রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পর সিরিয়া যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা কী? উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র তৎপরতা এখন কোন পর্যায়ে? সব কী পালিয়েছে নাকি নিহত হয়েছে; নাকি নতুন করে সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে? এমন নানা প্রশ্ন এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে মন-খোলসা করে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত খবর দিচ্ছে না। এ অবস্থায় ইরান, রাশিয়া, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর থেকে সিরিয়া পরিস্থিতির একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে প্রথমেই জানিয়ে রাখি-রুশ হামলা শুরুর পর দৃশ্যপটের যে বদল সূচিত হয়েছিল তা অব্যাহত আছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রুশ-সিরিয়া-ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এরইমধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর ও কৌশলগত সড়ক-মহাসড়কের দখল নিয়েছে সিরিয়ার বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা।
আরো সংবাদ হচ্ছে- আইএস’র গলা কেটে হত্যা করা সেই কুখ্যাত জল্লাদ নিহত হয়েছে। নানা বিপর্যয়ের পর সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়েছে- রাশিয়াকে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দেবে তারা। সম্ভবত প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠার মতোই এ হুমকি। এবার সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়া যাক।
গুরুত্বপূর্ণ আল-হাদের শহর দখল:
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো শহরের কাছাকাছি অবস্থিত কৌশলগত আল-হাদের শহরের পুনর্দখল করে নিয়েছে সিরিয়ার সরকারি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা। আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে এ শহর দখলে রেখেছিল কয়েকটি উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। রাশিয়ার বিমান অভিযান ও ইরানের সামরিক পরামর্শমূলক কার্মকাণ্ড জোরদার করার পর সিরিয়ার সেনারা যে সাফল্য পাচ্ছে বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে যোগ হলো এ শহর দখলের ঘটনা।
আল-হাদের শহর থেকে সেনাসূত্রগুলো জানিয়েছে, শহরের ভেতরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আলেপ্পো-দামেস্ক গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে এ শহরের অবস্থান। ইরানের প্রেস টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শহরটি দখলের ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আন-নুসরা ফ্রন্ট ও আহরার আশ-শামের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ছিল এ শহরে। আল-হাদের শহর দখলের পর সেনাবাহিনীর জন্য আলেপ্পো-দামেস্ক মহাসড়ক দখল করা এখন সহজ হয়ে গেছে।
আড়াই বছর পর কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখল:
আল-হাদের শহর দখলের দু দিন আগে তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র কাছ থেকে কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে সিরিয়ার সেনারা। বিমান ঘাঁটিটি আলেপ্পো শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখলের জন্য সিরিয়ার সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা কয়েক দিক থেকে হামলা চালায় এবং সিরিয়া ও রুশ বিমান বাহিনী এতে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন দেয়। সন্ত্রাসীদের গোলন্দাজ ও মর্টার ইউনিটের ওপর বিমান হামলার পর তাদের প্রতিরক্ষা লাইন দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে স্থল অভিযান সহজ হয়। চূড়ান্ত অভিযান চালায় সিরিয়ার সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে শত শত সন্ত্রাসী জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে। আশা করা হচ্ছে, এ বিমানবন্দর দখলের পর ভবিষ্যত অভিযানের জন্য সরকারি সেনাদের পক্ষে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিমানবন্দরটি দুই বছরের বেশি সময় সন্ত্রাসীদের দখলে ছিল। এ বিমান ঘাঁটি দখলের পর সিরিয়ার সাবেক বিখ্যাত সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘাঁটি পুনর্দখলের পর রাকা ও আলেপ্পো শহরের মধ্যে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যত বিজয়ের পথ সুগম করবে।
