পবিত্র রমযান শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। খুশীর ঈদের আগমনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন সবাই। বিপনী-বিতানগুলোতে কেনা-কাটার ধুম লেগেই আছে। নাড়ির টানে অনেকেই ছুটছেন গ্রামের পথে। কেউ আবার পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ কাটাতে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশের মাটিতে।
কিন্তু ঈদ কি তা আজ ২৫ বছর ধরে ভুলে গেছেন হারুন-উর-রশীদ। রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১২ নম্বরের সি ব্লকের বাসিন্দা হারুন। দুই রুমের ছোট্ট বাসায় স্ত্রী নাজমা বেগমকে নিয়ে তার সংসার। বাসার কাছেই হারুনের ছোট্ট একটি ওষুধের দোকান ছিল। সারাদিনে যা আয় হতো তা দিয়েই সুন্দরভাবে চলছিল তার সংসার।
দেখতে দেখতে সংসারে আগমন ঘটে নতুন মেহমানের। ফুটফুটে ছেলে সন্তানের মুখ দেখে আনন্দে ভরে যায় হারুন-নাজমা দম্পতির মন। যেন দিনে দিনে সংসারটা সোনার সংসারে রুপান্তরিত হচ্ছিল। সুন্দর ছেলেটিকে আল্লাহ যেন সুন্দর একটি মন দেন সেই আশায় বুব বেঁধে ছেলের নাম রাখেন সুমন।
আজ থেকে ২৫ বছর আগের কথা বলছি। হারুন-নাজমা দম্পতির সাংসারিক জীবনের যাত্রাটি ছিল এমনই মধুময়। ছিল না বড় কোন চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। ভাগ্যে যা আছে তা সরানোর সাধ্য কার?
এবার আসা যাক ২৫ বছর পর হারুনের বর্তমান জীবনে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হারুনের পাশে নেই একমাত্র ছেলে সুমন, যাকে ঘিরে একসময় সোনালী জীবনের স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। নয় বছর বয়সেই ছোট্ট কিশোর সুমন চিরদিনের জন্য চলে যান মা-বাবাকে ছেড়ে। আর যাবার সময় নি:স্ব করে দিয়ে যান তাদেরকে। সেই ২০০১ সালের কথা। একমাত্র ছেলেকে হারানোর ব্যথা নিয়ে আজও ধুকে ধুকে দিন পার করছেন হারুন-নাজমা।
কোন স্বাভাবিক ঘটনায় মারা যায়নি সুমন। জন্মের পরই ধরা পড়ে ঘাতক ব্যাধী থ্যালাসেমিয়া। বিদেশে নিয়ে ছেলের চিকিৎসা দেয়ার সাধ্য ছিল না হারুনের। ছোট্ট ফার্মেসি দিয়ে কত টাকাই বা আয় তার? সাধ্য অনুযায়ী ধন-সম্পদ, জমি-জমা যা ছিল তার সব কিছু বিক্রি করে দীর্ঘ ৯টি বছর ধরে ছেলের চিকিৎসা চালিয়েছেন দেশের মাটিতে থেকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলেন না একমাত্র ছেলেকে। চিরদিনের জন্য তাদেরকে নি:স্ব করে দিয়ে ২০০১ সালে না ফেরার দেশে চলে যায় সুমন।

হারুনের জীবনের ট্রাজেডি এখানেই শেষ নয়। সুমনের জন্মের প্রায় দুই বছরের মাথায় এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক মেয়ে সন্তান। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ছেলের জন্য প্রতিনিয়ত বুকে জমাট বাঁধা ব্যথা কিছুটা ভোলার চেষ্টা করেন বাবা-মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এখানেও বিধি বাম। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মেয়ের শরীরেও বাসা বাঁধে থ্যালাসেমিয়ার জীবানু। যেন মরার ওপর খাড়ার ঘাঁ। এবার একসাথে চলতে থাকে ছেলে-মেয়ের চিকিৎসা।
শুধু ঢাকাতেই নয়, গ্রামের বাড়িতেও জায়গা-জমি যা ছিল সব কিছু বিক্রি করে দুই সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যায় হারুন। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি ছেলে সুমনকে। নয় বছরের মাথায় মরণ কেড়ে নেয় তাকে। তবে, সোমাকে এখনও ছিনিয়ে নিতে পারেনি মৃত্যু। সে এখন ২৩ বছরে পা দিয়েছে। চলছে কোন মতে চিকিৎসা। প্রহর গুনছে মৃত্যুর। বাবা-মাকে এত কষ্ট দিয়ে আর বেঁচে থাকতে তারও ভালো লাগছে না।
সত্যি অবাক লাগে! একটা মানুষের জীবনে আর কত বিপদ নেমে আসতে পারে। এরই মধ্যে বছর খানেক আগে স্ত্রী নাজমাকেই আবার পেয়ে বসে থ্যালাসেমিয়ায়। হারুন এখন তার সর্বশক্তি দিয়ে স্ত্রী ও মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবন তার কাছে এখন যেন এক ভারী পাথর। কোনদিন স্বপ্নেও হারুন ভাবেননি জীবন এমন বিষময় হতে পারে। কিন্তু কি আর করা- নিয়তির লিখন খন্ডানোর সাধ্য তো আর তার নেই।
.jpg)
একমাত্র ওষুধের দোকানটি অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। দুই রুমের বাসা ছেড়ে এখন থাকেন ছোট্ট একরুমের বাসায়। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইনজেকশন পুশ করে এবং রাতভর সিএনজি অটোরিক্সা চালিয়ে হারুন কোনমতে পার করছেন তার জীবন, চালিয়ে যাচ্ছেন জীবন যুদ্ধ।
গিয়েছিলাম হারুনের বাসায়। কথা হচ্ছিল সোমার সাথে। বেদেনা-বিদুর কণ্ঠে মেয়েটি বলছিল তার অনুভূতির কথা: “মরণব্যাধী থ্যালাসেমিয়া কেড়ে নিয়েছে আমার ভাইকে।মায়ের ওপরও চেপে বসেছে একই রোগ। দিন দিন আমার শরীরও হয়ে পড়ছে নিস্তেজ। হয়তো আর মাত্র কিছুদিন বাঁচবো। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে আমি মরে গেলে আমার বাবা-মা’র কী হবে?”
