ভারতের ১২ ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের কাছেই কাশ্মীরের উরি সেনাঘাঁটিতে মাত্র চার বন্দুকধারী হামলা চালিয়ে এমন তাণ্ডব সৃষ্টি করবে তা ভাবতেই পারেনি ভারতীয় সেনারা। মূহুর্তেই ১৭ সেনার প্রাণ যাবে এবং মারাত্মকভাবে আহত হতে হবে আরো অন্তত ৩০ জনকে - দেশটির সেনা সদস্যদের কাছে এটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। চার বন্দুকধারীকে নির্মূল করতে ৬ ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ করতে হবে এবং এমন চড়া মূল্য দিতে হবে- বিষয়টি নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন খবরাখবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক মাস ধরে চলা ভারতীয় আগ্রাসনে রীতিমতো ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠেছিল কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী জনতা। তবে, শক্ত হাতেই সব কন্ট্রোল করে আসছিল ভারত।
গত ৮ই জুলাই কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতা বুরহান ওয়ানিকে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। অত্যন্ত জনপ্রিয় তরুণ নেতাকে হারিয়ে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন কাশ্মীরের জনগণ। কিন্তু কার্ফু ও সান্ধ্য আইন জারিসহ কঠোর শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সবকিছুই নিয়ন্ত্রনে রাখে ভারত। আর এর মূল্য দিতে গিয়ে এই কয়মাসে অঘোরে ভারতীয় সেনা ও নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে প্রাণ দিতে হয় অন্তত ৮৭ কাশ্মীরী বাসিন্দাকে, যাদের একটি বড় অংশই শিশু ও নারী।

এছাড়া ভারতীয় সেনা ও নিরাপত্তারক্ষীদের হামলায় আহত হন কাশ্মীরের আরো হাজার হাজার বাসিন্দা। এমনকি কাশ্মীরের বেসামরিক বিক্ষোভ দমাতে ভারতীয় বাহিনী ব্যবহার করে ‘পিলেট’ বা এক ধরনের ধাতব যা ব্যাপকভাবে কেড়ে নেয় কাশ্মীরের মানুষের দৃষ্টিশক্তি।
গত ৮ই জুলাইয়ের বিক্ষোভ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় শ্রীনগর হাসপাতালের চক্ষু চিকিৎসা বিভাগের প্রধান ডা. তারিক কুরেশি বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতে বলেছিলেন, পিলেট বন্দুকের শিকার অন্তত ১১৭জন আহত রোগীর কথা ওই সময় পর্যন্ত তিনি জানতে পেরেছিলেন।
উল্লেখ্য, কাশ্মীরে বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী পেলেট বন্দুক ব্যবহার করে। যা থেকে ছররা বুলেট বের হয় শয়ে শয়ে। এই ছররা বুলেটে মৃত্যু হয় না। কিন্তু সারা গায়ে ক্ষত তৈরি হয়। শরীরের অন্য অংশের ক্ষত সামাল দেওয়া গেলেও চোখের ক্ষেত্রে মারাত্মক হয়ে উঠছে পেলেট বন্দুক।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গত ১৪ই জুলাই দৈনিক ইনকিলাবে “পেলেট বন্দুকের দাপটে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে কাশ্মীরী তরুণরা”-এই শীরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়: “গত বছরের (২০১৫) হিসেব অনুযায়ী অন্তত ৭০০ মানুষের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এই পেলেট বন্দুকের জেরে। কারো কারো ক্ষেত্রে দুটি চোখই।
এবারেও বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে পেলেট বন্দুকের। যার জেরে চোখে গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বহু মানুষ। শুধুমাত্র মহারাজা হরি সিং হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন শতাধিক মানুষ। যাঁদের চোখে পেলেট বন্দুকের জেরে আঘাত লেগেছে।”
তবে, কঠোর হস্তে কাশ্মীরী জনগণকে দমন করতে গিয়ে কখনো বিরুপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে- এমন ধারনা আগে থেকেই পোষণ করতো ভারত।
ভারতের প্রভাবশালী বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজারের অনলাইন সংস্করণে আজ (১৮ সেপ্টেম্বর) “কাশ্মীরে সেনাঘাঁটিতে হামলাকারী ৪ জঙ্গি খতম, নিহত ১৭ জওয়ান”-এই শীরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়: “শনিবারেই (১৭ই সেপ্টেম্বর) কাশ্মীরে বিএসএফ-এর আইজি বিকাশ চন্দ্র জানিয়েছিলেন, গত দু’মাসে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে জঙ্গিদের ৩০ জনের একটি দল কাশ্মীরে ঢুকে পড়েছে। তারা বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে রয়েছে। তিনি আরও জানান, বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর যে ভাবে কাশ্মীর অশান্ত হয়ে উঠেছিল, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জঙ্গিরা কাশ্মীরে ঢুকে পড়ে।”