এছাড়া, এ বিমান ঘাঁটি পুনর্দখলের মধ্যদিয়ে সিরিয়া ও ইরাকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। এ বিজয়ের কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি বলে সাবেক অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তারা মনে করছেন।
নিহত হয়েছে কুখ্যাত ‘গলা কাটা জল্লাদ’:
আলেপ্পোর সেই কুখ্যাত জল্লাদ মুহাম্মাদ হামদুস নিহত হয়েছে। এই হামদুস আইএস সন্ত্রাসীদের হয়ে বহু লোকের গলা কেটে হত্যা করার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখলের অভিযানে সিরিয়ার সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সে নিহত হয়।
সিরিয়ার আটক সেনা ও বেসামরিক লোকজনকে গলা কেটে হত্যার সময় সেসব নিয়ে আবার ভিডিও করে প্রচার করত এই কুখ্যাত হামদুস। সে ছিল মরক্কোর অধিবাসী এবং ধারণা করা হয় ২০১৩ সালে সিরিয়ায় এসেছিল। হামদুসের মা-বাবার দেয়া তথ্য অনুসারে, সে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইএস সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে জানতে পারে এবং সালাফি মতবাদ ছেড়ে আইএস-এ যোগ দেয়।
২ দিনে ২৭৭ অবস্থানে রুশ হামলা:
রাশিয়ার জঙ্গিবিমানগুলো বুধ ও বৃহস্পতিবার দু দিনে ৮৫ অভিযানে সন্ত্রাসীদের ২৭৭টি অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার আলেপ্পো, দামেস্ক, লাতাকিয়া, হামা, হোমস ও ইদলিব প্রদেশে এসব হামলা চালিয়েছে রুশ বিমানগুলো। এসব অভিযানের সময় বুধবার সিরিয়ায় সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা কোয়াইরিস বিমানবন্দরের সন্ত্রাসীদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়।
বিমানবন্দরে এ অভিযানের আগে সিরিয়ার কোনো কোনো বিরোধী গোষ্ঠীর দেয়া তথ্য এবং ইরাকে প্রতিষ্ঠা করা চার-দেশীয় তথ্য কেন্দ্র থেকে সন্ত্রাসীদের গোলন্দাজের অবস্থান ও শক্ত ঘাঁটিগুলো সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে রুশ বিমান অভিযান চালাতে সহজ হয় এবং সিরিয়ার বাহিনী ও হিজুবল্লাহ যোদ্ধারা সহজে কোয়াইরিস সামরিক বিমান ঘাঁটিটির দখল নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
রুশ বিমানের হামলায় আন-নুসরা ফ্রন্টের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস হয়। এ কাজে BETAB-500 বাংকার বাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, রুশ জঙ্গিবিমান এসইউ-২৪ এর হামলায় হামা প্রদেশে আন-নুসরা ফ্রন্টের মর্টার ব্যাটারি ধ্বংস হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ইগোর কোনাশেংকভ জানান, সন্ত্রাসীরা এখন যুদ্ধ করার পরিবর্তে সিরিয়ার সেনাদের অভিযান ব্যহত করতে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মাইন পাতা শুরু করেছে। আলেপ্পো প্রদেশে গত কয়েকদিনের হামলায় সাতটি গ্রুপের অন্তত ৯০০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
রুশ হামলার কারণে আলেপ্পো এবং ইদলিব প্রদেশের সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্রের চালান পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া, আলেপ্পো প্রদেশের স্থানীয় লোকজন সরকারি সেনাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে। তাল-মামু গ্রামের কাছে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আহরার আশ-শাম সন্ত্রাসীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং সন্ত্রাসীদের পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রুশ বিমান হামলায় আইএস’র একটি গোলাবারুদের ডিপো এবং দামেস্ক প্রদেশে রাস্তায় থাকা চারটি গাড়ি ধ্বংস হয়েছে। রাশিয়ার এসইউ-২৪ বিমান আইএস সন্ত্রাসীদের তিনটি ট্যাংক ও স্থলযুদ্ধে ব্যবহৃত দুটি যান ধ্বংস করেছে।
৩০ সেপ্টেম্বর বিমান হামলা শুরুর পর এ পর্যন্ত রাশিয়ার বিমান বাহিনী ১,৮০০ বার অভিযান চালিয়েছে যাতে ধ্বংস হয়েছে ২,০০০ এর বেশি লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া, শত শত সন্ত্রাসী নিহত ও বহু কমান্ড সেন্টার ও গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস হয়েছে।
আরো এলাকা দখল:
