পিছন থেকে দেখলে মনে হবে যেন আস্ত একটা ব্যাগ হেঁটে যাচ্ছে। বহরে, উচ্চতায় সেই স্কুলব্যাগ এতই বড় যে ঠিক করে সোজা হয়ে চলতেই পারে না ক্লাস সিক্সের লাবণ্য।
বাড়ি ফিরে কোনওরকমে ব্যাগ নামিয়েই নেতিয়ে পড়ে সে। কয়েক বছর যেতে না যেতেই কাঁধে ব্যাগ নিতেই পারে না আর। প্রথমে ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’ মনে হলেও পরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ায় বোঝা গেল অস্টিওপোরোসিস দানা বেঁধেছে লাবণ্যর শরীরে।
কোমরে চিনচিনে ব্যাথা শুরু হয়েছিল অদ্রির। মাঝেমাঝেই সে ভয়ানক যন্ত্রণায় প্রায় শয্যাশায়ী। এক্স-রে করার পর ডাক্তারেরাও থ-হয়ে গেল। এত অল্প বয়সেই মেরুদন্ড সামান্য বাঁ দিকে বেঁকে স্পন্ডোলাইসিসের দেখা মিলেছে এই ক্লাস টেনের ছেলেটির শরীরে।
স্কুলের ভারি ব্যাগে বইয়ের সঙ্গে বয়ে চলা এসব রোগ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে— স্বীকার করছেন চিকিৎসকেরাই। বেশ কয়েকবছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা সমীক্ষা চালিয়ে পড়ুয়াদের বয়স এবং শরীরের ওজনের সঙ্গে তাদের ব্যাগের ওজনের তালিকা তৈরি করে।
সেই সমীক্ষা অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের বইয়ের ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত ২কেজি বা তার কম। একইভাবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জন্য ৩ কেজি, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৪ কেজি এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৬ কেজি। আদতে যার কোনওটাই হয় না। কিন্তু বাড়তে থাকা এই বোঝার কারণটা ঠিক কী ?
রাজধানীর উদয়ন স্কুলের একজন শিক্ষক জানান, অনেক সময় নির্দিষ্ট ক্লাস না থাকলেও ছেলেমেয়েরাই সেই বিষয়ের বই নিয়ে আসে। যদি কোনও বিশেষ ক্লাস থাকে এবং সেই বই না থাকার জন্য পিছিয়ে পড়তে হয় এই ভয়ে সবাই অতিরিক্ত বই নিয়ে আসে।
অভিভাবকদেরও একটা প্রচ্ছন্ন চাপ থাকে। তার থেকেও বড় হল প্রত্যেক বিষয়ের জন্য আলাদা খাতা। এর সঙ্গে পানির বোতল, টিফিন, ছাতার ওজন তো আছেই। সাধারণত প্রতিটা স্কুলেই দৈনন্দিন সাত থেকে আটটা করে ক্লাস থাকে। একটু উঁচু ক্লাস হলেই বাড়ে বইয়ের আকার ওজনও। সেক্ষেত্রে ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে কোনওভাবে কি বইয়ের চাপ কমানো যেতে পারে?
