নানাভাবে যাছাই বাছাইয়ের পর ছাত্রদলের কমিটির জন্য ২০ জনের একটি তালিকা হাতে পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে তালিকায় থাকা এসব নেতার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নন তিনি। ফলে দিচ্ছি দিচ্ছি করে এখনও আলোর মুখ দেখতে পারেনি কমিটি। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মন্দের ভাল হিসেবে এসব নেতার মধ্য থেকেই ঘোষণা করা হতে পারে ছাত্রদলের নতুন কমিটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনে ছাত্রদলের ব্যর্থতার ময়না তদন্তে গত ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে এক উন্মুক্ত বৈঠকে বসেছিলেন। সেদিনই বেরিয়ে আসে নেতাকর্মীদের নানা অনিয়ম ও সংগঠনের অব্যবস্থাপনার চিত্র।

ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের সংশ্লিষ্টতা, আন্দোলনের টাকা মেরে খাওয়া, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত, দীর্ঘ দশ বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি না হওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, এর আগের কমিটিগুলো করার সময় বিএনপি বা ছাত্রদলের সাবেক যে নেতাদেরকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা সবাই নিজের পছন্দ মতো পকেট কমিটি গঠন করেছেন। এবার সেই ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে চান বেগম জিয়া। আর একারণেই তিনি ছাত্রদলের কমিটির জন্য নেতা খোঁজার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও সাংবাদিক নেতাদের ওপর। যারা মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। 

দীর্ঘ দেড় মাস পরিশ্রম করে তিন দফা যাছাই বাছাইয়ের পর আড়াইশ' নেতাকর্মীর মধ্য থেকে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি তারা ১০০ জনের একটি তালিকা জমা দেন খালেদা জিয়ার হাতে। ওই তালিকার সঙ্গে বেশ কিছু সুপারিশও করেন কমিটির নেতারা।

পরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার আস্থাভাজন একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক দুই ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে তালিকাটি সংক্ষেপ করার দায়িত্ব দেন। তারা শিক্ষক-ছাত্র ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের সম্পর্কসহ বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করে ২০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেন। পাশাপাশি তারা ছাত্রনেতাদের বৈবাহিক অবস্থা, ছাত্রত্ব, বয়স, ক্লিন ইমেজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও দলবিরোধীকর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখেন।

একইসাথে বয়সের দিক দিয়ে যারা ৩৩ এর নিচে তাদেরকে কমিটিতে প্রাধান্য দিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সিনিয়রদের দেয়ার বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা একমত। সে অনুযায়ি একটি তালিকা তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে একটি সুত্র নিশ্চিত করেছে।

নতুন কমিটিতে থাকতে পারেন বলে যে ২০ জনের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- মামুনুর রশিদ মামুন (বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), আকরামুল হাসান (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), এজমল হোসেন পাইলট (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), সাদিউল কবির নীরব (ঢাবির সিনিয়র সহ-সভাপতি), নাজমুল হাসান (দপ্তর সম্পাদক)।এদের বয়স ৩৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

বায়েজিদ আরেফিন (আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক), আসাদুজ্জামান আসাদ (সমাজসেবা সম্পাদক), মামুন বিল্লাহ (সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক), মিয়া মুহাম্মদ রাসেল (ক্রীড়া সম্পাদক), মাহফুজুল ইসলাম মাহফুজ (মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক), বিএম নাজিম মাহমুদ (সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক), শামীম রেজা শামীম (ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক), ফারুক হোসেন (সদস্য), মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া (ঢাবি সাংগঠনিক সম্পাদক), মাহমুদুল হাসান হিমেল (গত কমিটির সদস্য)।এদের বয়স ৩০ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে।

এছাড়াও ৩০ বছরের কম বয়সী নেতাদের তালিকায় আছেন- আমির আমজাদ মুন্না (সদস্য), সরদার আমিরুল ইসলাম, আল মেহেদী তালুকদার, মনিরুজ্জামান রেজিন ও কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ।