কোয়াইরিস সামরিক বিমান ঘাঁটি দখলের পর সিরিয়ার সরকারি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ওই এলাকার আরো বহু গ্রাম দখলে নিয়েছে। অসমর্থিত সূত্রে বলা হচ্ছে- কোয়াইরিস বিমানঘাঁটি দখলের অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রখ্যাত কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানি। প্রায় দুই দিন লড়াইয়ের পর প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা বিমান ঘাঁটিটি দখলে নিতে সক্ষম হয়।
সমীকরণ পাল্টে গেছে:
বলা হচ্ছে, আড়াই বছর পর কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখলের পর আলেপ্পো অঞ্চলে লড়াইয়ের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে সরকারি সেনারা। এই ঘাঁটির দখল নেয়ার পরই কৌশলগত হাদের শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব হয়।
বিমান ঘাঁটিটি দখলের লড়াইয়ে শত শত সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএস এবং আন-নুসরাকে এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে যে, কখন আলেপ্পো প্রদেশে ব্যাপক মাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু হয়। কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটিটি দখলে নেয়ার পর কৌশলগত আল-বাব শহরও দখলে নেয়া এখন সহজ হবে।
প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের অভিনন্দন:
কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখলের পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি একে বিশাল বিজয় বলে অভিহিত করেছেন।
কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটির কমান্ডার মেজর জেনারেল মুনজের জামান ও কর্নেল সুহাইল আল-হাসানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে অভিনন্দন জানান বাশার আসাদ। তিনি বলেন, “আপনারা হলেন সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে বীরত্ব, সাহসিকতা ও ব্রিলিয়ান্ট ইমেজের জ্বলন্ত উদাহরণ।”
বিমান ঘাঁটি দখলের অভিযানে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সেনারা আইএস’র একটি মাইনক্ষেত্র নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর কমান্ডাররাও বিমান ঘাঁটি দখলের ঘটনাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিরাট অর্জন বলে মনে করছেন। এর ফলে আলেপ্পোর অন্যান্য অংশে অভিযান সহজ হবে। সিরিয়ায় সহিংসতা শুরুর পর আলেপ্পো প্রদেশের বিরাট অংশ চলে গিয়েছিল সন্ত্রাসীদের হাতে। কর্নেল সুহাইল বলেছেন, বিমান ঘাঁটি দখল করেই সেনা অভিযান থেমে যাবে না; বরং এটি হলো শুরু মাত্র।
বহু সন্ত্রাসীর আত্মসমর্পণ:
কোয়াইরিস বিমান ঘাঁটি দখলের পর অন্তত ৬৯ জন মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণ করেছে। এদিকে, সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে শুরু করেছে এবং হোমস প্রদেশের ১১৯ জন সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণ করেছে। এছাড়া, দামেস্ক, কুনেইত্রা ও হোমস থেকে অন্তত ৬০ জন সন্ত্রাসী অস্ত্র সমর্পণ করেছে।
এর আগে গত ২৮ অক্টোবর দামেস্ক, কুনেইত্রা ও হামা প্রদেশ থেকে ৪৯ সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণ করে। পহেলা নভেম্বর দামেস্ক, আলেপ্পো ও দেইর আজ-জোর শহর থেকে কমপক্ষে ১৮৪ জন সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণ করে।
মার্জ আস-সুলতান বিমানঘাঁটি দখল:
১২ নভেম্বর সিরিয়ার সেনাবাহিনী মার্জ আস-সুলতান বিমান ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েকদিনে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা দুটি বিমান ঘাঁটি দখল করল। দামেস্ক প্রদেশে অবস্থিত মার্জ আস-সুলতান বিমান ঘাঁটি দখল করতে গিয়ে আসাদ সমর্থিত সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের প্রচণ্ড লড়াই হয়েছে।
দামেস্কের গোতা এলাকায় অবস্থিত এ বিমান ঘাঁটিতে কথিত ‘জয়শুল ইসলাম’ সন্ত্রাসীদের দখলদারিত্ব ছিল। এ বিমান ঘাঁটিতে ছিল সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ হেলিকপ্টার ফিল্ড। তিন বছর পর বিমান ঘাঁটিটি দখল করা সম্ভব হলো। এ ঘাঁটি মুক্ত করার অভিযান শুরু হয় মঙ্গলবার এবং বুধবার সেনারা ঘাঁটিটি দখল করতে সক্ষম হয়।
আলেপ্পোর তাল আল-এইস দখল:
