হরতাল-অবরোধের মধ্যেই পর্যটক শূন্যতা নিয়ে শেষ হচ্ছে চলতি বছরের পর্যটন মৌসুম। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচনের দাবিতে দেশব্যাপী ২০ দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধের কারনে এ শিল্প বিপর্যস্ত হয়েছে। এতে যেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তেমনি ভ্রমণের আমেজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটকরা।
বাংলাদেশে অক্টোবর-মার্চ হল পর্যটনের পিক সময়।ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসকে পর্যটনের ভরা পর্যটন মৌসুম বলা হয়। আর বাকি মাস গুলোতে হোটেলগুলো প্রায় খালি থাকে (কিছু বিশেষ এলাকা বাদে)।

ডিসেম্বরের দিকে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, রাঙামাটি, বান্দরবান ও সিলেটসহ ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি এলাকাগুলোতে ব্যাপক লোক সমাগম ঘটে যা অকল্পনীয়। এসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় স্বপরিবারে লোকজন ভ্রমণে আসেন।
মনে পড়ে সেই স্মৃতি, পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে থেকেই দেখতাম আমার মার, বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর তৎপরতা। বিশেষ করে দাদা/নানা বাড়ী যাওয়া বা অন্যান্য মামা-খালাদের বাড়ীতে বেড়ানোর উৎসব। আমরাও অপেক্ষায় থাকতাম, কবে পরীক্ষা শেষ হবে আর কবে বেড়াতে যাবো। এই প্রচলনটা এখনো বিদ্যমান, তাইতো ডিসেম্বর-জানুয়ারী আমাদের এখানে মোটামুটি ভরা পর্যটন মওসুম।

এখনকার আধুনিক মা-বাবারা আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়ানোর চেয়ে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র গুলি বাচ্চাদের ঘুরে দেখাতেই বেশী আগ্রহী। আবার অনেক নতুন বিবাহিত দম্পতিরাও এই সময়টাকেই বেছে নেন মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের জন্য। আর তাইতো প্রতিটা পর্যটন কেন্দ্রেই থাকে উপচে পড়া ভীড়। কিন্তু হঠাৎ লাগাতার হরতালের জন্য মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়ছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি হোটেলগুলোতে কর্মরত লোকজন অনেকটা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পড়ে অসহায় দিনযাপন করছেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা যায়, বিগত মৌসুমে শত শত কোটি টাকা আয় হলেও উল্টো এবার লোকসানের মধ্যে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। লাগাতার অবরোধের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে কক্সবাজারভিত্তিক পর্যটন শিল্প।
পর্যটন এলাকার দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করতেও বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আবাসিক হোটেল মালিকরাও হয়েছেন ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি। কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থান ইনানি বিচ, দরিয়ানগর, হিমছড়ি ঝরনা, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরে এখন পর্যটকদের পদচারণা নেই বললেই চলে।
এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নাশকতার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রবাসীও দেশে আসছেন না। দেশের পর্যটন শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন এ শিল্পের ব্যবসায়ীরা। চলমান অস্থিরতায় এ খাতে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ক্ষতি হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্যুর অপারেটস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এর সভাপতি প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ বলেছেন, চলতি মৌসুমে পর্যটন শিল্পে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা কক্সবাজার, সুন্দরবন এবং চট্টগ্রাম পার্বত্যাঞ্চল ২০১৩ সালের পুরোটাই বলতে গেলে পর্যটকশূন্য ছিলো। এমনকি ২০১৪ সালের প্রথমেও পর্যটকদের উপস্থিতি দেখা যায়নি এসব এলাকায়।
পর্যটনসূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা গড়ে ৫০ লাখ। কিন্তু ২০১৩ সালে এ পর্যটকের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দেড় লাখে।
ফলস্বরূপ পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত ট্রান্সপোর্ট, হোটেল-রিসোর্টও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
২০১২ সালে পর্যটন খাতের উল্লেখযোগ্য সফলতার পর ২০১৩ সাল পর্যটনশিল্পের জন্য একটা ভালো সময় বলে আশা করেছিল সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এর পথরুদ্ধ করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত বছর প্রাণ হারিয়েছেন দুইশ’রও বেশি মানুষ, এছাড়া হাজারেরও বেশি লোক আহত হয়েছেন। এছাড়া পুরো দেশের মানুষ তো এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেই। মানুষ যেখানে জীবন নিয়েই সংশয়ে যেখানে ঘুরতে যাওয়া তো দূরের কথা। আর এর বড় শিকার হচ্ছে পর্যটন খাত।
সরকারকে এটা কোনো ভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে, পর্যটন খাত বাংলাদেশর বেসরকারি খাতে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। এবং পর্যায়ক্রমে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
পর্যটনসূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে মোট জিডিপির ৪.৩ শতাংশ এসেছে পর্যটন খাত থেকে, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩৯ হাজার চারশ ৮০ কোটি টাকা।
যা ২০১৩ সালে বেড়ে ৭.৫ শতাংশ হতে পারতো বলে ধারণা করা হয়েছিলো। ২০২৩ সাল নাগাদ গড়ে যা ৬.৮ শতাংশে দাঁড়াতো। টাকার অঙ্কে এটি প্রায় ৮১ হাজার নয়শ’ ৪০ কোটি টাকা।
২০১২ সালে পর্যটন খাত থেকে যে পরিমাণ টাকা এসেছে তার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি প্রায় ১৯ হাজার তিনশ’ কোটি টাকা এসেছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত থেকে। যা মোট জিডিপির ২.১ শতাংশ।
এছাড়া শুধুমাত্র ২০১২ সালেই পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত ছিলো ১২ লাখ ৮১ হাজার পাঁচশ’ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। যা মোট চাকরি খাতের ১.৮ শতাংশ।
আশা করা হয়েছিলো যা ২০১৩ সালে ৪.৪ হারে বৃদ্ধি পাবে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০২৩ সাল নাগাদ তা মোট চাকরি খাতের ১.৯ শতাংশ হবে।
পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর মোট সংখ্যা ১৭ লাখ ৮৫ হাজার হবে বলে ধারণা করা হয়েছিলো।
পর্যটনের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের এ উন্নয়ণের ধারা গত বছরের ধারাবাহিকতার ফল হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এ শিল্পের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং ট্রান্সপোর্ট সেক্টর ইতোমধ্যেই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি এ শিল্প আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেটাও প্রশ্নের বিষয়।
বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল থেকে প্রথম বেসরকারি উদ্দোগে পর্যট শিল্পের জন্ম হয়। নানা ঘাত প্রতিঘাত, চড়াই-উৎড়াই পার হয়ে কোনো ধরনের সরকারি সুযোগ সুবিধা ছাড়াই বলতে গেলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটে।
মূলত চারটা বিষয় বেসরকারি ভাবে পর্যটন শিল্পের এ বিকাশকে সফল করেছে বলা যায়। এগুলো হলো- আতিথেয়তার জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্ট, থাকার জন্য রিসোর্ট, থিম পার্ক এবং যাতায়াতের জন্য ট্রান্সপোর্ট সুবিধা।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এবং বিভিন্ন ভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বিদেশি পর্যটকদের নজর কাড়ছে।
এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশে ভ্রমণ সম্পর্কে তারা আগ্রহ হারাবে। এতে করে বিশ্বের দরবারে আমরা যেমন ইমেজ সংকটে পড়ব, ঠিক তেমনি হারাবো বৈদেশিক মুদ্রাও।
এমকে





