বিএনপির পক্ষ থেকে নতুন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারও বসে নেই। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে শীর্ষ নেতাদের নামে দায়ের করা পুরোনো মামলাগুলো সচল করার পাশাপাশি নতুন করে মামলা দিয়ে কাবু করতে চায় বিএনপিকে।
মামলার প্রশ্নে কেউ ছাড় পাবে না এমন বার্তা আগেই দেয়া হয়েছিল। সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্ট করে বলেছেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা করলে খালেদা জিয়াসহ কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। প্রশাসনের আচরণে মনে হয় সরকার মামলার জালে বিএনপিকে আটকাতে চায়।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আসামি করা না হলেও তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা রয়েছে। এসব মামলা রুজ্জু করা হয়েছিল মঈন উদ্দীন- ফখরুদ্দিন এর আমলে। এরমধ্যে বর্তমানে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন করার পর স্বাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
এছাড়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ১৫টি মামলা। সম্প্রতি ১টি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।জিয়া পরিবারের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধেও রয়েছে ৫টি মামলা।
৫ জানুয়ারির আগে পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে অসংখ্য মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে রয়েছে ৫২টি মামলা। এর মধ্যে ২৪টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেন (অর্থ পাচারের মামলায় এখন কারাবন্দী), এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে অন্তত ৫টি করে মামলা রয়েছে।
ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হয়েছে মামলার সেঞ্চুরি। হাফ সেঞ্চুরি হয়েছে অন্তত অর্ধশতাধিক নেতার।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এক হিসাব মতে, ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চার হাজার ৫৫১টি মামলা হয়েছে। যাতে আসামি করা হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার জনকে। তবে বিএনপির দপ্তর থেকে বলা হয়, তাদের এই হিসাব প্রাথমিক। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া জানান, সারা দেশে হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন করে 'মিথ্যা ও হয়রানিমূলক' মামলা বাড়ছে। এসব নিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এর প্রকৃত সংখ্যা কত, তা এখনো তারাও জানেন না।
এদিকে নতুন করে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পর সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলাগুলোয় দ্রুত অভিযোগপত্র দিচ্ছে। ঢাকায় গত কয়েকদিনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ১২ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ৪টি মামলায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারও শুরু হয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে বিএনপির মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো উদ্বেগ না থাকলেও বর্তমানে সরকারের এমন কঠোর মনোভাবে বেশ ভাবিয়ে তুলছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে। বিশেষ করে সম্প্রতি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ও খালেদা জিয়ার মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি। এর মাধ্যমে সরকার তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ব্যাপারে কঠোর বার্তাও দিয়ে রাখছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন। তাই তারা (আওয়ামী লীগ) ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এজন্য বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করতে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে বিভিন্ন অকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। সরকার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতৃত্বের নামে সাজানো মামলা দিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। কিন্তু জনগণের আন্দোলনে তাদের সেই চেষ্টা সফল হবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক সম্প্রচার নীতিমালা করে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে, বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নামে সাজানো মামলা দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার নীলনকশা করছে। কিন্তু জনগণ কখনো এ স্বৈরাচারি ব্যবস্থা মেনে নেয়নি, আগামী দিনেও মানবে না।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামছুজ্জামান দুদু বলেন, যখনই সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বলা হয়, তখনই সরকার পুরোনো মিথ্যা মামলাগুলো সচল করে, সেগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেওয়ানো হয়। আদালত তা গ্রহণ করেন—এসব যেকোনো স্বৈরাচারী সরকারের পুরোনো রাজনৈতিক অপকৌশল। বর্তমান গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন ঠেকানোর জন্য এসব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা ধোপে টিকবে না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, এই সরকার বিরোধীদলকে নির্মূল করার সব ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সরকার জনরোষ থেকে রেহাই পাবে না। জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আজ ঐক্যবদ্ধ। তারা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমেই তাদের অধিকার আদায় করে নিবে।
এমএইচ, জেএ