১২ নভেম্বর আলেপ্পোর তাল আল-এইস এলাকাটি পূর্ণভাবে দখল নিতে সক্ষম হয়েছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী। সেখানে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ সমর্থিত সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রচণ্ড লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছে আইএস সন্ত্রাসীরা। এলাকাটি কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অভিযানে রুশ বিমান বাহিনী সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করে। লড়াইয়ে বহু সন্ত্রাসী হতাহত হয়েছে। এছাড়া, আন-নুসরা ফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত জাদিদেত এরবিদ, মুশাররফ আল-মুরায়ি, তাল আল-আরবাইন, খেরবেত আল-মাজারে, খেরবেত নাযহা, খেরবেত এমশাভে এবং আল-হাদের এলাকা দখল করে নিয়েছে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী।
সব সন্ত্রাসীকে আলেপ্পোয় আসার আহ্বান:
আলেপ্পো দখল ছিল সন্ত্রাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য। কিন্তু সেই আলেপ্পোর বড় বড় ঘাঁটি এখন একের পর এক সরকারি সেনারা দখল করে নিচ্ছে। আল-হাদের শহরে ছিল আন-নুসরা ফ্রন্টের সবচেয়ে বড় সদরদপ্তর। সে শহরের পতন হয়েছে সিরিয়ার সরকারি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হাতে। এ পরিস্থিতির মুখে পড়ে সৌদি আরব থেকে আসা আন-নুসরা ফ্রন্টের কমান্ডার আবদুল্লাহ আল-মুহসিনি সারা দেশের সব গ্রুপের সমস্ত সন্ত্রাসীকে নিজ নিজ অবস্থান ছেড়ে আলেপ্পো যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সন্ত্রাসী এই কমান্ডার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, কয়েক দিনের মধ্যে যদি হাজার হাজার যোদ্ধা পাঠানো না হয় তাহলে তুরস্কের নিকটবর্তী কৌশলগত সীমান্ত শিগগিরই সরকারি সেনাদের হাতে পরিপূর্ণভাবে চলে যাবে। আলেপ্পোয় সন্ত্রাসীদের অবস্থানের আলাদা কৌশলগত মূল্য রয়েছে। গত ৯ নভেম্বর সোমবার থেকে সন্ত্রাসীদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে সরকারি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা। এতে সহায়তা দিচ্ছে রুশ বিমান বাহিনী।
সন্ত্রাসীদের আরো দুই টপ কমান্ডার নিহত:
১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ইরানের ফার্স নিউজ খবর দিয়েছে, হামা প্রদেশে সন্ত্রাসীদের অবস্থানে সরকারি সেনারা হামলা চালালে সন্ত্রাসীদের আরো দুই শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়। হামা হচ্ছে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলেপ্পো প্রদেশের কাছে অবস্থিত। ওই অভিযানের ফলে তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে জুন্দুল আকসা গোষ্ঠীর কমান্ডার আমির আবু আল-কা’কা। তার সঙ্গে থাকা প্রায় সব সন্ত্রাসী ওই অভিযানে নিহত হয়েছে।
ফার্স নিউজ বলছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার অভিযানে সব মিলিয়ে ৪২ জন নিহত হয়। একজন সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযানের সময় শুধুমাত্র একজন ড্রাইভার তার গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে, হামা প্রদেশের মা’ন এলাকায় সিরিয়ার সেনাদের সঙ্গে লড়াইয়ে আহরার আশ-শাম গোষ্ঠীর কমান্ডার আসাদ আল-আরিয়ান মারা গেছে। গত কয়েকদিন ধরে আলেপ্পো, হামা, দামেস্ক ও দারা প্রদেশেঅভিযান জোরদার হয়েছে। এর মধ্যে গত তিনদিনে হামা প্রদেশে বেশ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার মারা গেছে। এরা সবাই জর্দানে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।
এছাড়া, বুধবার সিরিয়ার সেনাবাহিনী হামা প্রদেশে আহরার আশ-শাম সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শক্ত অবস্থানে হামলা চালায়ে। এতে মারা গেছে ১৩ সন্ত্রাসী। এ হামলায় সন্ত্রাসীদের কয়েকটি রকেট লাঞ্চার ধ্বংস হয়েছে। আহমাদ আবদেল কারিম আস-সুকা ওরফে আহমাদ আল-কারমু নামে আরেক সন্ত্রাসী নেতা নিহত হয়েছে। সে কথিত ‘গ্যাদারিং অব আল-ইজ্জা” ব্রিগেডের কমান্ডার ছিল। ওই অভিযানে তার সব সঙ্গী নিহত হয়েছে।
এর পাশাপাশি কালাত আল-মাদিক গ্রামে সেনাবাহিনীর অন্য এক অভিযানে হিশাম বাকুর তাহা, ওয়ালিদ আশ-শেইখ, মুহাম্মাদ আবদেল আস-সালেহ এবং হায়দার আবদুর রাজ্জাক নামে চার সন্ত্রাসী নিহত হয়। একইদিনের অভিযানে মারকাবে গ্রামে নিহত হয়েছে আহমাদ আলী আস-সাফান, খালেদ আল-মাহদি এবং আহমাদ আল-মারায়ে নামে তিন সন্ত্রাসী।
