৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে বিএনপির হাইকমান্ড দলটির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। প্রায় ১০ মাস পরে গত ১৪ অক্টোবর অপেক্ষাকৃত তরুণদের সমন্বয়ে রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

নতুন কমিটি গঠন করার আগে পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ, রাজনীতিক, ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন তিনি।

কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর থেকেই বাদ পদবঞ্চিদের একটি অংশ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ এক পর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গড়ায়। গত রবিবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পদবঞ্চিতদের হামলায় নতুন কমিটির ১০-১২জন নেতাকর্মী আহতও হন। বিদ্রোহীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কার্যালয়ের প্রবেশ পথে রাখা শহীদ জিয়ার মূরাল।

শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহের খবরে দলের হাইকমান্ডও অনেকটা বিব্রত। আর এজন্য দলের চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ পর্যায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস, ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবীব উন-নবী খান সোহেল, যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। কিন্তু প্রতিবাদ বিক্ষোভ সাময়িক স্থগিত থাকলেও বিদ্রোহ পুরোপুরি নিরসন হয় নি।

অন্যদিকে দলের মধ্যে বিদ্রোহীদের নেপথ্যের মদদদাতাদের নিয়ে চলছে জোর আলোচনা সমালোচনা। এমনকি ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট বিদ্রোহে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, যুগ্ম মহাসচিবরাও ইন্ধন দিচ্ছেন বলে এমন অভিযোগ খোদ দলের নেতাকর্মীদেরই।

কাঙ্খিত পদ না পেয়ে কিছু সংখ্যক সাবেক ছাত্র নেতা নতুন কমিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে আপাত দৃষ্টিতে এমনটি মনে হলেও বিদ্রোহের নেপথ্যে রয়েছে দলের আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব বলয় তৈরী করা। বিদ্রোহের পিছনে যতটা না পদ পাওয়ার বিষয়টি জড়িত তারচেয়ে বেশি মূখ্য ভূমিকা পালন করছে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি।

বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মূল দাবি এ্যানী-টুকুকে তাদের স্বপদ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং একই সঙ্গে বর্তমান কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানকে বাদ দিয়ে নতুন করে কমিটি গঠন করতে হবে। রবিবার বিকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠকের সময় বিদ্রোহীরা এ দাবিই তুলে ধরেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন গঠিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অন্তরালে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও জড়িত রয়েছেন। ভবিষ্যত রাজনীতিক ফায়দা লাভের কথা চিন্তা করে দায়িত্ব প্রাপ্ত বিএনপির কিছু কেন্দ্রীয় নেতা যেমন ছাত্রদলের কমিটি বাগিয়ে নিতে চান, তেমনি আরও একদল নেতা নিজেদের পদ-পদবী ও প্রভাব হারানোর ভয়ে বিদ্রোহীদের ইন্ধন দিয়ে কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া পায়তারা করছেন।

বিদ্রোহীদের অভিযোগ বিএনপির ছাত্র বিষয় সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপি চেয়ারপারসনকে অন্ধকারে রেখে রাজীব ও আকরামকে দায়িত্ব দিয়ে কমিটি গঠন করিয়ে নেয়।

তাই এ কমিটিকে সহজভাবে দেখেননি বিডিআর বিদ্রোহের বিচারে সাজা প্রাপ্ত কারাগারে আটক মহানগর বিএনপির এক নেতা। তার আশঙ্কা সাবেক এক জন ছাত্রদল সভাপতি যেভাবে মহানগরের রাজনীতিতে তার আধিপত্য বিস্তার করছে এতে ভবিষ্যতে মহানগরে তার একচ্চত্র আধিপত্য বিস্তার লাভ করবে। বিষয়টি নিয়ে জেলে আটক ওই নেতা খুবই বিচলিত। তাই বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে থেকেই ছাত্রদলের বিদ্রোহীদের দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি বর্তমানে দলের যুগ্ম মহাসচিব এমন একজন নেতাও বিদ্রোহীদের নেপথ্যে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ এর আগে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের সময় এই সাবেক প্রভাবশালী ছাত্র নেতার ভূমিকা থাকত। কিন্তু বিগত দু-তিনটি কমিটি গঠনের সময় তার আধিপত্য খর্ব হয়ে যায়।

কমিটির বিদ্রোহ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরি এ্যানী টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, ছাত্রদল দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন। এখানে পদ প্রত্যাশিত অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। তাই কমিটি গঠনের পর নেতাকর্মীদের বিক্ষুদ্ধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সুযোগ খুঁজছে এবং সেটা তারা নিয়েছেও। তাই সবাইকে দলের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখতে হবে।

পদবঞ্চিত ছাত্রদল নেতা তরিকুল ইসলাম টিটু বলেন, দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। যদি আমাদের দাবি না মানা হয় তাহলে আবারো অবস্থান কর্মসূচি দেয়া হবে।

তাদের দাবীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দাবী পরিষ্কার এ্যানী-টুকুকে ছাত্রদলের দ্বায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং রাজিব-আকরামের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে।

ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, গণতন্ত্র পূনরূদ্ধারের আন্দোলন বেগবান করতে ও ছাত্র সমাজের অধিকার আদায়ের জন্য দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদেরকে ছাত্র দলের দ্বায়িত্ব দিয়েছেন। তাই দেশের সচেতন ছাত্র সমাজের কাছে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আহ্বান থাকবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সব ভেদাভেদ ভুলে গণতন্ত্র রক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুন।

এমএইচ/এসএইচ