দীর্ঘদিন ধরে ভারমুক্ত হচ্ছে না পঞ্চগড়ের দু’টি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের পদ। সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিহীন জেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী দু’টি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী বিপাকে পড়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও মানা হচ্ছে না জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা। তবে অভিযোগ রয়েছে যে সরকারী দলের সর্মথক কতিপয় সহকারী শিক্ষকের দলীয় প্রভাব ও দাম্ভিকতার কারণে এখানে এসে টিকতে পারছেন না নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা। 

এমনকি প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করতে এসে দায়িত্ব বুঝে না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে  ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। ফলে তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে জেলা শহরের ঐহিত্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি।

সম্প্রতি প্রকাশিত এস. এস.সি. পরীক্ষার ফলাফলেও এর প্রভাব পড়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় সচেতন অভিভাবকরা। সরকারি সকল প্রকার সুযোগ সুবিধাপ্রাপ্ত  এই বিদ্যালয় দুটি দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সেরা ২০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান না পাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে অনেককেই।

সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৪ সালে জেলা শহরে স্থাপিত হয় পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৮১ সালে জাতীয়করণের পর থেকে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে এ পর্যন্ত ২২ জন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মধ্যে ১৪ জনই ভারপ্রাপ্ত। আর একজন প্রায়  ৫ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জাতীয়করণের পর এ পর্যন্ত ৩৩ বছরে একজন প্রধান শিক্ষকের প্রায় ৫ বছর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনসহ ২৩ বছর নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বাকী সময়টা বর্তমান পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা।

প্রায় ৩ বছর ধরে বিপি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কোন সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নেই। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহিন আকতার অন্যত্র বদলি হওয়ার পর মোহাম্মদ ছায়ফুল্লাহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০১২ সালের ৭ মে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ছায়ফুল্লাহ কে কৌশলে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করিয়ে সহকারী শিক্ষক মোঃ জোবায়ের ইসলাম বাদল প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৭ মাসের মাথায় অভ্যন্তরিন কোন্দলের কারণে আবারো রদবদল ঘটে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে। 

২০১২ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব পান মোঃ শহিদুল ইসলাম। এর অল্প কিছুদিন পরেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সহকারী  প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করে আবারো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদটি গ্রহণ করেন সহকারী শিক্ষক জোবায়ের ইসলাম বাদল।

সম্প্রতি গত  ২১ মে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেখা রাণী দেবীকে (সহকারী প্রধান শিক্ষক) পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করানো হয়।  সেখানে গিয়ে তিনি পদাধিকার বলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান।

অন্যদিকে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৫৬ সালে জেলা শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮১ সালে জাতীয়করণের পর থেকে এ পর্যন্ত ২৬ জন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যার মধ্যে ১৮ জনই ভারপ্রাপ্ত।  নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮ বছর।

বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে। গত ৬ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে কোন সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নেই। ২০০৮ সালের ১৮ জুন প্রধান শিক্ষক মোঃ সফিকুল ইসলাম অন্যত্র বদলি হওয়ার পর রেখা রাণী দেবী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ৩  জুন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন এস এম মোসলেম উদ্দিন।  ২০০৯ সালের ২ জুন আবারো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রেখা রাণী দেবী। এর মাঝে ২০১০ সালের ২ মার্চ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান ফেরদৌস আরা বেগম।

পরে পুনরায় ২৫ অক্টোবর ২০১০ সালে রেখা রাণী দেবী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সম্প্রতি ২১ মে তিনি পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শহিদুল ইসলাম।

দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চালানোয় এই বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণি পাঠদানে উদাসীনতা ও শিক্ষকদের নিয়মানুবর্তিতাসহ কোচিং বাণিজ্যে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি। এতে শিক্ষার মান ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে প্রায় তিন হাজার ছাত্রছাত্রী।

এ ব্যাপারে পঞ্চগড় জেলা শিক্ষা অফিসার এফ এ জব্বার জানান, আমি সবে মাত্র যোগদান করেছি এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরকারী নীতিমালার অজুহাতে সঠিক উত্তর দানে ব্যর্থ হন।

ঢাকা, ৬ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