বছরের শুরুতে টানা তিনমাস আন্দোলনের বিরতি দিয়ে মার্চে অনুষ্ঠিত তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। এরপর থেকেই দৃশ্যত মাঠে কোনো কর্মসূচি নেই দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলের। যার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে বিএনপির মাঠের রাজনীতি।
এমতাবস্থায় দলের মূল চালিকা শক্তি তৃণমূলে বিরাজ করছে চরম হতাশা। বারবার দলের ক্রান্তিকালে মূখ্য ভূমিকা পালনকারী তৃণমুল নেতাকর্মীরা বলছেন, এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির একতরফা দশম নির্বাচনের পর অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে বিএনপি। তবে চলতি বছরের শুরুতে ওই নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেয়া লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি কার্যত ব্যর্থ হওয়ায় আবার স্থবিরতা দেখা দেয় দলের মধ্যে। ঘরোয়া আলোচনা সভা ও সংবাদ সম্মেলনে আটকে আছে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি। নেতাকর্মীদের নিস্ক্রিয়তা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সব স্তরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে হতাশা। তবে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলের শুভানুধ্যায়ীরা আবারো ঘুরে দাঁড়াতে সাংগঠনিক তৎপরতা বেগবান করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন দলের হাইকমান্ডকে।
সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বও সাংগঠনিক পূনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত এই দলটি চার মাস পরেও সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম তেমনভাবে শুরু করতে পারেনি।
অন্যদিকে বারবার আন্দোলনের ব্যর্থতার দায়ভার কেন্দ্রীয় ও রাজধানীর নেতাদের কাঁধে চাপাচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা। তাদের মতে, বিগত দু'টি আন্দোলনে সারাদেশে সফল হলেও কেন্দ্র ও ঢাকা মহানগরী ছিল পরোপুরি ব্যর্থ। তাই দলের বাস্তবতা বিবেচনা করে যোগ্য ও পরীক্ষিতদের বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে দল গোছাতে পারলে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে পারলে বিএনপি আবারো আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির থাকার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, গত এপ্রিলের শুরুতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শেষ হওয়ার পরেও মামলার কারণে ফেরারি জীবনের অবসান হয়নি বিএনপি নেতাকর্মীদের। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। চরম আর্থিক কষ্টে দিন চলছে তাদের। অনেকে পৈতৃক জমি বিক্রি করে কোনোরকম সংসার চালাচ্ছেন। আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক নেতার নামে মামলার সেঞ্চুরিও অতিক্রম করেছে। আইনি জটিলতায় থমকে আছে এদের জামিন প্রক্রিয়া। অনেকে গ্রেফতারের ভয়ে জামিনের আবেদন করতে আদালতেও হাজির হচ্ছেন না।
বিএনপি সূত্রমতে, চলতি বছরে বড় ধরনের কোনো আন্দোলন কর্মসূচি দেয়ার পরিকল্পনা নেই বিএনপির। দলকে আন্দোলন-উপযোগী করতে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আর এ লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, দ্রুত সময়ে মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মুক্ত করার বিষয়টি। এজন্য দলের আইনজীবীদের সঙ্গে চেয়ারপারসনসহ সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেছেন দফায় দফায়।
এসব বৈঠকে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার একটি পরিসংখ্যান রিপোর্ট তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এত পরিমাণ মামলা হয়েছে যে, সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরেও আইনজীবীদের কাছে মামলার পরিসংখ্যান হচ্ছে, গত আড়াই বছরে সহিংসতার অভিযোগে সারাদেশে বিএনপির অর্ধ লক্ষাধিক নেতাকর্মীর নামে ২৫ হাজারের বেশি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। এসব মামলা হয়েছে দণ্ডবিধি, বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিভিন্ন ধারায়।
এদিকে, বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, এ মুহূর্তে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবিরতার পেছনে প্রধান কারণ হলো এই মামলা। সিনিয়র নেতাদের জামিন না দেয়ার কারণে সমস্যা আরো বেড়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে সব সিনিয়র নেতার জামিন হবে বলেও মনে করছেন না তিনি।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম একেবারেই স্থবির সেটি বলা যাবে না। তবে নানা প্রতিকূলতার কারণে এখনই পুরোদমে সাংগঠনিক পূণর্গঠন কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। দলের সিনিয়র নেতারা জামিন পাওয়ার পরই আন্দোলন-উপযোগী সংগঠন গড়ে তুলতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দলের কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা বিএনপিসহ কোনো রাজনৈতিক দলকে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না।
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এ কবির জিন্নাহ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, পুলিশের হয়রানিমূলক বিভিন্ন মামলায় অনেক নেতাকর্মী কারাগারে আছেন। গ্রেফতার-আতঙ্কে নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে পারেন না। কাজেই দলে সাংগঠনিক দুর্বলতা কিছুটা তো থাকবেই।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি শাহ সরোয়ার হোসেন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, অনেকদিন ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি নেই। তাই কেন্দ্রের এই স্থবিরতায় হতাশ হয়ে পড়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তিনি আরও বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরা সব আন্দোলনেই জীবনবাজী রেখে কর্মসূচি সফল করেছে।
এমএইচ/ এআর





