সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান অভিযানের পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতবাক হয়েছে আমেরিকাসহ পুরো পশ্চিমা বিশ্ব। বিমান অভিযান শুরুর ছয় দিন পর ৫ অক্টোবর সিরিয়ায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করা হয়। পরে গত ৭ অক্টোবর সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। সে দিন উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র ১১টি অবস্থান লক্ষ্য করে কাস্পিয়ান সাগর থেকে রাশিয়া উচ্চ প্রযুক্তির ২৬টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কাস্পিয়ান সাগরে থেকে ইরান ও ইরাকের ওপর দিয়ে ১,৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিরিয়ার রাকা, আলেপ্পো ও ইদলিব প্রদেশের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র অবস্থানে সফলভাবে আঘাত হানে। এরপর পশ্চিমা বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে, আশ্চর্যজনক এ প্রযুক্তি কবে হস্তগত করল রাশিয়া! প্রেসিডেন্ট পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া সামরিক ক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছে তা নিয়েও গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

এর পাশাপাশি সিরিয়া ইস্যুতে মূলত ত্রুপের তাস খেলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার সূক্ষ্ম রাজনীতি ও সমরনীতির কাছে মার খেয়ে গেছে আমেরিকা, ইসরাইল এবং তাদের মিত্রগোষ্ঠীর চাল। সিরিয়া ইস্যু নিয়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ব্যাপকভাবে দেশে-বিদেশে সমালোচিত তখন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সব জায়গায় হিরো। মাঠে ময়দানে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকা।

বলা চলে, এ মুহূর্তে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী ন্যায্য লড়াইয়ের অগ্রভাগে পুতিন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদেরও ক্ষমতা অনেকটা পাকাপোক্ত। এ নিবন্ধে রাশিয়ার সাম্প্রতিক কিছু সাফল্য এবং ওবামা-পুতিনের রাজনীতির তুলনামূলক একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব।      

এলিট ক্লাবের সদস্য রাশিয়া: মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ও পশ্চিমা কোনো কোনো গণমাধ্যম বলেছে এসএস-এন-৩০ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে রাশিয়া। আবার ওয়াশিংটন পোস্টসহ কোনো গণমাধ্যম বলছে-৩এম২১ই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করেছে রুশ বাহিনী। তবে যে ক্ষেপণাস্ত্রই ব্যবহার করা হোক না কেন তাতে হতভম্ব হয়ে পড়েছে আমেরিকা। সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার উৎকর্ষতায় বিস্মিত হয়েছেন পশ্চিমা গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারাও।

এর মূল কারণ হচ্ছে -সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া যে সামরিক ক্ষেত্রে এতটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা গোটা বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকার ধারণার বাইরে ছিল।

রাশিয়া ভেতরে ভেতরে সামরিক দিক দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। ১,৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে অত্যন্ত সফলভাবে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সিরিয়ায় হামলা করার পর রাশিয়া এখন ‘সুপার এলিট ক্লাব’র সদস্য। কারণ এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শুধুমাত্র আমেরিকা ও তার একান্ত মিত্র ব্রিটেনের কাছে আছে এবং এর আগে তারাই শুধুমাত্র এ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ব্যবহার করেছে।

রাশিয়ার নতুন এ ক্রুজ এ ক্ষেপণাস্ত্রের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২০ ফুট ২ ইঞ্চি, লাঞ্চ টিউবের ব্যাস হচ্ছে ২ ফুট, ক্ষেপণাস্ত্রের নিজের ওজন ৩৪৬১ পাউন্ড, বিস্ফোরক বহন ক্ষমতা ১,০০০ পাউন্ড। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বনিম্ন ৬০ ফুট এবং স্থলভাগ থেকে ১৭০ ফুট উচ্চতায় উড়তে পারে। সাবসনিক এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতি সেকেন্ডে ৬৫০ থেকে ৮৮০ ফুট গতি চলতে পারে। এ ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে অনায়াসে।

