৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন, সারাদেশে দলীয় কোন্দল, সিনিয়র নেতাদের বেফাঁস মন্তব্য, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, খুন, চাঁদাবাজি ও ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনের হুমকিতে বিপর্যস্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের সকল বাঁধা উপেক্ষা করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করেন নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে দেশে-বিদেশে এখনও চলছে নানান গুঞ্জন। তারপরও বিরোধী রাজনৈতিক জোটকে দমন করে নিরলস দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা।
অন্যদিকে, দলের কিছু সিনিয়র নেতাদের বেফাঁস মন্তব্য এবং আওয়ামী, যুব ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে বার বার বেকায়দায় ফেলছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের এমন বেমানান কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। তাই গত ১৭ নভেম্বর মন্ত্রীপরিষদ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দু:খ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি ভালো কাজ করার জন্য। যখন একটা ভালো কাজ নিয়ে এগিয়ে যাই, তখন আপনারা সেটা সম্পর্কে বলবেন। তা না করে নতুন কিছু বলে বিতর্ক সৃষ্টি করা ঠিক নয়। যার যার দ্বায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাপরিষদ সদস্য এইচ টি ইমাম গত ১২ নভেম্বর (বুধবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) ছাত্রলীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে বলেন- ‘নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ ও প্রশাসনের যে ভূমিকা, নির্বাচনের সময় আমি তো প্রত্যেকটি উপজেলায় কথা বলেছি, সব জায়গায় আমাদের যারা রিক্রুটেড, তাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের দিয়ে মোবাইলকোর্ট করিয়ে আমরা নির্বাচন করেছি। তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, বুক পেতে দিয়েছে।’
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতার এমন বক্তব্যে হতভাগ দেশের বড় রাজনৈতক দল-বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। রীতিমতো বিস্মিত হলেন- দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সাধারণ জনগণ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী সরকার সাহসিকতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করলেও এখন কিছুটা হলেও শঙ্কিত।
এদিকে, গত ২০ নভেম্বর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে সুমন দাস নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন। আহত হন আরো অনেকে। এভাবেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। আর তাদের এই কর্মকাণ্ডে বার বার অসস্তিতে পড়ছেন দলটির নেতারা।
গত ২০ নভেম্বর কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কলাকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাবিবুল্লাহ বাহার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা ইব্রাহীমের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় রেজাউল করিম সেন্টু মিয়া (৪৮) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত হন। এসময় উভয় গ্রুপের অন্তত ২৫ কর্মী আহত হন।
এছাড়াও সম্প্রতি সারাদেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে বিভিন্ন স্থানে খুন হয়েছেন বেশ কয়েকজন, আহত হয়েছেন কয়েক’শ নেতাকর্মী। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতাকর্মীদের এমন কর্মকাণ্ডে দলের সিনিয়র নেতারা অনেকটা বিচলিত।
এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এতদিন আন্দোলনের হুমকি দিয়ে মাঠে দাঁড়াতে না পারলেও এইচ টি ইমামের বক্তব্যের পর কিছুটা সুবিধা ফিরে পেয়েছে। তাই সর্বশক্তি নিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট। যেকোন মূল্যে আগামী মার্চের মধ্যে বর্তমান সরকারকে বিদায় করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানা গেছে।
এইচ টি ইমামের বক্তব্যের পর গত ১৯ নভেম্বর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জম্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন- আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেহারায় পরিবর্তন আসবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশি দিন থাকবে না।
এতদিন বিএনপির আন্দোলনের হুমকি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কথা কানে না তুললেও এইচ টি ইমামের বক্তব্যের পর তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূল গুছিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীনরা। যেকোন মূল্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দলের তৃণমূলের কমিটি ঘোষণা করে দলকে শক্তিশালী করতে চায় তারা।
এছাড়াও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল গুছিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ২০ দলীয় জোটের "অসাংবিধানিক" দাবি আদায়ের আন্দোলন মোকাবেলার কৌশল নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, দলের শীর্ষ নেতাদের বেফাঁস মন্তব্য ঠেকাতে ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে দলের নীতিনির্ধারকরা কাজ করে যাচ্ছেন। যেকোন মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে। তাই দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে- এমন নেতা যত বড়ই হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, বিএনপি ২০০৯ সাল থেকেই হুমকি দিয়ে আসছে। তাদের হুমকি শুধু কাগুজে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে খালেদা জিয়াসহ তার নেতাকর্মীরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন। তবে তারা যদি ২০১৩ সালের মতো চোরাগোপ্তা হামলা চালায়, তা মোকাবেলায় সরকার ও দলের প্রস্তুতি রয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেলিন টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, এরকম হুমকি বিএনপি বার বার দিচ্ছে। সময় নির্ধারণ করে আন্দোলন হয় না। তাদের হুমকি আমলে নেয়ার কোন কারণ নেই। খালি কলসি বাজে বেশি। দেখি মার্চে ওনারা কি করতে পারেন।
এমআর, জেএ





