কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরশেদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী তমার অদম্য সাহসিকতা আর সচেতনবোধের কাছে হার মেনেছে পরিবার।
হার মেনেছে ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থাও। স্কুলের বালিকা ফুটবল দলের অধিনায়ক সে। তার নৈপুণ্যে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে স্কুলটি উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সমান পারদর্শী দৌড়েও।
পড়াশুনায় মনযোগী তমা শিক্ষকদের কাছে যেমন প্রিয়, তেমনি সহপাঠিদের কাছেও। মায়ের রান্না ও গৃহস্থালির কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি তমা দাদার সাথে জাল বোনার কাজ করে উৎসাহ নিয়ে।
শিলাইদহ থেকে ৪ কিলোমিটার দুরে মাজগ্রামে তার বাড়ীতে গিয়ে দেখা গেল একটা ছোট পাটকাঠির বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা ছাপরাঘর। এই ঘরেই বসবাস তাদের। তমার বড় বোনের বিয়ে দেওয়া হয় বছর চারেক আগে।
তখন সেও পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তো। কিন্তু তখন কেউ তার বিয়েতে বাঁধা দেয়নি। কিন্তু এখন তমা বুঝতে পারে যে সমাজে বাল্যবিয়ে অপরাধ। তাই তার বাবা-মাকে বুঝিয়েছে বাল্যবিয়ে সম্পর্কে কথা বলে।
উপজেলার শিলাইদহের মাজগ্রাম থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে তমার স্কুল। ৪ কিলোমিটার মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে খোরশেদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়তে আসতো পঞ্চম শ্রেণীর মেধাবি ছাত্রী তমা।
সেদিন মনোযোগ সহকারে প্রতিদিনের মতো স্কুলের ক্লাস করছিলো তমা। হঠাৎ বাড়িতে ডাক পড়ে। উঠানে গিয়ে দেখে অপরিচিত কিছু লোক তার বিয়ের জন্য এসেছেন। বিয়ের কথা শুনে প্রতিবাদ করে অভিভাবকসহ উপস্থিত সবাইকে তমা সাফ জানিয়ে দেয়, ‘আমি এখন আমি বিয়ে করবো না, আমি পড়ালেখা করবো।’
তারপরেও তমার অশিক্ষিত বাবা-মা বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করে বলতে থাকে ‘তোমাকে বিয়ে করতে হবে’। কিন্তু বিয়ের প্রতিবাদ করেন তমা নিজেই এসব কথাগুলো শুনে উঠানে বসে থাকা বিয়ের লোকগুলো তমার বাবা সেকেন আলীকে বলেন তোমার মেয়ে বুদ্ধিমতি। সে পড়ালেখা করে অনেক বড় হতে পারবে। চলে যায় বিয়ের জন্য আসার বর পক্ষের লোকজন।
খোরশেদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, এই স্কুলের ভালো ছাত্রী হিসেবে আমাদের সবার কাছে প্রিয় তমা। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলে তমা।
ওই শিক্ষক জানান, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে স্কুলের হয়ে প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল করেছে সে, যা উপজেলা পর্যায়ে তাঁদের স্কুলকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। নিজের সচেতনার কথা তুলে ধরে তমা বলে, ‘বাল্যবিবাহ আইনত দন্ডনীয় অপরাধ, তাই এই বিয়ের প্রতিবাদ করেছি।
বাবাকে বলেছি আমাকে বিয়ে দিতে যা খরচ হবে সেই টাকা আমাকে দাও। আমার পড়ালেখার জন্য তোমাকে আর টাকা দিতে হবে না। এই টাকা দিয়ে পড়ালেখা করে আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’ খোরশেদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা বিউটি রায় চৌধুরী বলেন, ‘এই বয়সে বাল্যবিবাহ ভেঙ্গে দিয়ে সে খুব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে।
আমি শিক্ষক হিসেবে তমার পড়ালেখা করে তার ভবিষ্যৎ উজ্জল করুক এটাই কামনা করি।’ প্রত্যেক মেয়েকেই তমার মতো সাহসী হয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সোচ্চার হোক-এই প্রত্যাশা শিক্ষকের। তমার সহপাঠি সন্ধ্যা খাতুন বলে, ‘কারো বাল্যবিবাহ আমরা এগিয়ে যাবো, তার প্রতিবাদ করবো।
তমার বাল্যবিবাহ সে নিজেই ভেঙ্গে দিয়েছে তাতে করে আমাদের ভালো লাগছে।’ অনুতপ্ত তমার মা বলেন, ‘আমাদের বড় মেয়ের ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন সময়ে বিয়ে দিয়েছি কিন্তু এখন তার অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে। সবার সহযোগিতা পেলে আমি আমার মেয়ের পড়ালেখা করাতে চাই।’
বাল্যবিবাহ দন্ডনীয় অপরাধ জানা ছিলো না জানিয়ে তমার বাবা সেকেন আলী বলেন, ‘আমার বাড়ী থেকে ফাঁকা মাঠ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। তাছাড়া মেয়ে বড় হচ্ছে। দিনসময় খুব খারাপ তাই বিয়ে দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছিলাম।’
মেয়ের স্বপ্নপূরণে সাধ্যের সবটুকু করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে চোখ খুলে দিয়েছে। সে যতদুর পড়ালেখা করতে চায় আমি তাকে পড়াবো।’ কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, ‘অপরিণত বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে সামাজিক অবক্ষয় হয়। এটাই সমাজকে আরেকবার বুঝিয়ে দিলো তমা।’
নিজের অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে সব কিছুই করা সম্ভব উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা সেই সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা চাই, যে ব্যবস্থায় দেশ বাল্যবিবাহের অভিশাপ থাকবে না।
এসএইচ