জাহাজ থেকে নিক্ষেপের পর রাশিয়ার উচ্চ প্রযুক্তির এ ক্ষেপণাস্ত্র তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে পূর্বনির্ধারিত সূচি ও গতিপথ অনুয়ায়ী শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ও রাডারের মতো হুমকি এড়িয়ে বেশিরভাগ সময় স্বাধীনভাবে চলতে পারে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে- মাঝ পথে গিয়ে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবহার করে এ ক্ষেপণাস্ত্র তার গতিপথ আপডেট করে নিতে পারে। অনেক নিচু দিয়ে উড়তে পারে বলে শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তেমন একটা কার্যকরী নয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে পূর্ব নির্ধারিত ইমেজ ব্যবহার করে শত্রুর অবস্থানে আঘাত হানে। সম্পূর্ণ অজানা লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত করতে পারে এ ক্ষেপণাস্ত্র।

৭ অক্টোবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা পরিচালনার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এছাড়া, সিরিয়া অভিযানে সুখোই-এসইউ-৩৪ বিমানসহ যেসব জঙ্গিবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে এর আগে কখনই তা যুদ্ধে ব্যবহার করেনি রাশিয়া।

আমেরিকার আধিপত্য শেষ: অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলেছেন, রাশিয়ার হাতে আগে যে এসএস-এন-৩০ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল তা ছিল জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং এর পাল্লা ছিল ১৫০ মাইল বা তার কাছাকাছি। কিন্তু নতুন এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১,০০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে।

এছাড়া, এর বড় একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। এ বোমা হামলা সফল হওয়ার পর রাশিয়া মূলত মার্কিন ‘টোমাহক ক্রুজ’ ক্ষেপণাস্ত্রের সমপর্যায়ের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অর্জন করেছে। সাধারণত শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকে টোমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকমাত্রায় ব্যবহার করে। এরপর আমেরিকা বিমান হামলা শুরু করে।

আমেরিকা এ ধরনের হামলা চালিয়েছিল ইরাক ও আফগানিস্তানে। সিরিয়ায় আইএস’র অবস্থানেও এমন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করে তারা; তবে তার কোনো নমুনা দেখা যায় নি। যাহোক, দূর পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি রাশিয়ার হাতে চলে যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে পেন্টাগন। ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে এতদিন আমেরিকার যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিলতা ভেঙে এবার গেল।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রুশ নৌবাহিনী: মজার তথ্য হচ্ছে- সিরিয়া অভিযানে রাশিয়া যেসব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে তার বেশিরভাগই বাইরের জগতের কাছে অপরিচিত। ৭ অক্টোবরের আগে রাশিয়ার এ ক্ষেপণাস্ত্রও অপরিচিত ছিল। এমনকি রুশ অস্ত্রের বিষয়ে যারা গভীরভাবে নজর রাখেন ও পর্যবেক্ষণ করেন তারাও বিস্মিত হয়েছেন এ ক্ষেপণাস্ত্র দেখে।

রাশিয়া যখন দিনের বেলায় এ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করেছে তখন তা ছিল একবারেই দৃশ্যমান; গোপন কিছু নয়। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দ্যা ডেইলি বিস্ট পত্রিকাকে বলেছেন, “এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাশিয়ার শক্তি প্রদর্শন, তারা দেখিয়ে দিল যে, মস্কো অনেক শক্তি অর্জন করেছে।”

কোনো সন্দেহ নেই- সুদূর কাস্পিয়ান সাগর থেকে সিরিয়ায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের মধ্যদিয়ে সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার উন্নতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আড়াই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এ হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। নিজ ভূখণ্ডের বাইরে অভিযান চালানোর সক্ষমতা যে রাশিয়ার আছে তা সিরিয়া অভিযানের মধ্যদিয়ে ফুটে উঠেছে।

এ অভিযানের মধ্যদিয়ে রাশিয়া নিজের নতুন সমরাস্ত্র, রণ-পদ্ধতি এবং রণকৌশলকে প্রকাশ্যেই প্রদর্শন করেছে। এর আগে যুদ্ধবিমান মোতায়েনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রুশ নৌবাহিনী। রুশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে সিরিয়ার লাতাকিয়ার একটি বিমানঘাঁটি এবং তারতুসে রুশ পুরনো নৌঘাঁটিতে সামরিক সরঞ্জাম এবং রসদ সরবরাহ করা হয়েছে।

সিরিয়ায় রুশ সামরিক অভিযানে দেশটির নৌবাহিনী মৌলিক ভূমিকা পালন করে চলেছে। রাশিয়ার হাতে রয়েছে ৬৩টি সাবমেরিন। নতুন আরো সাবমেরিন তৈরির কাজ চলছে। এছাড়া, ছোট বড় নানা ধরনের যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে দেশটি।

