আজ সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির তিন বছর পূরণ হল। কিন্তু আজও বিচারের দাবিতে নিভৃতে কাঁদে স্বজনদের চোখ। নিরবে শুধু কেঁদে যান কিছুই করার নেই। আজ তিন বছর হয়ে গেল কিন্তু বিচারের কোন অগ্রগতি নেই সেই ঘাতক রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার।
সালের ২৪ এপ্রিল ধসে পড়ে ঢাকার অদূরে সাভারের রানা প্লাজা। এ ঘটনায় এগারোশত জনের বেশি শ্রমিক মারা যান এবং শত শত শ্রমিক আহত হোন। এর মধ্যে হাত-পা হারিয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ জনের মত। রানা প্লাজায় কয়েকটি গার্মেন্টস কোম্পানিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।
আজ রোববার সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসের সেই স্থানে বসে বসে কাঁদতে থাকেন অনেকেই। এর মধ্যে আগের স্মৃতি স্বরণ করতে গিয়ে কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে যান ঘটনাস্থলেই।
শাহানা আক্তার। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সকালেই এসেছেন রানা প্লাজার ধ্বংসের সেই স্থানে। খুব কষ্টে দিন কাটালেও আজ এখানে এসেছেন তিনি। কারণ তার স্বামী মো. হেলাল ‘রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে’ মারা যায়। উদ্ধারের সময় তার স্বামী আগুনে পুরে মারা যায়। সাহায্য সহযোগীতা তেমন পায়নি হেলালের পরিবার শাহানা এবং তার ছেলে-মেয়ে।

কিন্তু এখন আর সাহায্য চান না শাহানা। এখন শুধু চান ঘাতক রানার বিচার। যার কারণে তার পুরো দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, তার ছেলে-মেয়ে এতিম হয়েছে সেই রানার ফাঁসি চায় শাহানা।
শাহানার পাশে দাড়িয়ে কাদছিলেন আরেক জন। যিনি স্বামী মারা যাবার পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন ভবিষ্যতের। তার নাম শাহিদা বেগম। এই ট্রাজেডিতে মারা যায় তার একমাত্র মেয়েট্ কিন্তু মেয়ের লাশ বা সহযোগিতা কিছুই পাননি তিনি।
সাংবাদিকদের দেখলেই অঝোরে কাদতে থাকেন শাহিদা বেগম। সাংবাদিকরা তাদের পেশার খাতিরে কিছু জানতে চাইলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার বাবার হত্যার বিচার করতে পারেন এতো বছর পর। বিন্তু আমাদের এতোগুলো পরিবারকে যে হত্যা করলো তার বিচার কি আমরা পাব না। এই সোহেল রানা তো আপনাদের (জেলে) কাছেই আছে। তার বিচার করতে এতো দেরি হচ্ছে কেনো।
কথা বলতে বলতেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এর পর কয়েকজন মিলে তাকে ধরে প্রথমিক চিকিৎসা সেবা দিলে তিনি জ্ঞান ফিরে পান।
আরেকজন মহিলা শ্রমিকের নাম রেহেনা আক্তার। এক পা হারিয়ে আজ পঙ্গুত্বের জীবন অতিবাহিত করছেন। বর্তমান বেকার জীবনের আগে তিনি দশ হাজার টাকা পেতেন।কিন্তু পা হারিয়ে এখন আয়-রুজি থেকে বঞ্চিত এই মানুষটি। চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে টাকা। সরকার দশ লক্ষ্য টাকা ডিপোজিট করে দিলেও এর থেকে যেই টাকা পান, তার থেকে চিকিৎসা খরচ বাদ দিলে কম টাকাই থাকে সংসারের জন্য।
তিনি বলেন, যারা মারা গেছে তারা পেয়েছে ত্রিশ লক্ষ্য টাকা আর আমরা পাইলাম দশ লক্ষ্য। কিন্তু চিকিৎসা করে তেমন টাকা আমার থাকে না। এমপি সাহেবরা বলে বেড়ান প্রত্যেককে ৭৪ লক্ষ্য টাকা করে দিছে কিন্তু এই টাকা কই। আমাদের মতো গরিবের টাকা মেরে খেতে তাদের লজ্জা লাগেনা।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এর চাইতে অনেকে আরো বেশি কষ্টে রয়েছেন। যাদের কাছে গাড়ি ভাড়া দিয়ে সাভারে এসে টাকা নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। কারণ তারা জানেন, তারা সরকারের কেউ নন, নন তারা প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়। তাই তাদের ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও নেই।
আজ ২৪ এপ্রিল পার হয়ে গেলেই এই সকল শ্রমিকের কান্নার আওয়াজ শোনার মানুষও হারিয়ে যাবে। কিন্তু যাই হোক এই অসহায় মানুষদের প্রতি সরকার যেন নিজ দায়িত্বে খোঁজ খবর নেয়, তাদের সাহায্য, সহযোগিতা এবং পুনর্বাসন করা হয় এই আশা আমরা সবাই করি।
এছাড়া আর কেউ যেন রানা প্লাজা ট্রাজেডি না ঘটে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে।
ইআর