এ অভিযানে সন্ত্রাসীদের তিনটি গাড়ি ধ্বংস হয়। আতশান গ্রামে অন্য এক অভিযানে আহরার আশ-শাম গোষ্ঠীর নয় সন্ত্রাসী নিহত ও অনেকে আহত হয়। এ অভিযানে চারটি গাড়ি ধ্বংস হয়েছে। মঙ্গলবার অন্য এক অভিযানে মারা গেছে আহরার আশ-শাম গোষ্ঠীর কমান্ডার হাসান আল-এমরি। হাসানের মৃত্যুর পর তার সঙ্গীরা পালিয়ে যায়।
দামেস্কেবিমান হামলায় বহু সন্ত্রাসী নিহত:
গত ৮ নভেম্বর দামেস্ক প্রদেশে সরকারি বাহিনীর বিমান হামলায় বহু সন্ত্রাসী হতহাত হয়েছে। রাশিয়ার পাশাপাশি সিরিয়াও সন্ত্রাসীদের অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে। এ অভিযানে সন্ত্রাসীদের তিনটি পিকআপ এবং একটি বুলডোজার ধ্বংস হয়েছে। আইএস সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আন-নুসরা ফ্রন্টেরও একটি অবস্থান ধ্বংস হয়। এ সময় তাদের অনেক সন্ত্রাসী হতাহত ও বেশ কিছু গাড়ি এবং অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস হয়।
দারা প্রদেশে সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটি ধ্বংস:
১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সিরিয়ার দারা প্রদেশের আল-বালাদ এলাকায় ধ্বংস হয়েছে সন্ত্রাসীদের কয়েকটি শক্ত ঘাঁটি। এর মধ্যে বিলাল আল-হাবাশি মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আল-আওকাফ ভবনের কাছে সন্ত্রাসীদের দুটি অবস্থান ধ্বংস হয়। এছাড়া ওই এলাকার বিদ্যুৎ কোম্পানি ও কৃষি ব্যাংকের কাছের দুটি অবস্থান ধ্বংস হয়েছে। দারা প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি আস্তানাও ধ্বংস হয়। তবে এসব হামলায় কতজন সন্ত্রাসী হতাহত হয়েছে তা জানা যায় নি।
রাশিয়াকে রক্তসমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়ার হুমকি:
রুশ হামলায় দিশেহারা আইএস সন্ত্রাসীরা এখন হুমকি দিচ্ছে। তারা এক ভিডিও বার্তায় বলেছে, শিগগিরি রাশিয়াকে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হবে। ব্রিটেনের ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা এ খবর দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার পর এই হুমকি দিয়েছে। আল-হায়াত মিডিয়া সেন্টার থেকে দেয়া এ ভিডিও বার্তায় বলা হয়েছে- “শিগগিরি, শিগগিরি রক্তের সাগর বয়ে যাবেরাশিয়ায়।”
ধারণা করা হচ্ছে- ইরাকে গত বৃহস্পতিবার ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ার পর আন্তর্জাতিক দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে আইএস এ বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে-“ছুরি দেখে কাফেরদের গলা কেঁপে উঠবে এবং ক্রেমলিন হবে আমাদের।”
কিছুদিন আগে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কান্তিশেভো এলাকায় আইএস সন্ত্রাসীদের একটি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে রুশ স্পেশাল ফোর্স। এরপর গত বুধবার ইরাকের সিনজার শহর পুনদর্খলের জন্য ৭,৫০০ কুর্দি ও ইয়াজিদি যোদ্ধা বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে।
সিনজার হচ্ছে ইরাকের মসুল ও সিরিয়ার রাকা প্রদেশে অবস্থানরত আইএস সন্ত্রাসীদের মধ্যে রসদ সরবরাহের প্রধান রুট। আইএস সন্ত্রাসীদের এই বিবৃতি দেখে অনেকেই ধারণা করছেন, তাদের দখলদারিত্বের দিন সম্ভবত দ্রুত শেষ হতে চলেছে; অবসান হতে চলেছে আইএস’র কথিত খেলাফত।
আসাদকে সমর্থন; ফিরছে শরণার্থীরা:
সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরুর পরপরই দেশটির জনগণ তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আবারো আসাদের সমর্থনে হাজার হাজার মানুষের মিছিল বের হয় রাজধানী দামেস্কে। এ মিছিল থেকে তারা সামরিক অভিযানের প্রতিও নতুন করে সমর্থন ব্যক্ত করে। অন্তত দুটি বিমান ঘাঁটি মুক্ত করার পরসিরিয়ার জনগণ বিশেষভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে।
এদিকে,রুশ হামলা শুরুর পর এ পর্যন্ত দশ লাখের বেশি শরণার্থী সিরিয়ায় ফিরে এসেছে বলে খবর দিয়েছে রাশিয়ার বার্তা সংস্থা ‘স্পুৎনিক’। রাশিয়ার অন্যতম উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালেক্সি মেশকভ বুধবার মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী দশ লাখের বেশী শরণার্থী ফিরেছে সিরিয়ায়। (লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান)
কেবি