এর মধ্যে ফ্রান্স থেকে দুটি যুদ্ধজাহাজ কেনার চুক্তি করলেও মার্কিন চাপের মুখে তা রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে নি ফ্রান্স; অর্থ ফেরত দিয়েছে। সিরিয়ার উপকূলে রুশ নৌবাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান বিশ্ববাসীকে নতুন বার্তাই দিচ্ছে।

কেন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র করল রাশিয়া?: সিরিয়ায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে রাশিয়া যে সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। তবে এর মধ্যে অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালালো রাশিয়া? এর জবাব দিয়েছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

রুশ মন্ত্রণালয় বলেছে-“রাশিয়ার নজরদারি সংস্থাগুলো সিরিয়ার সন্ত্রাসীদের কাছে এমন কিছু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দেখতে পায় যেগুলো খুব দ্রুত ধ্বংস করা দরকার ছিল।”

রুশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন, গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, রেডিও ইন্টারসেপশন এবং স্থল গোয়েন্দারা রুশ সামরিক পরিকল্পনাকারীদেরকে হামলার লক্ষ্যবস্তু ঠিক করতে সহায়তা করে। এ হামলার মাধ্যমে রাকা, আলেপ্পো ও ইদলিব প্রদেশে সন্ত্রাসীদের গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক তৈরির কারখানা, কয়েকটি কমান্ড সেন্টার, গোলাবারুদের ডিপো, অস্ত্র ও মজুদ জ্বালানি তেল এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ধ্বংস হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট ১১টি লক্ষ্যবস্তুর সবগুলোই ধ্বংস হয়েছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায়।

ছোট জাহাজ বড় ক্ষেপণাস্ত্র: রাশিয়া শুধু দূরপাল্লার এই বিস্ময়কর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রই আবিষ্কার ও তার সফল ব্যবহার করে নি বরং আরো চমৎকার একটি সাফল্য রয়েছে তাদরে ভাণ্ডারে। সেটি হচ্ছে- তুলনামূলক অনেক ছোট জাহাজ থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে রাশিয়া যা অনেকের পক্ষে চিন্তা করাও অসম্ভব। টোমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে মার্কিন নৌবাহিনী বিশাল আকারের ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার এবং সাবমেরিন ব্যবহার করে থাকে।

আর এসব নৌযান সাধারণ কমপক্ষে ৫০০ ফুট লম্বা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সময় প্রায় ৯,০০০ টন পানি স্থানচ্যুত হয়। অন্যদিকে, এস এস-এন-৩০ মডেলের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার বিষয়ে চারটি নতুন যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করেছে রাশিয়া যা ছিল অনেক ছোট। এসব জাহাজ লম্বায় ২০০ থেকে ৩০০ ফুট এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সময় ১,৫০০ টনের বেশি পানি স্থানচ্যুত হয়নি।

রাশিয়ার এই সাফল্যে অবাক হওয়ার বড় কারণ হচ্ছে ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় তারপর থেকে রুশ জাহাজ নির্মাণশিল্প দীর্ঘ দিন মারাত্মক রকমের ভোগান্তির মধ্যে ছিল। পরে ক্রেমলিন সে অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। বিশেষ করে পুতিন ক্ষমতায় আসার পর রুশ জাহাজ নির্মাণশিল্প থেকে শুরু করে পুরো সামরিক খাত নতুন গতি পেয়েছে। তবে সম্প্রতি রাশিয়া যেসব জাহাজ তৈরি করেছে তারই সবই বলা যায় তুলনামূলক ছোট। এ তথ্য দিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডেভিস সেন্টার ফর রাশিয়ান অ্যান্ড ইউরেশিয়ান স্টাডিজ’র অধ্যাপক দিমিত্রি গোরেনবার্গ।

কিন্তু ৭ অক্টোবর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, রাশিয়া যেসব ছোট ছোট যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে তা বেশ শক্ত-সামর্থ্যের সঙ্গেই দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে এবং তার ধ্বংস-শক্তিও অতুলনীয়। এক সময় এ কাজটি শুধুমাত্র আমেরিকা ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা করতে পারত; এখন তাতে ভাগ বসাচ্ছে রাশিয়া।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কাস্পিয়ান সাগর থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে রাশিয়া যে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সফল হামলা পরিচালনা করেছে তাতে মস্কো আবার নিজেকে আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করল। এ বিষয়ে পুতিন প্রশাসন অনেক বেশি সিরিয়াস।

