পৃথিবীর অন্যতম কিংবদন্তী বক্সার মোহাম্মদ আলী ছিলেন খিষ্টান ধর্মের অনুসারী।তার নাম ছিলো ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে জুনিয়র।জীবনের অনেক যুদ্ধেই বিজয়ী এই মুষ্ঠিযোদ্ধা ইসলামের সুমহান আদর্শের কাছে হার মেনে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন।
মোহাম্মদ আলী জন্ম ১৭ জানুয়ারি ।একজন সাবেক মার্কিন মুষ্টিযোদ্ধা, ৩বারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাপিয়ন এবং ওলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী। ১৯৯৯ সালে মুহাম্মদ আলীকে বিবিসি এবং স্পোর্টস ইলাট্রেটেড স্পোর্টসম্যান অব দ্যা সেঞ্চুরী (শতাব্দীর সেরা ক্রীড়াবিদ) হিসেবে ঘোষণা করে।
আলী জন্মগ্রহণ করেছিলেন লুইসভিলা, কেন্টাকি তে। তিনি তার নাম তার বাবা ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে সিনিয়র এর নাম অনুসারেই রাখা হয়েছি, যার নামকরণ করা হয়েছিল একজন দাসপ্রথা বিরোধী রাজনীতিবিদ ক্যাসিয়াস ক্লে এর নামানুসারে। আলী ১৯৬৪ সালে ইসলামী সংগঠন নেশন অব ইসলাম এ যুক্ত হলে এবং ১৯৭৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম পরিবর্তন করেন।
মোহম্মদ আলী ইসলাম গ্রহণের পর তার ছোট ভাই রুড্লফওমুসলমান হন। তার নাম হয় রহমান আলী। আলীর মেয়ে লায়লা আলী পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে সুনাম অর্জন করেছিলেন।
প্রথমে তিনি এলিজা মোহাম্মদ ও ম্যালকম এক্সের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশন অব ইসলামের’ সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেন। তিনি কোরআন অধ্যায়ন করতে থাকেন, সুন্নি ইসলামের অনুসারীতে পরিণত হন।১৯৭৫ সালে তিনি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। তার মতে এ জন্য ভুমিকা রাখেন নেশন অফ মুসলিম এর প্রধান ডব্লু. ডি. মুহাম্মদ।
কিনসাসায় ফোরম্যানের বিরুদ্ধে লড়ার আগে মোহাম্মদ আলী টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য এবং আমার জনগণের জন্য লড়ছি। আমি টাকার জন্য বা খ্যাতির জন্য লড়ছি না। আমি আমার জন্য লড়াই করছি না।
আমি কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উন্নতির জন্য, যেসব কৃষ্ণাঙ্গের ভবিষ্যত নেই, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ মদ আর মাদকাসক্তিতে ডুবে রয়েছে, তাদের জন্য লড়ছি। আমি আল্লাহর হয়ে কাজ করছি।’ এটিও একটি সহজ কোনো ঘোষণা ছিল না। তিন আরো বলেন, ‘এই ফোরম্যান খ্রিস্টানত্ব, আমেরিকা এবং সেই পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি তাকে ছেড়ে দেব না। সে কুকুরের মাংসের প্রতিনিধিত্ব করছে।’
তিনি তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই তাকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই। যে আলীকে একদিন যে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খেতে দেয়া হয়নি, সেখানে তিনি পরম আকাক্সিক্ষত ব্যক্তি। যেদেশ তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেই আমেরিকাতেই আলী সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন। যে পদকটি তিনি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন একদিন, সেটি আবার নতুন করে বানিয়ে দেয়া হয়েছে। সাদা কালো, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নাম হলো আলী।