ভিকারুননেসার এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘ক্লাস কমিয়ে আনলে অনেক সময় অভিভাবকেরা আপত্তি করেন। তাঁদের ধারণা কম ক্লাস মানেই পিছিয়ে পড়বে তাঁদের সন্তান। এর কারণ মূলত হোম ওয়ার্কের কাজ স্কুলেই আগেভাগে এগিয়ে রাখা। ফলে দেখা যায় টিফিনের সময়েও বাচ্চারা খেলাধুলা না করে ক্লাসে বসে পড়ছে।’’ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটা রুটিন বাঁধা নিয়ম সেখানে যদি ক্লাসের সংখ্যা কমানো হয় তাহলে সিলেবাস শেষ হবে না। আবার যদি সিলেবাস শেষ করতে হয় তাহলে বাড়াতেই হবে ক্লাসের সংখ্যা।
তবে ভারতে পাঠ্যবই স্কুলেই রাখার জন্য স্কুলগুলিতে প্রতি বাচ্চা পিছু লকার তৈরি করার এক বিকল্প পথ ভেবেছিল বেশ কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ। এখনও সেখানকার নামী ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলোয় রয়েছে এই লকার ব্যবস্থা।
পুঁথিভিত্তিক শিক্ষার বিকল্প ভাবতে গিয়ে সবাই ঘুরেফিরে সেই সিলেবাসের জালেই বন্দি হয়ে যাচ্ছে। ‘‘বাচ্চার বিকাশটা যে বইয়ের গণ্ডির অনেকটা বাইরে। সেটা অভিভাবক তো দূরস্থান খোদ শিক্ষকদেরও ধারণায় নেই’’ বলেন একজন শিক্ষক।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি পাল্টানো সম্ভব নয়। বিদেশে ট্যাবের মাধ্যমে বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প়ড়াশোনা হচ্ছে, ব্যাগের কোনও গল্পও নেই। আমাদের এখানে সেটা ভাবাই যায়না।’’ বিকল্প খুঁজতে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষিকারা অবশ্য আবারও জোর দিচ্ছেন খেলাধুলো এবং অন্যান্য নান্দনিক বিষয়ের উপর।
রাজধানীর অনেক স্কুলেই বাচ্চাদের খেলার জন্য কোনও মাঠই নেই— আক্ষেপ এক শিক্ষকের। যত বেশি বিকল্প পদ্ধতি দিতে পারব, ব্যাগ ভারী করে স্কুলে আসার প্রবণতা কমবে। পড়াশোনাটাও করতে হবে অনেকটা আলোচনামূলক। ক্লাসে মোটা বই খুলে পড়ার চেয়ে নাটকের মাধ্যমে কোনও গল্পকে তুলে ধরা, বা ক্যুইজের মাধ্যমে পড়ুয়াদের অংশগ্রহণ শুধু যে পড়ুয়াদের শেখার পরিধিই বাড়ায় তাই নয় ব্যগভর্তি বই বওয়ার বদলে একটা সুস্থ বিকল্প পথও দেখায়—জানান শিক্ষকগণই।
কী বলছেন চিকিৎসকেরা ?
ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘যে কোনও স্কুলের সামনে দাঁড়ালেই দেখবেন বাচ্চাদের হাঁটাচলার ধরণটাই কেমন বদলে গিয়েছে। সকলের মধ্যেই কমবেশি ন্যুব্জভাব। আমাদের শরীরে হাড় এবং তার জয়েন্টগুলোর মধ্যে একটা স্বাভাবিক ছন্দ কাজ করে। জয়েন্টে হঠাৎ করে চাপ এসে পড়তে থাকলে সেই ছন্দের তাল কেটে যায়।’’ ভারী ব্যাগ বইতে প্রাথমিকভাবে কোনও সমস্যই হয় না। কিন্তু পরবর্তীকালে এর প্রভাব হতে পারে মারাত্মক।
ছোটো থেকেই বাচ্চাদের শারীরিক ভঙ্গীমা এমন বাঁকতে শুরু করে বড়ো হয়ে তা ভয়ঙ্কর আকার নিতে পারে। অতিরিক্ত ভার নেওয়ার ফলে হাড়ের জয়েন্টে ঘর্ষণ বাড়তে থাকে। যার ফলে বড় হয়ে হাড়ের ক্ষয় দেখা দেয়। হাড়ের বৃদ্ধি সঠিকভাবে না হওয়ায় তা অস্বাভাবিক আকারও নিতে পারে।
হাড়ের বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে যে ভিটামিন ডি, তা একমাত্র পাওয়া যায় সূর্যের আলো থেকে। শহিদুল ইসলামের প্রশ্ন, এখন বাচ্চাদের মাঠে খেলাধুলো নেই। গায়ে রোদ লাগবে কোথায় ?
এমএ





