রাজধানীর পাসপোর্ট অফিসের কাজ এখন আশপাশের বাসাবাড়িতে করা হচ্ছে। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় সঙ্ঘবদ্ধ দালালচক্র মূল কাগজপত্র বের করে নিয়ে যাচ্ছেন বাইরে। দ্রুত পাসপোর্ট প্রদানের নামে পাসপোর্ট করতে আসা লোকজনকে লাইন থেকে বাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে না পাসপোর্ট অফিস।

পাসপোর্ট করতে এসে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে হাজার হাজার টাকা খোয়াচ্ছেন সাধারণ ও অশিক্ষিত মানুষরা। তারপরও দ্রুত পাসপোর্ট পাবার আশায় দালালদের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিচ্ছেন তারা। রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট তৈরি ও প্রদানের ক্ষেত্রে এমনি অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

তবে পাসপোর্ট ও ভিসা কর্তৃপক্ষ বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে এসব করে থাকে দুষ্ট দালালচক্র। তবে দালালচক্রের সাথে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি তাদের।

তবে র‌্যাব বলছে, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় দালালচক্র এসব করে আসছে।

মঙ্গলবার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস ও এর আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক লোককে আটক করে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালিত হয়।

পরে আটককৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রমাণ সাপেক্ষে ৩০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী মেজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা।

১১ জনকে ৬ মাস, ১১ জনকে ৩ মাস ও ৬ জনকে ১৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাকী দু’জনের একজন পুলিশ সদস্য ফিরোজ হোসেন ও আরেকজন আনসার সদস্য আলতাফ হোসেন। তাদের ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয় ভ্রাম্যমান আদালত।

র‌্যাব-২ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন থেকে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে জালিয়াতির মাধ্যমে এ অপকর্ম করে আসছে। তারা পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত করে পাসপোর্ট করতে আসা লোকদের বাগিয়ে নিয়ে যায় বাইরে ভাড়া করা বাসাবাড়িতে।

দালালচক্রের সদস্যরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে কেউ পাসপোর্ট অফিসের লাইনে দাঁড়ান। এরপর কেউ পাশ্ববর্তী সোনালী ব্যাংকের লাইনেও দাঁড়িয়ে টাকা জমা দেয়ার কাজে সহায়তা করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর খুব দ্রুত কাজ করে দেবার কথা বলে টাকা দাবি করেন।

পাসপোর্ট প্রার্থীদের ফরম পূরণ, ফরম সত্যায়ন, কাগজপত্র ঘাটতি, ভুল বা ভুয়া কাগজপত্র ঠিক করা সব কাজ সত্যায়ন ছাড়াই করে দেবার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেন।

এ বিষয়ে র‌্যাব-২ এর এএসপি কামরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডি’কে জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ সময়ে পাসপোর্ট করতে ৩ হাজার ৫ টাকা আর জরুরি ভিত্তিতে লাগে ৬ হাজার টাকা। কিন্তু দালালচক্র প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কোনো ধরণের ভেরিফিকেশন ছাড়া অতিদ্রুত পাসপোর্ট তৈরির করে দেয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

অনেকক্ষেত্রে পাসপোর্ট প্রার্থীরা রাজি না হওয়া পর্যন্ত দালালরা নানাভাবে প্রলুব্ধ ও বিরক্ত করতেই থাকে। কখনো কখনো অনেক হয়রানির পর পাসপোর্ট প্রদান এবং অনেক সময় পাসপোর্ট প্রদান না করে প্রতারণা করে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর কর্তৃক গণ-উপদ্রব বন্ধ করার জন্য দালালদের প্রতি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি ও নোটিশ বোর্ড ছাড়াও বিভিন্ন দৃশ্যমান স্থানে ঝুলানো হয় এবং মাইকিং করে উপদ্রব সৃষ্টিকারী দালালগণকে সতর্ক করা হয়।

তবে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি ও বার্তা প্রচার করা সত্ত্বেও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েকজন অসৎ পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় দালালচক্র তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন।

র‌্যাব-২ এর এএসপি আতিকুল হক টাইমনিউজবিডি’কে জানান, দালালচক্রের উপদ্রবের বিরুদ্ধে র‌্যাব-২ নিয়মিত গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকদিন ধরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন পাসপোর্ট অফিস ও এর এর আশপাশ এলাকায় নজরদারি রাখা হয়।

এরই ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত র‌্যাব-২ এর একটি বিশেষ দল আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পাশ্ববর্তী বি-৫/এইচ-১২ নাম্বারের একটি বাসা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ৫ জনকে আটক করা হয়।

সেখান থেকে ৯৭টি এসআরপি পাসপোর্ট, বহুসংখ্যক পাসপোর্ট তৈরির পূর্বে আবেদনকৃত ফর্ম ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সত্যায়িত করার জন্য বিভিন্ন অফিসের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার নামসহ সীল, পাসপোর্ট তৈরি করে দিবে বলে চুক্তি করা ৫০,২০০ টাকা, স্বাক্ষর যুক্ত নাগরিকত্বের ফাঁকা সনদপত্র উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত শিপন খান ও মো. আয়নাল হোসেন নামে দুই দালালের সাথে কথা হলে তারা জানান, সরকারি হিসেবে চাইতে বেশি টাকা নিলেও অরিজিনাল পাসপোর্ট প্রদান করে থাকেন। কিভাবে পাসপোর্ট অফিসের বাইরে থেকে আপনারা পাসপোর্ট তৈরি ও প্রদান করে আসছেন জানতে চাইলে তারা জানান, “আমরা পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে লিয়াজ্যো করে কাজ করি। তাদের কমিশন দিয়ে লাল কাগজ বের আনি। এরপর পাসপোর্ট করতে আসা লোকদের কাছ থেকে পাসপোর্ট প্রতি ৫ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিয়ে কাজ করে দেই।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে আসা দুই ভুক্তোভোগী নারীর সাথে কথা হয়।

হাছনা বেগস নামে এক নারী টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, হাউজ ভিসায় যামু জর্ডান। হেই কথা বইল্লা আমাগো এহানে লইয়ে আইছে ইকবাল হোসেন নামে এক দালাল। আমার কাছ থাইক্কা জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট করণের লাইগা ১২ হাজার টাকা লইছে। কিন্তু হে আইসস্যা র‌্যাবের হাতে ধরা খাইছে। আমার টাকাও নাই পাসপোর্ট নাই।”

ফাতেমা আক্তার নামে অপর নারী জানান, “আমি এর আগে দালালের কাছ থেকে পাসপোর্ট কইরা জর্ডানে ৮ মাস থাইক্কা আইছি। এবার বোনেরে পাঠানোর লাগি পাসপোর্ট করতে আইছিলাম। যে লোকের সাথে টাকায় কন্টাক্ট ছিল আইসস্যা দেহি হেই দালাল ধরা খাইছে।”

এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দালালদের স্থান দেয়। ইতোমধ্যে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক দালাল এ তথ্য দিয়েছে যে তারা পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দালালী কাজের বখরাও দিয়ে থাকেন। এব্যাপারে ভিসা ও পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।

এব্যাপারে যোগাযোগ পাসপোর্ট ও ভিসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুন্সি মুয়িদ ইকরাম টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, আমার জানা মতে এধরণের কোনো ঘটনার সত্যতা মেলেনি। তবে এবারে র‌্যাবের অভিযানের পর এর সত্যতা মিলেছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এসব ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রমাণ সাপেক্ষো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।

জেইউ/ এআর