অর্থাৎ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই জঙ্গি হামলার আতংকের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু মাত্র ৪ জনের হামলায় এমন নাস্তানাবুদ হতে হবে ভারতীয় সেনাদের সেই ধারণা তাদের একদমই ছিল না। বিষয়টি রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে দেশটির শাসকগোষ্ঠীকে।
হামলার খবর পাওয়া মাত্রই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ তাঁর রাশিয়া ও আমেরিকা সফর বাতিল করে দেন। যোগাযোগ করেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যপালের সঙ্গে। গোটা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেন।
রাজনাথ সিংহ টুইট বার্তায় বলেন, “হামলার ঘটনা নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা পুরো বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইটারে এক বার্তায় এ আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানান এবং এই হামলাকে “cowardly terror attack” অর্থাৎ- “কাপুরুষিত সন্ত্রাসী হামলা” বলে আখ্যায়িত করেন। হামলাকারীরা কিছুতেই শাস্তি এড়াতে পারবে না বলেও হুসিয়ারি উচ্চারণ করেন মোদী।

এদিকে, উরির যেই সেনাঘাঁটিতে হামলা চালানো হয় সেটি রাজধানী শ্রীনগর থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে । হামলার পর পাকিস্তানের সাথে নিয়ন্ত্রণ-রেখাও বন্ধ হয়ে গেছে।
হামলাকারীরা ভারতীয় সেনাদের প্রতি এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে তারা রীতিমতো এক অসম্ভব ও দু:সাহসিক অভিযানে নেমেছিল যেখানে সফলতার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ এবং নিজেদের মৃত্যুর বিষয়টি ছিল প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। কিন্তু চার হামলাকারী ছিল পুরোটাই বেপরোয়া।
ভারতীয় সেনা মুখপাত্র কর্নেল এসডি গোস্বামীর বরাত দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীরা প্রথমে সীমান্ত সংলগ্ন একটি ফ্রন্টলাইনে হামলা চালায় যেটি ছিল আক্রান্ত সেনা হেডকোয়ার্টারের দিকে যাবার নিয়ন্ত্রন রেখা (Line of Control or LoC)।
চার হামলাকারী সেই নিয়ন্ত্রন ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে যায় এবং সেনাসদস্যদের ওপর হামলা চালায়। ভারতীয় জওয়ানদের সাথে তাদের ৬ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেপরোয়া যুদ্ধ চালিয়ে যায় চার হামলাকারী।
আগামীতে কাশ্মীর নিয়ন্ত্রনে রাখা ভারতের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে সে বিষয়েও এক সতর্ক বার্তা দিয়ে গেল এই হামলা।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে আলজাজিরা আরো জানায়, উরির এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন খুব সকালে তিনি সেনা হেডকোয়ার্টারের কাছ থেকে ধোয়া উড়তে দেখেন এবং একটানা বন্দুকের গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান।
এর আগে ২০১৪ সালে কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাদের ওপর এক হামলায় ৯ সেনা সদস্য নিহত হয়েছিলেন। তবে, বড় হতাহতের ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের জুনে উত্তর-পশ্চিম ভারতের মনিপুরে। সেখানে হামলায় অন্তত ২০ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন।
তবে, এককভাবে মাত্র ৪জন বন্দুকধারীর এক হামলায় এত অল্প সময়ে ১৭ সেনার প্রাণহানী এবং ৩০ জনের অধিক আহত হওয়ার ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করছে ভারত। আর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে গণ-অসন্তোষের চরম বহি:প্রকাশ হিসেবেই দেখছেন।
কেবি