তবে এতো যাছাই-বাছাইয়ের পর যাদের নাম তালিকায় রাখা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আন্দোলনের সময় মাঠে না থাকা, তদবিরবাজ। কেউবা বিবাহিত। কেউবা আবার ছাত্রলীগ, শিবিরের আশির্বাদপুষ্ট নেতা। সংস্কারপন্থী ছাড়াও কারো নামের সঙ্গে রয়েছে বডিগার্ডের উপাধি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসন্ন কমিটির তালিকায় যার নাম শীর্ষে তিনি হলেন বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকমামুনুর রশিদ মামুন। বিবাহিত এই নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে সুনিদৃষ্ট কয়েকটি অভিযোগ। নোয়াখালির লবিং সর্বস্ব নেতা হিসেবে রয়েছে ভালো খ্যাতি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্ভাব্য এই নেতা। টাইমনিউজবিডি'কে তিনি বলেছেন, একজন মুসলমান হিসেবে আমি নামাজ পড়ি। নামাজতো জামায়াত-শিবিরের না, যে এজন্যই আমার বিরুদ্ধে কারো আশির্বাদের অভিযোগ দেয়া হবে। যারা এসব অভিযোগ দেয় তারা আসলে দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টিতেই ব্যস্ত।

তিনি বলেন, বিয়ে করিনি অথচ ছড়ানো হয়েছে আমি বিয়ে করেছি। মনে হচ্ছে আমাকে এখন স্ত্রী-সন্তানের খোঁজে অভিযোগকারীদের দ্বারস্থ হতে হবে। অগণতান্ত্রিক সরকারের মোকাবেলায় দল যাকে যোগ্য বিবেচনা করে দায়িত্ব দিবে তার সাথেই তিনি কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানান।

টাকার বিনিময়ে জুয়েল-হাবিব কমিটিতে অনেককে পদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকআকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে সম্প্রতি তিনি বিয়ে করেছেন।

তবে বিয়ের বিষয়টি নাকোচ করে আকরামুল হাসান বলেন, আমি নিজেই যে কমিটির পদ প্রত্যাশী ছিলাম, সে কমিটির পদ কিভাবে বিক্রি করতে পারি? যখন আমার বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ উঠেছিল তখনই সংবাদ সম্মেলন করে আমি এর প্রতিবাদ করেছি। এমন ঘোষণাও দিয়েছিলাম যে, কেউ এর প্রমাণ দিতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব।

নতুন কমিটিতে স্থান পেতে যাওয়া ছাত্রদলের আরেক নেতা এজমল হোসেন পাইলটও বিবাহিত। তিনি বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

২০ জনের তালিকায় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান কমিটির দফতর সম্পাদকনাজমুল হাসান। সংস্কারপন্থী ছাড়াও তিনি বিয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত।

তবে অভিযোগ নাকোচ করে টাইমনিউজবিডি'কে তিনি বলেন, কেউ বড় হতে চাইলেই তার বিরুদ্ধে কমন কিছু অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তাকে যাচাই-বাছাই করেই বসানো হয়। বিয়ের বিষয়টিও অস্বীকার করেন নাজমুল হাসান।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দীন টুকুর বডিগার্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন ক্রীড়া সম্পাদকমিয়া মুহাম্মদ রাসেল। জানা গেছে, সাবেক ওই সভাপতির একক ইচ্ছায় দলের শীর্ষ পর্যায়ে স্থান পেতে যাচ্ছেন ছাত্রদলের এই নেতা।

নারায়ণঞ্জের কমিটি দেয়ার সময় টাকা নেয়ার অভিযোগ আছে মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদকমাহফুজুল ইসলাম মাহফুজের বিরুদ্ধে।

ঢাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদকমিনহাজুলইসলামভূঁইয়ার উপর ভিন্ন একটি ছাত্র সংগঠনের আশির্বাদ রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংগঠন বিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যায়িত করে মিনহাজুলইসলাম টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, কারো কাছে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে সেটা দলের হাইকমান্ডকে জানানো উচিত। যাতে তারা কমিটি গঠনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কমিটিতে যারাই আসবে আমি তাদের সাথে আকাত্ম হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।

আসন্ন কমিটির সম্ভাব্য নেতা আল মেহেদী তালুকদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ছিনতাই ছাড়াও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। চানখারপুল এলকায় একটি গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটকের পর মুচলেকা দিয়ে তাকে থানা থেকে মুক্ত করেছিলেন বর্তমান কমিটির এক শীর্ষ নেতা।

গত কমিটির সদস্যমাহমুদুলহাসানহিমেল স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি। বর্তমানে তিনি কোর্ট থেকে জামিনে আছেন।

ঢাকা, এআর, ২৭ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) //এনএস