গত ৫ই জানুয়ারি-২০১৩ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনকে ঘিরেই দেশে যত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। শুরু থেকেই তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট এ নির্বাচনকে একদলীয় নির্বাচন বলে মেনে নেয়নি। এ নির্বাচনে দেশের উল্লেখযোগ্য সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। যদিও সরকার সংবিধান মেনেই নির্বাচন করেছে এবং সকলের অংশ গ্রহণ কামনা করেছিলো।
খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, তারেকের ফর্মূলা অনুযায়ী নির্বাচন বর্জন করে এখন তারই মাশুল গুনছে বিএনপি।বিএনপি ধ্বংসের জন্য খালেদা-তারেকই যথেষ্ট।বিএনপি আন্দোলন করে খালেদা-তারেকের মামলা প্রত্যাহারের জন্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য নয়।
কিন্তু বিরোধী দলগুলোর প্রধান দাবি ছিল নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, যে নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। বিগত বেশ কিছু জাতীয় নির্বাচন ধারাবাহিকভাবে এ পদ্ধতি অনুসারে হয়েছিল। ২০ দলীয় জোটের বক্তব্য ছিলো এ নির্বাচনে জনগণের ভোটে যে দল বিজয়ী হবে সেটাই আমরা মেনে নেবো। বিএনপি বলে এ দাবি মানতে সরকারের আপত্তি কেন?
এ দাবি আদায়ের লক্ষে বিএনপি জোট তখন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে অবরোধ ও হরতালসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। ঠিক সে সময় রাজনৈতিক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির কারণে জীবন প্রদীপ নিভে গিয়েছিলো বহু মানুষের। অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল দেশ। জনজীবনে নেমে এসেছিল বেকারত্ব ও দূর্ভোগ। এভাবে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই দেশ মহা-সংকটে পড়েছে। যে দাবি আদায়ের জন্য সহিংসতার কবলে পড়েছিল দেশ জাতি কিন্তু সরকার সে দাবি আদৌ মেনে নেয়নি।
সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্য হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের কিছু থাকলেও তা মারা গেছে। মৃত বিষয় নিয়ে কান্না-কাটি করলে কোনো লাভ নেই। এতে স্পষ্টতই বলা যায় এ দাবি পূরণের সম্ভাবনা খুবই কম।
গত বছরের ৫ জানুয়ারি ব্যাপক সাহসিকতার মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে সরকার গঠন করেছিল। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি সরকারের এক বছর পূর্তি হয়েছে।
বিএনপি বলেন, দাবি পূরণের জন্য সরকারকে এক বছর সময় দেয়া হয়েছে, আর নয়। বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি 'গণতন্ত্র হত্যা ও কালো পতাকা দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ২০ দলীয় জোট। রাজধানীতে এ কর্মসূচি পালনের জন্য সমাবেশের সিদ্ধান্তও নেয় বিএনপি জোট। কিন্তু ডিএমপি কোনো ধরণের অনুমতি দেয়নি তাদের।
৩জানুয়ারি শনিবার রাত আনুমানিক ১২টা হতে তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তালা লাগিয়ে দেয়া হয় তার কার্যালয়ের গেটে। বার বার বের হওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশি বাধার কারণে বের হতে পারেননি খালেদা। এসময় তার কার্যালয় ঘিরে ব্যাপক পুলিশ অবস্থান নেয়। ইট, বালু ও খোয়া ভর্তি ১৩টি ট্রাক দিয়ে তার কার্যালয়কে অবরুদ্ধ করা হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রি বলেছেন, খালেদা অবরুদ্ধ নন। তার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয়নি। তিনি চাইলে তার বাসায় যেতে পারেন।
ঠিক একইভাবে ২০১৩ সালে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে তার বাসায় তাকে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি একই দিন বিএনপি 'গণতন্ত্র হত্যা ও কালো পতাকা দিবস' এবং ক্ষমতাসীন আ.লীগ 'গণতন্ত্রের বিজয় দিবস' -এর কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বী-মুখি এমন সিদ্ধান্তের কারণে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। রাজধানী জুড়ে নিষিদ্ধ করা হয় সকল দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল।
কিন্তু ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাজধানীতে সভা-সমাবেশ ও মিছিল করতে দেখা গিয়েছে ক্ষমতাসীন আ.লীগ ও তার অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীদের। জানতে চাইলে আওয়ামী নেতারা বলেন, তারা সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন।
সরকার পতনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়া তার কার্যালয় থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন। এতে সারাদেশ অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং কর্মজীবী মানুষ নানা দূর্ভোগে পড়ে। প্রতিনিয়তই চলছে পুলিশ ও অবরোধকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ। এতে আহত ও নিহত হচ্ছেন নেতাকর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষ।
এ অবরোধে বেড়ে গিয়েছে নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। রীতিমত জনজীবন দূর্বিসহ হয়ে ওঠেছে। এভাবে চলতে থাকায় দেশের উন্নয়নের স্বাভাবিক গতি ব্যহত হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও অর্থনীতি।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, 'অবৈধ সরকার বন্দুকধারীদের মতো জোর করে ক্ষমতায় টিকে আছে।আমাদের কর্মসূচি স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।তাই সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।'
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা জনপ্রতিনিধি ও জনগণের দায়িত্বশীল। তাদের কী এমন বিবেক নেই? যে বিবেক দেশের মানুষের কল্যাণে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এগিয়ে আসে। বিবেক যদি হয় মানুষের সর্বোচ্চ আদালত, তাহলে আর কবে সে আদালত একটি রায় দিবে। যে রায়ে দেশের মানুষের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি ফিরে আসবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে তাদের মধ্যে কবে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে? ক্ষমতাসীন আ.লীগ জোট ও বিরোধী বিএনপি জোট যদি দায়িত্বশীল হয়ে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করত তবে দেশে আজ হরতাল, অবরোধ ও জ্বালাও পোড়াওসহ কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হত না।
দেশে সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ বার বার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। পাল্টা-পাল্টি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে চলছে দেশ।
এমকে