দুঃসাহসিক অভিযান চালাচ্ছে এমআই-২৪: সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রুশ জঙ্গিবিমান ও হেলিকপ্টার গানশিপগুলো ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে। তবে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এরইমধ্যে এমআই-২৪ ‘হিন্দ’ অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিশেষ নজর কেড়েছে।

সন্ত্রাসীদের আস্তানা লক্ষ্য করে এ হেলিকপ্টার কখনো আকাশের নিরাপদ উচ্চতায় থেকে হামলা চালাচ্ছে আবার কখনো একবারে বলা যায় মাটি ঘেঁষে অভিযান চালিয়ে শত্রু শিবির লন্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে মাত্র মাটি থেকে কয়েকফুট উঁচু দিয়ে উড়ে রকেট ও গোলা ছুঁড়ে অভিযান পরিচালনা করছে এমআই-২৪।

সন্ত্রাসীদের এন্টি-এয়ার ক্র্যাফ্ট গানকে তোয়াক্কা না করে নির্দ্বিধায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এত নিচু দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে অভিযান পরিচালনা রাশিয়ার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা বলছেন, এমআই-২৪ হেলিকপ্টারের বেশি বেশি কার্যকর অভিযান পরিচালনার কারণে সন্ত্রাসীরা হয়ত ‘ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ এর চাহিদা বাড়িয়ে দেবে।

সন্ত্রাসীরা যদি একবার যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ব্যবহার করা শুরু করে তাহলে রুশ হেলিকপ্টারের জন্য তা বিপদের কারণ হয়ে উঠবে।

পশ্চিমা অপপ্রচার: সিরিয়ায় রুশ হামলা শুরুর মধ্যদিয়ে মূলত কূটনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে আমেরিকা। সেইসঙ্গে পরাজয় বয়ে এনেছে আমেরিকার মিত্রদের জন্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা চটজলদি নানা অপ্রচারের পথ বেছে নিয়েছে।

প্রথমে হুমকি ধমকি দিয়েছে রাশিয়াকে। হামলার পথ থেকে সরানো না গেলে বলা শুরু করেছে- রুশ হামলায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে; আইএস আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে ইত্যাদি। মূলত এসবই পশ্চিমাদের শক্তিশালী মিডিয়ার প্রচারযুদ্ধ।

তাদের অপপ্রচারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- “রাশিয়া আইএস’র বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে না; হামলা চালাচ্ছে মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহীদের ওপর।” মস্কো এ কথার সোজাসাপ্টা জবাব দিয়েছে এই বলে যে, তারা প্রেসিডেন্ট আসাদের সমর্থনে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে।

অতএব, যারাই আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে তারাই রাশিয়ার আল্টিমেট টার্গেট হবে। শুধু তাই নয়; রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলেছেন-“ভালো সন্ত্রাসী এবং খারাপ সন্ত্রাসীর সংজ্ঞা কী?” মস্কোর এ ধরনের কথাবার্তায় লা জবাব হয়েছে আমেরিকা। সুবিধা করতে না পেরে বেছে নিল রাশিয়ার অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে অপপ্রচারণার পথ। কা

স্পিয়ান সাগর থেকে যে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালালো রাশিয়া তার বিরুদ্ধে বক্তব্য ছুঁড়লো -এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। ২৬টি ক্ষেপণাস্ত্রের চারটি ভেঙে পড়েছে ইরানের ভূখণ্ডে। ইরান জবাব দিল তাদের ভূমিতে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ভেঙে পড়েনি। তখন চুপ হলো আমেরিকা। এখন নতুন প্রচারণা শুরু করেছে- রাশিয়ার বিমান ও সামরিক সরঞ্জাম সিরিয়ার প্রতিকূল আবহাওয়া ও ধুলোবালিতে কার্যকরিতা হারাচ্ছে। কী চমৎকার কৌশল! তবে একথা অনেকেরই জানা, নিজের ছাড়া অন্যের কারোরটা উন্নত নয় কিংবা উপযুক্ত নয় -এমনটা বলে বেড়ানো সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার চিরকালের স্বভাব।

