শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়, বিশ্ব সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ভারত। স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম লাভের পর বিগত ছয় দশকের পুরো সময়টাতেই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ধরে রাখার অনন্য কৃতিত্ব নিয়ে গর্বিত দেশটির মানুষ। আয়তনের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং পৃথিবীর মধ্যে ৭ম স্থানে থাকা এই পারমানবিক শক্তিধর দেশের ভবিষ্যত নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ কষছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ।

কিন্তু অনেকটা বাতির নীচে অন্ধকারের মতোই পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো ভারত জুড়ে। বিশেষ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বিভিন্ন দাবিতে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার বহু নজির রয়েছে এই দেশটিতে।

তবে, সবকিছু ছাপিয়ে এবারের আলোচনায় উঠে এসেছে দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তির অন্যতম কারিগর কৃষকদের গণহারে আত্মহত্যার ইস্যুটি। যেখানে দেশের শ্রমজীবী মানুষের প্রায় ২৫ শতাংশই কৃষক, সেখানে এই আত্মহত্যার বিষয়টি রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে দেশটির কর্তা ব্যক্তিদের।

সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গত দেড় দশকে সাড়ে তিন লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে ভারতে। এই দশকে কৃষকদের অবস্থা আরো বেশি নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একারণে আত্মহত্যার এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

দেশটির কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বাকি জনগোষ্ঠীর চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি। ভারতের কৃষি সমস্যা জর্জরিত রাজ্যগুলোতে এ হার ১০০ শতাংশ বেশি বলে ২০১১ সালের আদম শুমারির ভিত্তিতে এ খবর দিয়েছে ভারতের স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো।

ভারতের প্রান্তিক কৃষকেরা সাধারণত বেসরকারি ঋণ দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিবাহের ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। দেশটির বিতর্কিত কৃষি নীতি, কীটনাশকসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, ঋণের দায়ে পর্যুদস্ত হয়ে তথা দারিদ্রের কারণেই বেশির ভাগ কৃষক আত্মহত্যা করেন।

তবে দেশটির কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী রাধামোহন সিং এই কারণগুলোকে বাজে কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। গত ২৪ জুলাই রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, হয় পণ, নয়তো প্রেমের সম্পর্ক, নয়তো যৌন অক্ষমতা- এর কোনো একটা কারণে ওই কৃষকরা আত্মহত্যা করেছেন। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় ফসল নষ্ট হওয়া বা আর্থিক দেনা এই কৃষকদের আত্মহত্যার কারণ নয়।

কৃষক মৃত্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর লিখিতভাবেই দিয়েছেন ওই মন্ত্রী। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টের উল্লেখ করে রাধামোহন সিং আরো বলেছেন, কৃষকদের আত্মহত্যার কারণ পারিবারিক নানা সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা, অত্যধিক নেশাভাং করা, পণ, প্রণয়ঘটিত কোনো গণ্ডগোল নয়তো যৌন অক্ষমতা।

সবচেয়ে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেন ভারতের মহারাষ্ট্রে। যেখানে রয়েছে ভারতের বৃহত্তম মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ। মহারাষ্ট্রে ভারতের শীর্ষ ৫১ জন ধনীর ২১ জনের বসবাস। তাছাড়া ভারতের এক লাখ ধনকুবেরের এক-চতুর্থাংশের বাস মুম্বাইতে। বলিউড নামে পরিচিত ভারতের জলুসপূর্ণ চলচ্চিত্র শিল্পের কেন্দ্রস্থল এই মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইতে।

সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) হিসাবে দেখা যায়, ভারতে গড়ে প্রতি বছর ১৭,৫০০ কৃষক আত্মহত্যা করে। একে ভারতের নব্য-উদার সন্ত্রাসবাদ (নিও-লিবারেল টেরোরিজম) বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা। তারা বলেছেন, ভারতে কৃষকদের এই আত্মহত্যা ইতিহাসের বৃহত্তম আত্মহত্যার ঘটনা।

ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করে নন্দিত হয়েছেন চেন্নাইভিত্তিক প্রভাবশালী হিন্দু পত্রিকার গ্রামীণবিষয়ক সম্পাদক পি সায়নাথ। তিনি লিখেছেন, ১৯৯৭-২০০৭ পর্যন্ত ভারতে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৩৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে দৃই-তৃতীয়াংশ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ভারতের ৫টি রাজ্যে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে ভারতের এক-তৃতীয়াংশ লোক বসবাস করে। তবে ভারতে যত কৃষক আত্মহত্যা করেন, তার দৃই-তৃতীয়াংশ এই পাঁচটি রাজ্যের বাসিন্দা। এসব রাজ্যে অন্যান্য পেশার লোকদের চেয়ে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি।

সায়নাথ লিখেছেন, আত্মহত্যার এই হার সরকারি প্রতিষ্ঠান এনসিআরবি থেকে নেয়া। ফলে একথা বলা যায় যে, অনেক আত্মহত্যার ঘটনাই হয়তো রেকর্ড করা হয়নি। তিনি বলেছেন, কোনো কৃষাণি আত্মহত্যা করলে তাকে কৃষিজীবী হিসেবে দেখানো হয় না। কারণ, সাধারণত এসব কৃষাণির নামে কোনো জমি থাকে না। তাই তাদের আত্মহত্যাকে ’কৃষকের স্ত্রীর’ আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়; কৃষকের আত্মহত্যা হিসেবে নয়।

কৃষকদের ক্রমবর্ধমান এই আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বিগ্ন ভারতীয়রা। এ ঘটনায় ২০১২ সালের ১২-১৩ মে দিল্লিতে কৃষকদের নিয়ে ‘কিষাণ সংসদ’ বা কৃষক সম্মেলন করে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অঙ্গ সংগঠন ‘কিষাণ মোর্চা’।

সে সময় বিজেপির কিষাণ মোর্চার সাধারণ সম্পাদক এসএস গ্রেওয়াল বলেন, ‘ভারতে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন। কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের কৃষকবিরোধী নীতির কারণেই কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন।’

গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ভারত সরকার দেশের অর্থনীতির অগ্রগতিতে গুরুত্বারোপ করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি সংগ্রহ করতে গত বছরের ডিসেম্বরে দেশটির সরকার একটি জরুরি নির্বাহী আদেশ পাস করেছে।

বিতর্কিত এই বিলটি ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি অধিকার রক্ষা কর্মীরা এবং রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলো বলছে, বিলটি কৃষকের সুবিধায় আঘাত হানবে। একই সঙ্গে থমকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সচল করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে সরকারকে।

কৃষক, ভূমি অধিকার কর্মী আর বিরোধী দলগুলোর টানা প্রতিবাদের মুখে ভারতীয় কেবিনেট নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনসহ নতুন করে ভূমি অধ্যাদেশ জারি করে। তবে এটাকে 'আই ওয়াশ' বলে আখ্যায়িত করে আন্দোলনকারীরা।

কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খারগে সম্প্রতি লোকসভায় কৃষকদের সমস্যার প্রতি সরকারের উদাসীনতা ও ভূমি অধিগ্রহণ নীতির সমালোচনা করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছেন, টুইটারে মতবিনিময় না করে উনি বরং সভায় এসে বিবৃতি দিন। সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘কৃষকদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিন। দেখবেন, আপনাকে বিদেশি লগ্নির জন্য দেশে দেশে ঘুরতে হবে না।’

কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের মানবাধিকার কমিশন বলেছে, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সত্য হলে দরিদ্র কৃষকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হবে। ভারতের দরিদ্র কৃষকদেরকে কৃষি সরঞ্জাম কেনার জন্য ঋণ নিতে বাধ্য করা হয়।

কিন্তু সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণদাতারা নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন। এ কারণে অনেক কৃষক তার বাস্তুভিটা পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ আবার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির চাপে আত্মহত্যা করেন। মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিয়েও অনেকে সর্বশান্ত হন।

তবে কৃষকদের আত্মহত্যা রুখতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই, ১৫) লোকসভায় তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই কৃষকদের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই সমস্যার সমাধানে সরকার সব ধরনের সুপারিশ গ্রহণে প্রস্তুত। সরকার কৃষকদের অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারে না।

এআর/ কেবি/ কেএইচ