমানা নির্ধারন নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য হেম বাবু নামে জনৈক দক্ষ সার্ভেয়ার নিয়োগ করা হয়।
দক্ষতার সাথে তিনিই এ সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করতে সক্ষম হলে তাঁর নামানুসারে এখানকার নামকরন হয় হাইমচর।
দশ বছর বা তারো কিছু সময় আগের কথা যদি বলি, এক সময় হাইমচরের প্রায় প্রতিটি পরিবারের ছিল ১২ কানি থেকে ১৬ কানি নিজস্ব জমি। আবার কারো কারো ছিল তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি। কিন্তু এসব পরিপূর্ণতার মাঝেও তখনকার সময়ে তাদের জীবনে বিরাজ করত প্রতিনিয়ত আতংক আর ভয়।

ছবি: ডা. শুভ ও কুতুব তারিক
শুধু তাই নয়, এমন আতংক আর ভয়ের সাথে তাদের সহ্য করতে হত অনেক অত্যাচার। মাথা পেতে নিতে হত অনেক অন্যায় আর অবিচার।
তবে সেই দিন আর এখন নেই। এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার ধরণ। যদিও খুব একটা সচ্ছলভাবে চলছেনা সংসার। তবুও এখন হাসিমূখেই অতিবাহিত হচ্ছে তাদের জীবন।
মুরশিদা বেগম (২৮) নামে মাঝিরঘাট এলাকার একজন গৃহিনীর সাথে কথা হয়। জানালেন তার পরিবারের সার্বিক অবস্থা। একমাত্র উপার্জন ব্যক্তি স্বামী হলেও সংসারের বিভিন্ন কাজে স্বামীকে সহযোগিতা করেন তিনি। সংসার কেমন চলছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, মোটামোটি চলে। প্রতিবার ভাল খাবার না হলেও দৈনিক ৩ বেলায় খাওয়া হয় তাদের।
তবে কিছুটা ঋনের বোঝা নিয়ে প্রায় থাকতে হয় বলে জানালেন এই গৃহিনী। ঋন কেন নেয়া হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, এসব ঋনের টাকা দিয়ে কৃষি কাজ করা হয়। তবে এখানে একটি বিষয় একটু ভাবিয়ে তুলতে পারে যে কাউকেই। বিভিন্ন সমিতি বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে নেয়া এসব ঋন পরিশোধ করতে হয় প্রতিমাসে ১০ শতাংশ (লভ্যাংশ) হারে।
ছবি: ডা. শুভ ও কুতুব তারিক
অর্থাৎ কেউ যদি এক বছরের জন্য ১০ হাজার টাকা ঋন নেয়, তাহলে তাকে বছর শেষে সেটা পরিশোধ করতে হবে অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা যোগ করে মোট ২২ হাজার টাকায়। যা এসব নিম্নবিত্তের মানুষের জন্য অনেক বেশি হয়ে যায়।
কথা হয় পন্ডিত সরকার (৫০) নামের এক বৃদ্ধের সাথে। যার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। কৃষি কাজ করে জীবন চলে তার পরিবারের। তবে নিজস্ব জমি না থাকায় বর্গা নিয়ে কৃষি কাজ করেন পন্ডিত সরকার।
কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে অনেকটা বিষন্ন মনে বললেন তার পরিবারের ঐতিহ্যের কথা। তিনি জানালেন, আজ থেকে ৭/৮ বছর আগে তার নিজস্ব জমি ছিল প্রায় ১৬ কানি। এসব জমি এখন কোথায় জিজ্ঞেস করলে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানালেন, নদী ভাঙ্গনের ফলে এসব জমি দিন দিন বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা।
শিতলক্ষি (৫০) নামের এক বৃদ্ধা জানালেন তার সংসারের বর্তমান অবস্থা। এ বৃদ্ধার জীবন চলে একটু ভিন্নভাবে। স্বামী পেশায় একজন মিস্ত্রি। দৈনিক ৫০০ টাকা আয় করেন তিনি। অনেকটা দিনে এনে দিনে খাওয়ার মতই।

ছবি: ডা. শুভ ও কুতুব তারিক
তবে এরই মাঝে স্বস্থি নিয়ে হাসিমূখে বললেন, “আমার কোন ধরণের ঋনের বোঝা নেই, আর তাই আমার স্বামী দিনে এনে দিনে খরচ করলেও আমরা শান্তিতে দিন পার করছি। ”
এবার কথা হয় শাহাবউদ্দীন গাজী (৩৩) নামে একজনের সাথে। তিনি জানালেন প্রায় এক যুগ আগের এ অঞ্চলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যায় আর অবিচারের কথা।
তিনি জানালেন, এক সময় বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে নিম্নবিত্ত লোকদের জমি দখল করত এখানকার প্রভাবশালীরা। যার মধ্যে একটি পন্থা হচ্ছে, টাকা ধার দিয়ে বিভিন্নভাবে নিম্নবিত্তদের বেড়াজালে আটকে ফেলা। আর এভাবেই এক সময় হাতিয়ে নিত জমি।
এখানেই শেষ নয়। এক সময় এখানকার ধনাঢ্যরা বিচারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করত নিম্নশ্রেনীর মানুষের সাথে। শত অন্যায় করেও টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যেত এসব ধনাঢ্যরা। আর অন্যদিকে সবকিছু জেনে বুঝেও এসব অন্যায় আর অবিচার মুখ বুঝে সহ্য করতে হত গরীবদের।
জলদস্যুরাও এক প্রকার প্রধান আতংক ছিল এখানকার জেলেদের জন্য। মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন দিতে হয়েছে অনেক জেলেকে। আর এসব কারণে নিঃস্ব হতে হয়েছে অনেক পরিবারকে।
মূলত আগেকার সময়ে এখানকার নিম্নশ্রেনীর মানুষেরা নিপীড়ন আর নির্যাতনে থাকলেও সেই দিন আর এখন নেই। এখন সব শ্রেণীর লোকেরা তাদের অধিকার আদায় করে নিতে পারছে। বলতে গেলে সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছে এখানে। ধনীদের মত প্রতি বেলায় ভাল খাবার খেতে না পারলেও মোটামোটি ৩ বেলা খেয়ে শান্তিতে দিন পার করছে তারা। আর অসহায়ত্ব ভুলে নতুন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে এ অঞ্চলের মানুষগুলো।
এমএনজে





