ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল রোহতগি দেশটির সুপ্রিম কোর্টকে সাফ জানালেন প্রত্যেকের বেডরুমে উঁকি মারা সরকারের কাজ নয়, আর উচিতও নয়।
পর্নোগ্রাফির ব্যাপক সয়লাভে দিশেহারা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সোমবার (১০ আগস্ট ২০১৫) শিশু পর্নোগ্রাফি বন্ধ প্রসঙ্গে শুনানীকালে আদালতের এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এমন সোজাসাপ্টা জবাব দিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
কোন রাখঢাক ছাড়াই তিনি স্পষ্ট জবাব দেন, শিশু পর্নোগ্রাফি বন্ধ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলেও সামগ্রিক পর্নের বিষয়ে তাদের করণীয় কিছু নেই। “পর্ন বন্ধের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বা সংসদে একটা বিতর্কের প্রয়োজন।”
এদিকে, রোহতগির এ দিনের মন্তব্যের অনেক আগেই পর্ন নিয়ে দেশ জুড়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রিটিদের অনেকেই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হন।
গত বছরে (২০১৪) শিশু পর্নোগ্রাফি এবং অন্য পর্ন ওয়েবসাইটগুলি বন্ধের জন্য জনস্বার্থে একটি মামলা করা হয়। ওই মামলায় দাবি করা হয়েছিল পর্নোগ্রাফি দেখে যেনম যৌন ইচ্ছা প্রবল হয়, তেমনই নিয়ন্ত্রণ করার বা ক্ষমতা প্রদর্শনের ইচ্ছাও জাগে। তার ফলে ধর্ষণের শিকার হতে হয় মহিলাদের।
'ইন্ডিয়ান পেনাল কোড'-এর বরাত দিয়ে সম্প্রতি আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি ২০ মিনিটে ভারতীয় একজন নারী ধর্ষণের শিকার হন। আর প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হন ৭২ জন নারী।
শুধু ধর্ষণ নয়, ভারতে নারী নির্যাতনের একটি সামগ্রিক চিত্রওতুলে ধরেছে ইন্ডিয়ান পেনাল কোড। নারী অপহরণ, যৌতুকের কারণে স্ত্রীকে নির্যাতন (শারীরিক ও মানসিক) ও হত্যা, ঈভটিজিং, যৌন হয়রানি এবং পাচারের মতো নারী নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয় রিপোর্টে।
এদিকে, ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। কেননা, এসব সহিংসতার খুব কম সংখ্যকই প্রশাসন জানতে পারে। ফলে, পেনাল কোড স্বীকার করে নিয়েছে, তাদের এ রিপোর্টে কেবলমাত্র পুলিশে রিপোর্ট হয়েছে এমন সব তথ্য নিয়েই করা হয়েছে। ফলে, বাস্তব চিত্র যে ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমনই পটভূমিতে গত ৩১ জুলাই (২০১৫) ভারতের টেলি-যোগাযাগ মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর (আইএসপি) মাধ্যমে ৮৫৭টি পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়া হয়।
তবে, মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন মোদি সরকার পর্নোপ্রেমীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইট ব্লক করার প্রশ্নে তাদের অবস্থান আমূল বদলে ফেলে।
সরকারের এমন পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই সোমবার (১০ আগস্ট ২০১৫) সুপ্রিম কোর্টে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়ে দিয়েছেন ‘প্রত্যেকের বেডরুমে উঁকি দেওয়াটা’ তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বা শিশু যৌনতা বিষয়ক পর্নো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও সরকার দাবি করেছে।
এদিকে, পর্নোগ্রাফিক সাইট দেখার ক্ষেত্রে কতটা বিধিনিষেধ থাকা উচিত বা আদৌ উচিত কি না, তা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই ভারতে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে।
দিল্লির রাস্তায় যুবক-যুবতীরা যেমন খোলাখুলি বলছেন, নিজের ঘরের ভেতর কে কী দেখছে তাতে নাক গলানো সরকারের কাজ নয়।
পর্নো নিষিদ্ধ করলেই যৌন হিংসা কমবে, এই যুক্তিও ধোপে টেঁকে না বলে অনেকে বলছেন। তা ছাড়া অনেক মেয়েও যে পর্নো দেখেন সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
