“মা কখন আসবে? মা কেন আসছে না? মা না এলে আমি ভাত খাব না।” বারবার এইসব কথা বলছেন উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমা বেগমের অবুঝ মেয়ে তাসমিন।
গতকাল (২২ জুলাই) সারা দিন মায়ের অপেক্ষায় থেকে ৪ বছরের তাসমিন। তার বড় ভাই ১১ বছরের তাহসিন আল মাহিন অন্তত বুঝতে পারে, তাদের মা আর কোনো দিন ফিরবেন না। তবে বোনকে সান্ত্বনা দেওয়ার অবস্থা তার নেই। শোকে-দুঃখে সে নির্বাক। তাদের আত্মীয়দেরও একই অবস্থা।
গত শনিবার (২০ জুলাই) ঢাকার উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেধরা সন্দেহে তাদের মা তাসলিমা বেগমকে (৪০) গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।
রোববার (২১ জুলাই) লক্ষ্মীপুরের রায়পুরার সোনাপুর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাসলিমাকে দাফন করা হয়েছে। তাসমিন ও তাহসিন এখন সেখানেই নানির বাড়িতে আছে।
শিক্ষকেরা বলেছেন, গণপিটুনিতে নিরীহ ওই নারীকে হত্যার ঘটনা স্কুলের পরিবেশটাই বদলে দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি জায়গায় গুজবের কারণে মানুষ হত্যার ঘটনা তাঁরাও মেনে নিতে পারছেন না। আতঙ্কে স্কুলে আসছেন না অনেক শিক্ষার্থী। যারা ক্লাসে আসছে, তাদের মধ্যেও একধরনের ভয় কাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা বলছিলেন, সব শ্রেণি মিলিয়ে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭’শ। তাদের হইহুল্লোড়ে সারা দিন পরিবেশ মুখর থাকে। অথচ এখন সবাই চুপচাপ। কোনো কোনো ক্লাসে উপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেকের কম।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামে এখনো শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।
নিহতের ভাগনে নাসির উদ্দিন বলেন, “চার বছর বয়সী তাসমিনকে কিছু খাওয়ানো যাচ্ছে না। তার একই কথা, মা আসলে খাবে, মা কখন আসবে। আর তাহসিন মাকে দাফন করার পর থেকে চুপ করে আছে। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। ওদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছি না। বোঝাতে পারছি না মানুষ কেন মাঝে মাঝে এত নিষ্ঠুর হয়।”
এদিকে, গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগমকে হত্যার ঘটনায় রোববার (২১ জুলাই) রাতে চারজনকে গ্রেফতার করেছে বাড্ডা থানা-পুলিশ।
তাঁরা হলেন- মো. শাহীন (৩১), বাচ্চু মিয়া (২৮), শহিদুল ইসলাম (২১) ও জাফর হোসেন (১৮)।
বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক জানান, জাফর খিলগাঁওয়ের একটি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, অন্যরা উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজারের দোকানি ও কারখানার কর্মচারী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, বিভিন্নজনের মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁদের শনাক্ত করা হয়।
সোমবার সকালে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। জাফর হোসেন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ছেলেধরার কথা শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাসলিমাকে লাথি মেরেছেন এবং লাঠি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেছেন। শুনানি শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ অন্য তিনজনের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম হত্যার ঘটনায় মানববন্ধন করেছেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাসলিমা এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী।
সোমবার সকালে মহাখালীতে প্রতিষ্ঠানটির সামনের সড়কে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।
এমবি





