বাড্ডায় ছেলেধরার গুজবে তাসলিমা বেগম রেনুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির নামে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেছে ১২ জনকে। এর মধ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদের রয়েছেন।
পুলিশ বলছে, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ওই নেতাসহ সব আসামীকে ভিডিও ফুটেজ দেখে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদেরও খোঁজা হচ্ছে।
‘২০ জুলাই সকালে যা ঘটেছিল’
গত ২০ জুলাই উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সন্তানের ভর্তির তথ্য নিতে গিয়ে ছেলে ধরা সন্ধেহে হামলার শিকার হন তাসলিমা বেগম রেনু। পরে রেনুকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বেশ কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা বলেন, এরকম কোনো ঘটনা যাতে আর জীবনে দেখতে না হয়। সেদিনের সময়টা ছিল দুঃস্বপ্ন। এমনদিন কারও জীবনে যাতে না আসে। এখন তো ভয় হচ্ছে, রেনুর মত আমাদেরও না বিপদে পড়তে হয়।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন, ঘটনার দিন সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষার্থীদের পিটি শেষ হয়। এরপর সবাই ক্লাসে যায়। প্রধান শিক্ষকের কক্ষের পাশে শিক্ষকদের বিশ্রাম কক্ষে হাজিরা খাতা নিতে গিয়ে দেখি, তিনজন নারী অভিভাবক আরেক নারীকে নিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, তিনি নাকি উল্টাপাল্টা কি বলছেন। তাকে অনেকেই ছেলেধরা সন্দেহ করছে। তাই ওনাকে ম্যাডামের কক্ষে নিয়ে যাচ্ছি। এরপর চার নারীকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে আমি নিয়ে যাই। ম্যাডাম ওনাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার বাড়ি কোথায়, আপনি কি এর আগে আমাদের কাছে এসেছিলেন? আপনার কারও মোবাইল নম্বর দেন আমরা ফোন করি। উনি কোনো তথ্য না দেওয়ায় একটা সাদা কাগজে উনার নাম-ঠিকানা লিখতে বলেন ম্যাডাম। উনি নাম-ঠিকানা লিখছিলেন। এরই মধ্যে গফুর নামে আরেক সহকারী শিক্ষক এসে বলেন, শত শত লোক স্কুলে প্রবেশ করেছে। এই মহিলা নাকি ছেলেধরা। তখন উপস্থিত সবাই ওই মহিলাকে বাঁচানোর চেষ্টা করি, কিন্তু তার আগেই সকলকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে উনাকে টেনে হিঁচড়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায়। আমরা যে নিচে যাব তারও কোনো উপায় ছিল না। এরই মধ্যে ম্যাডাম পুলিশকে ফোন করেন। প্রত্যেকটা শ্রেণিকক্ষে শিশু শিক্ষার্থীরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় ওইসব শিক্ষার্থীদের বাঁচানোটাই ছিল বড় দায়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ রহমান বলেন, কেচিগেটের তালা ভেঙে দ্বিতীয় তলায় আমার কক্ষে উঠে আসে বহিরাগতরা। তারা আমাদের সবাইকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। ভাঙা তালা থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
‘রেনু হত্যা ঘটপনায় পুলিশ যা বলছে’
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবের জের ধরেই রেনুকে দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এরই মধ্যে গুজব ছড়িয়ে আবারও কেউ যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে সেজন্য আমরা এলাকায় মাইকিং করেছি। এছাড়া এলাকার মানুষদের সাথেও পুলিশ যোগাযোগ রাখছে যেন যেকোনো পরিস্থিতি সবাই মিলে মোকাবিলা করা যায়।
‘স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে যে ভাবে রেনুকে টেনে হিঁচড়ে নামায় নামানো হয়’

বাড্ডা থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ইয়াছিন গাজি বলেন, রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডার স্বাধীনতা স্মরণির স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে ৫/৭ জন লোক তাসলিমা বেগম রেনুকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে নামায়। এরপর তারা রেনু বেগমকে উপর্যুপরি মারতে থাকে। মাঝখানে মারধর থামলেও ওই আজাদই এলাকার হৃদয় নামের একজনকে নিয়ে রেনুর মাথা বিদ্যালয়ের দেয়ালে জোড়ে ধাক্কা দেয়। এতে তার মাথা থেঁতলে যায়।
ইয়াছীন গাজী আরও বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও রয়েছে। ওই এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে আজাদ চাঁদাবাজি করতো। এছাড়াও সে নানান অপরাধে জড়িত ছিল।
‘রেনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার যারা’
রাজধানীর বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনুকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, রেনু হত্যায় অন্যতম অভিযুক্ত মোছা. রিয়া বেগম ওরফে ময়নাকে (২৭) গ্রেফতার হৃদয় (প্রধান আসামি), ওয়াসিম (১৪), মুরাদ (২২), সোহেল রানা (৩০), বিল্লাল হোসেন (২৮), আসাদুল ইসলাম (২২) রাজু আহমেদ (২৩)। মো. কামাল, আবুল কালাম আজাদ, বাচ্চু, শাহীন ও বাপ্পী।
‘ছেলে ধরা গুজবে সারা দেশের অবস্থা’
রাজধানীসহ সারাদেশে ছেলে ধরা সন্দেহে নারীসহ সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নয় জেলায় ৩০ জনকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। এদের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ছয়, রাজশাহীতে পাঁচ, বগুড়ায় চার, নীলফামারীতে চার, কুমিল্লায় চার, চট্টগ্রামে তিন, সাভারে দুই, মাদারীপুর ও নেত্রকোনায় একজন করে আহত হয়েছেন। পিটুনি থেকে রেহাই পাচ্ছে না মানসিক ভারসাম্যহীন বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও। সুনামগঞ্জে ফেসবুকে ‘কল্লা কাটা’ শিরোনামে কবিতা লেখায় একজন ও ময়মনসিংহের তারাকান্দায় সন্দেহজনকভাবে একজনকে আটক করা হয়েছে।
এসএম