ধারণা করি, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের খুব ভালোভাবে জানা আছে তা। খোদ নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমেরিকার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে রাশিয়া। অতএব,পুতিন মার্কিন প্রচারণায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অটল থাকবেন এবং সিরিয়া মিশন শেষ করবেন এমন ধারণা মোটেই বাড়তি কিছু নয়।

পুতিনের প্রতি জনসমর্থন: আলোচনার শেষ দিকে সামরিক দিক ছেড়ে একটু রাজনীতির দিকে নজর বুলিয়ে নেয়া যায়। সিরিয়ার বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং বৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিষয়ে অনুসৃত নীতির কারণে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজ দেশ নানামুখী সমালোচনার মুখে রয়েছেন তখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ায় ন্যায্য অভিযান চালিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে ‘হিরো’ বনে গেছেন।

পুতিনের অভিযানের সিদ্ধান্ত ন্যায্য এ কারণে যে, তিনি সিরিয়ার সরকারের অনুরোধে দেশটিতে সামরিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আইএস-বিরোধী কথিত বিমান হামলার বিষয়ে না আসাদের অনুমতি নিয়েছে, না জাতিসংঘের অনুমতি নিয়েছে।

এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে হামলা চালানোর পরও যখন আইএস’র বিন্দুবিসর্গ ক্ষতি হয় নি তখনই পুতিন সুযোগটি নিয়েছেন। স্বল্প সময়ের রুশ হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়েছে সন্ত্রাসীদের অবস্থান। এখন পালিয়ে কূল পাচ্ছে না তারা। এতে মার্কিন আধিপত্য ক্ষুন্ন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ এবং অস্ত্রের যে ব্যবসা রয়েছে তাও কিছুটা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

দুই মেয়াদ পার করতে যাওয়া ওবামার জন্য বিষয়টি যতটা না ঝামেলার বিষয় তার চেয়ে বেশি ঝামেলার বিষয় হবে সামনে যারা মার্কিন ক্ষমতায় আসতে চান। অর্থাৎ তাদের সামনে পুতিনের মতো একটা শক্ত প্রতিদ্বিন্দ্বী তৈরি করে রেখে যাচ্ছেন ওবামা। এ ব্যর্থতা ওবামার; বহুদিন এ ব্যর্থতার দায় টানতে হবে আমেরিকাকে। এ অবস্থায় বলা যায়- সামগ্রিক রাজনীতিতে বিশ্ব অঙ্গনে ও দেশের ভেতরে এগিয়ে গেলেন পুতিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে রাশিয়া চলে গিয়েছিল খাদের কিনারে সেই রাশিয়াকে তিনি নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। বিশ্ব অঙ্গনে রাশিয়ার দায়িত্বও বাড়ছে দিন দিন।

ফলে নিজ দেশে পুতিনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে অনেক। এ মুহূর্তে রাশিয়ার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ পুতিনের সিরিয়া-নীতিকে সমর্থন করছেন। তারা পুতিনকে সমর্থন দিচ্ছেন।

অন্য এক জরিপে দেখা যাচ্ছে-সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন শতকরা ৭২ ভাগ রুশ নাগরিক। কয়েকদিন আগে রাশিয়ার স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ‘রাশিয়ান পোলেস্টার লেভাদা সেন্টার’এ জরিপ পরিচালনা করেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৭২ ভাগ মানুষ সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে; শতকরা ১৪ ভাগ মানুষ বলেছে, তারা এ হামলার বিরোধিতা করে। এ অর্জন পুতিনের জন্য অনেক বড় পাওয়া।

সিরিয়া অভিযানের মধ্যদিয়ে তিনি শুধু নতুন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ওকার্যকারিতা প্রমাণ করেন নি; একইসঙ্গে তিনি রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসার ভবিষ্যত সহজ করেছেন অনেক বেশি।

তবে বিশ্ববাসীর নিশ্চয় বড় চাওয়া এটি- সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সত্যিকার অর্থে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে নজির স্থাপন করেছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন, বিশ্ববাসীর সামনে আশাবাদও জাগিয়েছেন তিনি।

সেই লড়াই যেন চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয় সেটা অনেক বেশি কাম্য।সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব দেখতে চায় শান্তিকামী মানুষ; সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নামে নাটক দেখতে চায় না কেউ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।

এআই