মুহাম্মদ আলী ১৭ই জানুয়ারি ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রঙ করতেন এনং তার মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে একজন গৃহিনী ছিলেন। যদি ক্লে সিনিয়র একজন মেথডিস্ট ছিলেন কিন্তু তার সন্তানদের বাপ্টিস্টে নিতে তার স্ত্রীকে অনুমতি দিতেন।
১৯৫৪ সালের একদিন আলির সাইকেল চুরি হয়ে যায় তখন সে পুলিশ অফিসারকে (মার্টিন) জানায় যে সে চোরকে পেটাতে চায়। অফিসার (সে শহরের বক্সীং কোচ) তাকে বলে যে এর জন্য তাকে লড়াই করতে জানতে হবে। পরদিন তিনি মার্টিন এর কাছ থেকে বক্সিং শেখা শুরু করেন। তিনি তাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে প্রজাপতির মত নেচে নেচে মৌমাছির মত হুল ফোটাতে হয়। ১৯৬০ সালে তিনি অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেন।
৬’৩’’ উচচতার আলির বিশেষত্ব ছিল তিনি খেলার সময়ে সবার মত হাত মুখের সামনে রাখতেন না, শরীরের পাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের মার ঠেকানোর জন্য নির্ভর করতেন সহজাত প্রবিত্তির উপর। ২৯-১০-১৯৬০ এ তিনি প্রথম পেশাদার লড়াই জেতেন। ১৯৬০-১৯৬৩ তিনি টানা ১৯টি লড়াই জেতেন যার মধ্যে ১৫টি নকআউট। ১৯৬৩ সালে তিনি ডগ জোন্স এর সাথে ১০ বাউটের এক বিতর্কিত লড়াই এ জেতেন।
এর পর তিনি শিরোপাধারী সনি লিসটন এর প্রতিদ্বন্ধী হিসাবে গন্য হন, কিন্তু কেউ আশা করেনি যে তিনি জিতবেন। লড়াই এর আগে তিনি ঘোষনা দেন তিনি প্রজাপতির মত নেচে নেচে মৌমাছির মত হুল ফোটাবেন।
লিসটন ছিলেন অতিরিক্ত আত্ববিশ্বাষী। কিন্তু আলির ক্ষিপ্রতা তাকে লিস্টনের ঘুষি থেকে বাচিয়ে দেয়। তার উচ্চতার কারনে তিনি তাকে ঘুষি মারতে সক্ষম হন। ৪র্থ রাউন্ডে লিস্টন সামলে উঠেন। এ সময়ে আলির চোখে ধুলো ঢোকায় তিনি ঠিকমত দেখতে পারছিলেন না। তিনি শুধু লিস্টন ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন। ৬ষ্ঠ রাউন্ডে আলি সামলে উঠেন, এবং ৭ম রাউন্ডে লিস্টন পরাজয় মেনে নেন, যা অনেকের মনে ম্যাচটি পাতানো বলে সন্দেহর উদ্রেক জাগায়।
শিরোপাজয় করার পর তিনি দ্রুত খ্যাতির শীর্ষে পৌছে যান। এ সময় তিনি ঘোষনা দেন তিনি ‘’’নেশন অফ মুসলিম’’’(Nation of Muslim) গোত্রের সদস্য। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স, কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবী দাসত্বের পরিচায়ক। এর কিছুদিন পর গোত্র প্রধান সাংবাদিকদের কাছে তাকে মোহাম্মদ আলি বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
১৯৬৪ সালে তিনি সৈনিক জীবনে প্রবেশ করতে ব্যার্থ হন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ন হয়ার কারনে। ১৯৬৬ সালে তিনি উত্তীর্ন হন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যে কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। কোন ভিয়েতকং এর সাথে তার বিরোধ নেই, তারা কেউ তাকে কালো বলে গালিও দেয়নি। তিনি ক্যাসিয়াস ক্লে বলে পরিচিত হতে চাননি, এ কারনে তিনি ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় লড়াই এ অংশ নিতে পারেননি।
১৯৬৫ সালে লিস্টন এর সাথে ফিরতি ম্যাচের পর ১৯৬৭ সালে যরা ফলির সাথে ম্যাচের মধ্যে তিনি ৯ বার শিরোপা রক্ষার লড়াইএ নামেন। খুব কম বক্সারই এত কম সময়ে এত বেশি বার লড়াই করেন। তার জীবনের একটি অন্যতঅম কঠিন লড়াইএ তিনি ১২ রাউন্ডে জয় লাভ করেন।
