জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে (গ্রেড-২) নিয়োগ পাওয়া ছাত্রলীগের সাবেক ১০ নেতা-কর্মীকে এক বছরের মাথায় গ্রেড-১-এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেকশন অফিসারের ছয়টি শূন্য পদের উল্লেখ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ওই পদে ও সমমানের পদে ১০ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, গত চার বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে (গ্রেড-১ ও গ্রেড-২) নিয়োগপ্রাপ্তদের সবাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মী। পত্রিকায় নামমাত্র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং অনিয়ম করে তাদের নিয়োগ করা হয়েছে।

তবে উপাচার্য মীজানুর রহমান বলেছেন, সাক্ষাৎকারে যারা ভালো করেছেন, যাচাই করে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

উপাচার্য মীজানুর রহমান আওয়ামী যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য। সেকশন অফিসার পদে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে গত বছরের ১০ জানুয়ারি ‘ভিসি “যুবলীগের”, সেকশন অফিসাররা ছাত্রলীগের’ শিরোনামে পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৭ জানুয়ারি সেকশন অফিসার ও সমমান পদে (গ্রেড-১) ১০ জন, গ্রেড-২-এ দুজনসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেড-১-এ প্রার্থীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে এক বছর কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। গ্রেড-২-এ সংশ্লিষ্ট পদে এক বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।

রেজিস্ট্রারের দপ্তর সূত্র জানায়, সেকশন অফিসার ও সমমানের (গ্রেড-১) ১০টি পদের বিপরীতে ছাত্রলীগের সাবেক এই ১০ জনসহ ৩৩৫ জন প্রার্থী আবেদন করেন। তবে সাবেক ওই ১০ নেতা-কর্মী ছাড়া অন্যদের আবেদন বাতিল করা হয়। ২ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় গ্রেড-১-এ ওই ১০ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়।

নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক পাঁচ সহসভাপতি আলমগীর হোসেন, মাকসুদুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, জুনায়েদ হোসাইন, জাহাঙ্গীর আলম এবং কর্মী আমিনুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, ফয়সাল গিয়াসউদ্দিন ইসকান্দার, মুক্তার হোসেন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুল মালেক।

এদের মধ্যে মুক্তারকে উন্নয়ন ও জুনায়েদকে প্রকাশনা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ এ দুটি পদের নাম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল না। এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেড-২-এ ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক বিভাগে একটি পদের উল্লেখ থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দুজনকে। তাঁরা হলেন শুসন কুমার রায় ও সুবীর চন্দ্র বোস।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সেকশন অফিসারের শূন্য পদ (ছয়টি) অনুযায়ী ছয়জনকে নিয়োগ দিলে বাকি চারজনের ‘বিদ্রোহ’ করার আশঙ্কা ছিল। তাই তাঁদেরও গ্রেড-১-এ নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন।

ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, নতুন করে সেকশন অফিসার পদে (গ্রেড-২) নিয়োগ দিতেই এই ১০ জনকে গ্রেড-১-এ পদোন্নতি না দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারণ, গ্রেড-২-এ নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অভিজ্ঞতা চাওয়া হয় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য মীজানুর রহমান দাবি করেন, সাক্ষাৎকারে যারা ভালো করেছেন, যাচাই-বাছাই করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া পদের বাইরেও নিয়োগ দিতে পারে প্রশাসন।

কেবলই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের নিয়োগ: ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে গ্রেড-১-এর জন্য একবার ও গ্রেড-২-এর জন্য দুবার। তিনবারই পদের চেয়ে ছাত্রলীগের প্রায় দ্বিগুণ সাবেক নেতা-কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১২ সালে সেকশন অফিসার পদে নয়জনের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ছাত্রলীগের ২২ নেতা-কর্মীকে নিয়োগ দিয়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন সাবেক উপাচার্য মেসবাহউদ্দিন আহমেদ। এক বছরের মাথায় তাদের গ্রেড-১-এ পদোন্নতিও দিয়েছিলেন।

২০১৩ সালের অক্টোবরে গ্রেড-২-এ চারজন সেকশন অফিসারসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন পরবর্তী উপাচার্য মীজানুর রহমান। এতে ছাত্রলীগের ৫০ জনের মতো নেতা-কর্মীসহ ৪৭০ জন আবেদন করেন।

গত বছরের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সাবেক ১০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেড-২-এ নিয়োগ দেওয়া হয়। স র্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় ওই ১০ জন গ্রেড-১-এ নিয়োগ পান। এ নিয়ে সেকশন অফিসার পদে ছাত্রলীগের সাবেক মোট ৩২ নেতা-কর্মী নিয়োগ পেয়েছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট নিয়োগপ্রাপ্ত সেকশন অফিসারের (গ্রেড-১) দুই-তৃতীয়াংশ।

ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ওই ১০ কর্মকর্তার চাকরি হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছিলেন ছাত্রলীগের নিয়োগবঞ্চিত একাধিক নেতা-কর্মী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, গত বছর সেকশন অফিসার পদে (গ্রেড-২) তিনি প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু সংগঠনের নেতাদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তার চাকরি হয়নি।

এ অভিযোগ অস্বীকার করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তাদের দাবি, নিজ যোগ্যতা দিয়েই নিয়োগ পেয়েছেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। নিয়োগের জন্য ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কোনো তালিকা দেওয়া হয় না। কোনো টাকাপয়সাও তারা নেন না। প্রথম আলো

ইআর