এই তীব্র জনমতের চাপেই সরকার তাদের আগের অবস্থান থেকে পিছু হটেছে বলে ধারনা দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে আরও বলেন, পর্নো নিষিদ্ধ করা উচিত কি না তা নিয়ে সমাজে বা পার্লামেন্টে বৃহত্তর পরিসরে বিতর্ক দরকার।
কিন্তু সেই বিতর্কের আগে সরকারের পক্ষে যে প্রতিটি লোকের বেডরুমে গিয়ে নজরদারি করা সম্ভব নয়, সেটাও তিনি জানিয়ে দেন।
এদিকে, সরকার যে ভোল বদলাতে যাচ্ছে, এই ইঙ্গিত ছিল টেলিকম মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের কথাতেও। তার মন্ত্রণালয় এর আগে ওয়েবসাইটগুলো ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছিল।
মি. প্রসাদ সুপ্রিম কোর্টের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই দাবি করার চেষ্টা করেন, তাদের কথাতেই ওই নির্দেশ জারি করতে হয়েছিল – নইলে ``সরকার এমনিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পক্ষপাতী নয়।``

পর্নো নিষিদ্ধ করার দাবিতে মূল মামলাটি যিনি করেছিলেন, ইন্দোরের সেই আইনজীবী কমলেশ ভাসওয়ানি অবশ্য এখনও হাল ছাড়তে রাজি নন।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ভারতের আইন অনুযায়ী পর্নো দেখাটাই বেআইনি, তিনি সেই আইন প্রয়োগ করার দাবি জানাচ্ছেন মাত্র।
তাঁর যুক্তি, ``সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয়, না-খেলেও হয় – তার মানে এই নয় যে সিগারেট খেতে দিতে হবে।``
একইভাবে, পর্নোগ্রাফিতে হিংসার ছড়াছড়ি, কীভাবে গণধর্ষণ করা হয় সে সব দেখানো হচ্ছে এবং বাচ্চারাও দেখছে। হয়তো অন্য জায়গা থেকেও শিখছে, কিন্তু পর্নো তো নিষিদ্ধ করাই যায়।``
মি. ভাসওয়ানি আরও বলেন, ``ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭-এ ধারার নয় নম্বর রুলেই পর্নো সাইট ব্লক করার কথা আছে, আমি শুধু সেটা বলবৎ করার কথা বলছি। আমাদের দেশের নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্যই এটা দরকার।``

সমাজতাত্ত্বিক ও দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কমল মিত্র শেনয় অবশ্য মনে করছেন, ২১ শতকের ভারতের ছবির সঙ্গে পর্নো নিষিদ্ধ করার ছবিটা মোটেই খাপ খায় না।
তিনি শুধু এটাকে সরকারের অপরিণত ভাবনার ছাপ বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, একে চূড়ান্ত রক্ষণশীল ও পেছনে-তাকানো পদক্ষেপ বলেও বর্ণনা করছেন।
তার মতো অনেকেরই ধারণা, আপাতত পর্নো সাইট ব্লক করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেও সরকার অনলাইন কনটেন্টের ওপর নজরদারি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হবে না।
বস্তুত এই দায়িত্ব দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি বা সুশীল সমাজের কোনও প্রতিনিধির নেতৃত্বে একটি ওমবাডসম্যান গড়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলছে।
ভারতের বাস্তবতায় অনেকেই মনে করছেন, আকাশ সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ কুফল হারে হারে টের পাচ্ছে ভারত। ২০১৩ সালে ডিডব্লিউ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে নাবালিকা ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে লজ্জায় গোটা মানব জাতির মাথা হেঁট হবার পক্ষে যথেষ্ট। দেশটিতে গত ৬ বছরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিশুদের ওপর যৌন নিগ্রহের ঘটনা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
চলন্ত ট্রেনে গণধর্ষণ, বিদেশী পর্যটকদের দিনের পর দিন আটকিয়ে গণধর্ষণ, পথে ঘাটে নারীদের উত্যক্ত করা এবং ঈভটিজিংসহ নারী নির্যাতন এখন ভারতের জন্য একটি নিত্য নৈমত্তিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পর্নোগ্রাফি প্রেমীদের কাছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এমন নতি স্বীকারের পরিণতি কি হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কেবি