মেয়ের কথাগুলো যেন তীর হয়ে বিদ্ধ করছিল পাশেই বসা সোমার মাকে। কান্নাজড়িত কাঁপা গলায় পাশ থেকে বলছিলেন, এভাবে বলিস না মা। সবাইতো ভালোভাবে বাঁচতে চায়। আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা করি,তিনি যেন তোর বদলে আমাকেই নিয়ে যান। আর তার বিনিময়েতোকে সুস্থ করে দেন। এটা দুই বছর আগের কথা যখন এই প্রতিবেদক গিয়েছিল সোমাদের বাসায়। সম্ভবত মায়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। তাইতো বছর খানেক হলো সোমার মাও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু সোমা তো আর সুস্থ হচ্ছে না!
ছয় মাস বয়সে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হন সোমা। বয়স এখন ২৩ বছর। এত বছর ধরে এ জটিল রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে মেয়েটি। ডাক্তার বলছেন, বোনম্যারো অপারেশন করলে ভালো হয়ে উঠবে সোমা। কিন্তু তাতে খরচ হবে প্রায় ১৬ লাখ টাকা।

এরই মধ্যে সুমন ও সোমার চিকিৎসায় ধাপে ধাপে প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন পরিবারটিবলতে গেলেপুরোপুরি নিঃস্ব। এ অবস্থায় এতো টাকা কোনোভাবেই যোগাড় করতে পারছেন না তারা। তাই নিরুপায় হয়ে নিজের আসন্ন মৃত্যুকে মেনে নিতে হচ্ছে সোমাকে। এখন তার একটাই আশঙ্কা, এ মরনব্যাধী যদি তার বাবাকেও আবার না ধরে বসে।
এই রোগের প্রধান সমস্যা রক্তশুন্যতা। মাসে দু’বার রক্ত না দেওয়া হলে রোগীর শরীর হলুদ বর্ন ধারন করে দুর্বল হয়ে বিছানার সঙ্গে লেগে যায়। রোগী পা উঠাতে পারে না, খেতে পারে না। পেট ফুলে শক্ত হয়ে যায়, জানালেন সোমার মা।
তিনি বললেন, হাসপাতালে ভর্তি থেকেও অনেক কষ্ট করে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলো সোমা। অসুস্থতার কারণে পাশ করতে পারেনি। এরপর তো টাকার অভাবে লেখাপড়াই বন্ধ হয়ে গেলো। এখন সংসারই চলে না। ওর চিকিৎসা করাব কিভাবে?
এতক্ষণ চুপ করে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন সোমার বাবা হারুন। হঠাৎ ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মৃত ছেলের ছবি দেখিয়ে বলতে লাগলেন, এক সন্তানকে হারিয়েছি। আরেকটিরও এ অবস্থা। কেউ কি নেই আমার মেয়েটাকে বাঁচানোর?
বাবার গায়ে হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিতে চেষ্টা করলেন সোমা। তার অসুস্থতা অসহায় করে দিয়েছে বাবাকেও। হয়তো এ অপরাধবোধ থেকেই বলে উঠলেন, না বাবা। আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বেঁচে থেকে তোমাদের এতো কষ্ট দেওয়ার থেকে মরে যাওয়া অনেক ভালো।
অপারেশন করে সুস্থ হলে কী করবে –এমন প্রশ্নে খানিকের জন্য কীংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে মেয়েটি। খানিকটা পরে সোমার মুখে ক্ষণিকের জন্য দেখা গেলো এক চিলতে মলিন হাসি। বললো, শিক্ষক হবো অথবা যে কোন চাকরি করে বাবা-মাকে দেখাশোনা করবো। কিন্তু এভাবে মিথ্যা স্বপ্নের কথা না বলতে মেয়েটি বার বার বারণ করেন এই প্রতিবেদককে।
.jpg)
পবিত্র এই রমযান মাসে সোমার প্রতি কারো সহানুভূতি জাগবে, কেউ এগিয়ে আসবেন তার চিকিৎসায়-সেই আসায় বুক বেঁধে আছেন সোমার বাবা-মা। তাদের জীবনে কি আর কোনদিন রঙিন আভায় সিক্ত হয়ে ঈদ আসবে না? হয়তো আসবে, হয়তো আসবে না। সোমার জন্য বিত্তবান কেউ এগিয়ে আসবে কীনা তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে এই প্রশ্নের জবাব।
এক বছর আগে সোমাকে নিয়ে লেখাটি আরেকটু এডিট করে টাইমনিউজবিডির পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম। সোমাকে সাহায্য করতে চাইলে ফোন করতে পারেন এই নম্বরে : হারুন-উর-রশিদ, মোবাইল নং- ০১৭৬২১৭৪৪০৪ (বিকাশ)। অথবা ডাচবাংলা ব্যাংকের একাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন। একাউন্ট নাম্বার ২১১.১০১.৫৮৮০৩, পল্লবী শাখা, মিরপুর-১২, ঢাকা।
কেবি





