'২১ শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা' মনে করছি আইজকা বুঝি কেয়ামত আইসা পড়ছে। হটাৎ চারদিকে মানুয়ের ছুটাছুটি। চোখ-মুখ আন্ধকার হইয়া গেছে।
ঝাঁপসা চোখে তাকাই দেখি কার যেন একখান 'পা' আমার সামনে পড়ে থরধর করে কাঁপছে, আর পানির স্রোতের মতো রক্ত ঝরছে। সম্ভবত গ্রেনেডের আঘাতে পা-টি উড়ে এসে আমার সামনে পড়েছে।এভাবেই সেই বিভীষিকাময় কলংকিত দিনের বর্ণনা দিলেন বেলাল হোসেন।

বেলাল হোসেনের বাড়ি পরিদপুর জেলা সদরে বলে জানিয়েছেন তিনি। বেলাল হোসেন একজন 'পঙ্গু রিস্কা চালক' দেখা হয় পল্টনে।বেটারি চালিত রিস্কা চালান তিনি। হটাৎ চোখে পড়ল বেলাল একজন পঙ্গু। এ বিষয়ে প্রশ্ন করতেই কান্নাভরা চোখে ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো ২১ শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় আমার এ অবস্থা হয়েছে।
এসময় গ্রেনেড হামলার বিষয়ে জানতে ছাইলে বেলাল বর্ণনা দেন সেই দিনের বিভীষিকাময় চিত্রের। বেলাল বলেন, আওয়ামী লীগের অন্য সব সমাবেশের মতই সেদিন আমরা মিছিল নিয়ে যাই দলীয় কার্যালয়ের সামনে।
আমি বসার সময় একটু সামনের দিকে বসি। বিকেল ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধু কন্যা বক্তব্য দিলেন। একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি কুড়ি মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে লাগলেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা।মুহুর্তেই নেমে আসে কেয়ামত।

বেলাল হোসেন বলেন, দেখলাম চোট পাইপের টুকরার মতো কি যেন মঞ্চের সামনে পড়লো। মুহুর্তের মধ্যে মনে হয় কেয়ামত নেমে আসল। চারদিকে শুধু ছুটাছুটি,আর ছিৎকার-হাহাকার। সেটা বলে বুঝানো যাবেনা।
আমি সমাবেশে যেখানে বসলাম সেখানেই আছি। আমার গায়ের উপর দিয়ে মানুষ দৗড়াচ্ছে কিন্তু আমি দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছিনা।
সেই সাথে পুলিশ বেপরোয়াভাবে গুলি ছুড়ছে। সেই গুলি এসে পড়লো আমার গাঁড় ও হাতে, মুহুর্তেই শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।অনেক চেষ্টা করছি পালানোর জন্য কিন্তু পারছিনা, চোখ মেলতেই দেখি আমার হাত-পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
পায়ের দিকে তাকাতেই দেখি কারো একটা পা আমার সামনে পড়ে আছে। পাখানা থরথর করে কাঁপছে। পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।

এর পরপরই কে বা কারা এসে আমাকে আঞ্জুমান মাফিদুল ইসলামের গাড়িতে উঠালো আর কিছুই বলতে পারবোনা। এভাবেই কান্না জড়িত কণ্ঠে সেই বিভিষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দিলেন ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলার শিকার পঙ্গু রিকশাচালক বেলাল হোসেন।
সবশেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর করুনায় আজো বেছেঁ আছি। তিনি মাদ্রাজ নিয়ে গেছেন হেলিকপ্টারে করে।উন্নত চিকিৎসা করিয়েছেন বলেইতো আজো বেঁছে আছি। এই বেটারিচালিত রিক্সাটাওতো প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন।যা দিয়ে এখন সংসার চলে।

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১শে আগষ্ট সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল পাঁচটায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি কুড়ি মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন।
এ ঘটনায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি হান্নান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। আদালতে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
এসএম





