অবরোধ কর্মসূচীতে মাঠে নামছেন না বরিশালসহ দক্ষিনাঞ্চলের শীর্ষ নেতারা। দায়িত্বশীল কোনো নেতাই এলাকায় নেই। গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে রয়েছেন তারা। কোনো কোনো নেতা আন্দোলনের নামে পুলিশের সাথে সমঝোতা করে ৪/৫ মিনিটের ফটোসেশন শেষ করে ঘরে ফেরেন। তাও আবার নগর কিংবা জেলা শহরের ব্যস্থতম এলাকায় নয়, নিরাপদ- নির্জন কোনো গ্রামের রাস্তায়। এভাবেই চলছে দক্ষিণাঞ্চলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন। এ অবস্থায় মাঠের কর্মীদের কল্যাণে কোনোরকম আন্দোলন চলছে।

বরিশাল হাতেম আলী কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হারুন হাওলাদার বলেন, নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলন চাঙ্গা হচ্ছে না। বড় নোতারা মাঠে নেই বলে ছাত্রদল কর্মীরা পিছু হটছেন।

বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম আজিম জানান, কর্মীরা জেলে গেলে বড় নেতারা খোঁজ রাখেন না। এমনকি হরতাল অবরোধের সময় মোবাইল ফোনও বন্ধ রাখেন। এতেকরে আন্দোলনে লোকবল যেমন কম হয়, তেমনি মাঠ কাপানো আন্দোল হয় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে আন্দোলন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ আর নেতাদের অবস্থান বুঝতে বরিশাল ঘুরে গেছে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একটি মনিটরিং টিম। টানা ৩-৪ দিন বরিশালে অবস্থান করে মাঠের পরিস্থিতি দেখে গেছেন টিমের সদস্যরা। কোথায় কী হচ্ছে, না হচ্ছে, নেতাদের মধ্যে কারা এলাকায় আছেন বা নেই সেটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা।

চলমান টানা অবরোধে টিভিতে দেখা যায় বরিশালের সড়ক অবরোধ ও রাস্তায় আগুন জ্বালানোর চিত্র। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এগুলো বরিশাল নগরী থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূরের নির্জন এলাকা। যেখানে স্বাভাবিক সময়েও মানুষের সমাগম তেমন একটা থাকে না। তীব্র শীতে কাকডাকা ভোরে এখানে প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্যামেরাপার্সনদের খবর দিয়ে এনে দৃশ্যত আন্দোলনের ফটোসেশন করে সর্মথকরা।

কেবল বরিশালই নয়, পুরো দক্ষিণেই এখন চলছে বিএনপির এ রকম ফটোসেশন আন্দোলন। বলতে গেলে কেউই নামছে না মাঠে। আর এর জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে বিভিন্ন জেলার দায়িত্বশীল প্রভাবশালী নেতাদের। যারা সরে আছেন নিরাপদে। এমনকি মাঠের কর্মীদের সঙ্গেও তাদের নেই তেমন যোগাযোগ। ফলে আন্দোলনে ঝুঁকি নেয়ার সাহস পাচ্ছে না কর্মীরা।

দলীয় সূত্র জানায়, মাঝে মধ্যে মহাসড়কে প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মিদেও বিছিন্ন উদ্যোগে ইট-পাটকেল ছুড়ে দু-একটি গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে।

টানা অবরোধে বরিশালে মজিবর রহমান সরোয়ার, এবায়েদুল হক চান, আবুল কালাম শাহিন, মেসবাহ উদ্দিন ফরহাদ ও আকন কুদ্দুসুর রহমান, ঝালকাঠিতে মিঞা আহম্মেদ কিবরিয়া এবং পিরোজপুরে অধ্যাপক আলমগীর হোসেন ছাড়া আর কোনো দায়িত্বশীল নেতাকে দেখা যায়নি এলাকায়।

জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সভা সমাবেশ মিছিল নিষিদ্ধ করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এই নিষেধাজ্ঞা ভেঙে একবার মিছিল করার চেষ্টা করেছিলেন সাবেক এমপি সরোয়ার। এর বাইরে উল্লেখ করার মতো আর কিছু ঘটেনি এখানে।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী অংশে বেশ কিছু গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ হয়েছে। পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, ভোলা আর বরগুনায় একটা মিছিল পর্যন্ত হয়নি। স্বাভাবিকভাবে চলছে এসব এলাকার অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চ-বাস।

চলমান অবরোধ এবং এর আগে বিএনপির হরতাল বিক্ষোভে এলাকায় ছিলেন না পটুয়াখালী জেলা সভাপতি দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ঝালকাঠি জেলা সভাপতি দলীয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শাহজাহান ওমর, ভোলার নেতা আরেক কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ, বাবুগঞ্জ-হিজলা আসনে দলের মনোনয়নপ্রার্থী কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় আইনজীবী নেতা অ্যাড. জয়নাল, বানারীপাড়া উপজেলা সভাপতি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরফুদ্দিন সান্টু, পিরোজপুর-৩ আসনে দলের মনোনয়নপ্রার্থী কেন্দ্রের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) শাহজাহান মিলন, সাবেক এমপি ইলেন ভুট্টো, কেন্দ্রীয় নেতা জেবা খান, সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান, শহিদুল আলম তালুকদার, নুরুল ইসলাম মনি, ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার, সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহীম এবং নাজিম উদ্দিন আলম।

পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি এবং বরগুনার মাঠ পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেন, বর্তমান সময়ে তো দূরের কথা, বলতে গেলে আন্দোলনের ঝুঁকিপূর্ণ কোনো সময়েই এলাকায় থাকেন না এসব নেতা। হরতাল অবরোধ বিক্ষোভ মানেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান সবাই।

এদিকে মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন এবং নেতাদের অবস্থা জানতে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বরিশালে থাকা বিএনপির বিশেষ মনিটরিং টিমের সদস্যরা ঘুরে দেখেছেন ভোলা ও ঝালকাঠিসহ দক্ষিণের বেশ কয়েকটি জেলা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত গোপনে এলাকায় সফরে আসা এই টিমে রয়েছেন সাবেক একজন স্বরাষ্ট্র সচিব, কেবিনেট ডিভিশনের দায়িত্বে থাকা সাবেক এক যুগ্ম সচিব এবং এক সময় বরিশালে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক অতিরিক্ত সচিব।

সূত্র আরও জানায়, সারাদেশে বর্তমানে ১৯টি টিম মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করছে। জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের কোনো নেতার সঙ্গেও এরা যোগাযোগ করছেন না।

বরিশালে আসা এই টিমের এক সদস্য পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, আমরা বরিশাল ও খুলনা বিভাগের দায়িত্বে রয়েছি। এই দুটি বিভাগের সার্বিক চিত্র রিপোর্ট আকারে দলীয় চেয়ারপারসনকে দেয়া হবে। পদ-পদবি ও আগামী নির্বাচনের মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে এ রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগীয়) ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার জানান, পুলিশ বেপরোয়া হওয়ায় নগরীর বাইরে গিয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। এছাড়া বিএনপির নেতা কর্মিদের ঘরে ঘরে অভিযান চালিয়ে গণগ্রেফতার ও মামলা করায় মাঠে আসতে পারছে না।

মাঠে না থাকার বিষয়ে জানতে বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, বাখেরগঞ্জ’র সাবেক এমপি আবুল হোসেন, বানারীপাড়া উপজেলা সভাপতি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরফুদ্দিন সান্টু, পিরোজপুর-৩ আসনে দলের মনোনয়নপ্রার্থী কেন্দ্রের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) শাহজাহান মিলন, সাবেক এমপি ইলেন ভুট্টো, কেন্দ্রীয় নেতা জেবা খানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জেএ