আলি ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় ফিরে এসে ক্লিভলান্ড উইলিয়ামস এর সাথে লড়াই করেন। এটি তার সেরা ম্যাচগুলোর একটি যেটিতে তিনি ৩ রাউন্ডে জিতেন। ১৯৬৭ সালে তিনি হিউস্টন এর একটি রিং এ এরনি তেরেল এর সাথে ল্রড়াই এ নামেন। তেরেল তাকে ম্যাচ এর আগে ক্লে বলে অপমান করেন। আলি তাকে সঠিক শাস্তি দেয়ার মনস্থির করেন।
১৫ রাউণ্ডের এ লড়াইএ তিনি তাকে রক্তাক্ত করেন, অনেকে মনে করেন যে আলি ইচ্ছা করে লড়াই আগে শেষ করেননি। ১৯৬৭ সালে তিনি ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন যুদ্ধে না যাওয়ার কারনে। ১৯৭০ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি লড়াইএ ফিরে আসতে সমর্থ হন।
মার্চ ১৯৭১ সালে আলি জো ফ্রেজিয়ারের মুখোমুখি হন যা 'শতাব্দীর সেরা লড়াই' হিসাবে পরিচিত। বহুল আলোচিত এ লড়াইটি ছিলো দুই মহাবীরের লড়াই যা সকলকে শিহরিত করে। জো ফ্রেজিয়ার খেলায় জয়লাভ করেন ও আলি প্রথমবারের মত পরাজিত হন। ১৯৭৪ সালের ফিরতি লড়াইয়ে তিনি অবশ্য শিরোপা পুণরুদ্ধার করেন।
তিনি ১৯৭৪ সালের অক্টোবারে জর্জ ফোরম্যান(en:george foreman) এর সাথে লড়াই এ নামেন যা “রাম্বেল ইন দ্যা জাংগল”(en:the rumble in the jungle) বলে পরিচিত। আলির ঘোর সমর্থকরাও এতে আলির সম্ভাবনা দেখেননি। ফোরম্যান ও নর্টন আলির সাথে প্রবলভাবে লড়াই করেন ও জর্জ তাদের ২ রাউণ্ডে পরাজিত করেন। ফোরম্যান ৪০ টির মধ্যে ৩৭ টি লড়াই নকআউটে জিতেন ৩ রাঊণ্ডের মধ্যে। আলি এ ব্যাপারটিকে কাজে লাগাতে চাইলেন। সবাই ভেবেছিলো তিনি ক্ষিপ্রতার সাথে লড়াই করবেন, কিন্তু তিনি দূরে দূরে থাকতে লাগলেন। ফোরম্যানকে তিনি আক্রমণ করতে আমন্ত্রন করলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাকে ক্লান্ত করে দেয়া। ৮ম রাউন্ডে তিনি তার সুযোগ পেয়ে গেলেন ও ফোরম্যানকে নকআউট করলেন।
১৯৭৫ সালে আলি লড়াই করেন ফ্রেজিয়ার এর সাথে। দুজন বীরের এ লড়াইএর জন্য সকলে খুবই উত্তেজিত ছিল। ১৪ রাউণ্ডের শেষে ফ্রেজিয়ার এর কোচ তাকে আর লড়াই করতে দেননি কারণ তার এক চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফ্রেজিয়ার এর কিছুদিন পরই অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের এক লড়াইএ তিনি ১৯৭৬ এর অলিম্পিক মেডালিস্ট লিয়ন স্পিংক্স এর কাছে খেতাব হারান। তিনিই প্রথম যিনি একজন অপেশাদার এর কাছে হেরেছিলেন। ১৯৭৯ তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
তবে তিনি ১৯৮০ সালে ফিরে আসেন ল্যারি হোমস এর কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নিতে। ল্যারি ছিলেন তার শিষ্য তাই সকলেই লড়াইটি নিয়ে আগ্রহী ছিল। ১১ রাউন্ড পর আলি পরাজিত হন। পরে জানা যায় মস্তিস্কে মারাত্বক ত্রুটি ধরা পরেছে। তার মস্তিষ্ক ফুটো হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি ১৯৮১ সালে অবসর গ্রহণ করেন(৫৬ জয় ৩৭টি নকআউটে ৫ পরাজয়)। তিনি "সর্বকালের সেরা" বক্সার।
১৯৮০ সালে তিনি পারকিন্সন্স রোগে (en:parkinson’s disease) আক্রান্ত হন। তাকে যখন বলা হয় তিনি তার রোগের জন্য বক্সিংকে দায়ী করেন কিনা, তিনি বলেন বক্সিং না করলে এত বিখ্যাত হতেন না। অবসরের পরে তিনি তার জীবনকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ৩২ বছর পারকিনসন্স রোগে ভোগার পর ০৪ জুন, ২০১৬ তে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
এআই





