এদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বি আরটি’র কাজ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। অন্যদিকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন সড়ক সচিব। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি। আর ক্রেইন চালক, ঠিকাদার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অবহেলার কারণে প্রাণহানির অভিযোগ করা হয়েছে পরিবারের করা মামলায়।

তবে নির্মান কাজ চলাকালে দুর্ঘটনা ঘটতে পার সে বিষয়ে আগে থেকেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দুর্ঘটনাক্রমে ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে যেতেই পারে, আর সে কারণেই পূর্ব সতর্কতা নিতে হয়। কিন্তু রাজধানীর উত্তরায় বি আরটি প্রকল্পের কাজ পরিচালনায় ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এর আগেও ফ্লাই ওভারের নির্মান কাজ করতে গিয়ে আরো কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গার্ডার ভেঙ্গে পড়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোতে সামান্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখেই ক্রেন দিয়ে গার্ডার ওঠানো হচ্ছিল।

সোমবার রাতে নিহত ফাহিমা আক্তার ও ঝরণা আক্তারের ভাই মো. আফরান মন্ডল বাবু বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় এ মামলা করেন। গার্ডারচাপায় নিহতরা কীভাবে প্রাইভেটকারের ভেতর চাপা অবস্থায় ছিল, রোমহর্ষক সে বর্ণনা ওঠে এসেছে মামলার বিবরণে। মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, নিহত আইয়ুব আলী হোসেন ওরফে রুবেলের শরীরের মুখমন্ডল থেতলে যায়। তার নাক দিকে রক্ত নির্গত হতে থাকে। বুক, পেট, পিঠ, হাত ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে কালচে জখমপ্রাপ্ত হয়। ফাহিমা আক্তারের মাথা থেতলানো ও চেপ্টা ছিল।

ঘাড় ভাঙা ও বুক-পেটের চামড়া ওঠে গিয়েছিল। বাম হাত ও কোমড়ের ডান পাশ ভাঙা, বাম পায়ের হাঁটুর নিচে হাড় থেকে মাংস আলাদা হয়ে যায়। ঝর্ণা আক্তারের মাথা থেতলানো ও মগজ বিছিন্ন হয়ে যায়। ঘাড় ভাঙা, বুক থেতলানো ও চামড়া ওঠে গিয়েছিল। পেট-পিট থেতলানো ও মোচড়ানো ছিল। এছাড়া দুহাত ভাঙা, দুপায়ের হাঁটুর নিচ থেকে থেতলে যায়। শিশু জান্নাতুলের মুখমন্ডল-মাথা থেতলানো ও চেপ্টানো ছিল। ঘাড় ও বুকের পাজর ও ডান হাত ভাঙা ছিল। আরেক শিশু জাকারিয়ার শরীরের বাম পাশ চেপ্টানো ও জখমপ্রাপ্ত ছিল। নাক দিয়ে নালা নির্গত হচ্ছিল।

মামলায় অবহেলাজনিত কারণে ক্রেন পরিচালনাকারী চালক, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে সোমবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। হতাহতরা ঢাকায় একটি বৌভাতের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফিরছিলেন। রাতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গাড়িটিতে মোট সাতজন যাত্রী ছিলেন। এরমধ্যে দুই শিশু, দুই নারী ও একজন পুরুষ মারা গেছেন। নিহতরা হলেন- আইয়ুব আলী হোসেন রুবেল (৫৫), ফাহিমা আক্তার (৩৮), ঝরণা আক্তার (২৭), জান্নাতুল (৬) ও জাকারিয়া (৪)। তবে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় একই গাড়িতে থাকা হৃদয় (২৬) ও রিয়া মনি (২১) নামের নবদম্পতি গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। দুজনেই উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোহসীন বলেন, উত্তরায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহত দুই বোনের ভাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় তিনি অবহেলাজনিতভাবে ক্রেন পরিচালনাকারী চালক, সিজিজিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে। স্বজনরা জানান, ফাহিমা হলেন নববধূ রিয়া মনির মা। আর ঝরণা হলেন তার খালা। রুবেল সম্পর্কে ফাহিমা-ঝরণার বেয়াই। জান্নাত ও জাকারিয়া ঝরণার সন্তান। ফাহিমা-ঝরণাদের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুরে।

অন্যদিকে রাজধানীর উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বি আরটি) প্রকল্পের কংক্রিটের গার্ডার আছড়ে পড়ে হতাহতের ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গ্যাঝুবা গ্রুপ করপোরেশনের (সিজিজিসি) গাফিলতি পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের একথা জানান সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী। সচিব বলেন, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, গাফিলতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সোমবার কাজ করার কথা ছিল না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাউকে না জানিয়ে কাজ করছিল।

এ ঘটনার পর সন্ধ্যায় সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব আমিন উল্লাহ নূরী ঘটনাস্থলে পরিদর্শন শেষে সরকারের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানান। সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতারকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটি প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের জানান সচিব আমিন উল্লাহ নূরী। এ সময় সাংবাদিকরা প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- জানতে চাইলে সচিব আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে শোকজ করব। চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসলে সিদ্ধান্ত নেব।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, বি আরটি প্রকল্পের কাজ পরিচালনায় ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে কিছুদিন পরপরই দুর্ঘটনা ঘটছে। জনদুর্ভোগ বাড়ছে। এভাবে উন্নয়ন কাজ চলতে দেয়া যাবে না। আগে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না পর্যন্ত ঢাকায় বি আরটির কাজ বন্ধ থাকবে। গতকাল রাজধানীর উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়কে ক্রেন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে এ কথা বলেন মেয়র। তিনি বলেন, ঢাকায় বি আরটি, মেট্রোরেলসহ অনেকগুলো প্রকল্পের কাজ চলমান। সব প্রকল্পের পরিচালকদের বৃহস্পতিবার নগর ভবনে ডাকা হয়েছে। তারা নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করলেই কাজ শুরু করতে পারবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তার চর্চাগুলো অনুসরণ করা হলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কোনো কারণই নেই। এখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিলও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। বলেছেন, ঠিকাদার সঠিকভাবে সব সাবধানতা মেনে কাজ করছে কি না, এটি তদারকির দায়িত্ব প্রশাসনের। সেটি করা হয় না বলেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবহেলা করে থাকে। জনবহুল সড়কে কর্মব্যস্ত সময়ে কেন এই কাজ করা হচ্ছিল, দ্বিতীয়ত, এত ভারী একটি বস্তু তোলার সময় নিচ দিয়ে কীভাবে গাড়ি গেল, তৃতীয়ত, কেন ক্রেনটি নিয়ন্ত্রণ হারাল।

বি আরটি প্রকল্পটি চীনের জিয়াংশু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ও গেজুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড বাস্তবায়ন করছে। তাদের কোনো বক্তব্য আপাতত পাওয়ার সুযোগ নেই। ২০১২ সালে বি আরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শেষ করার কথা ২০১৭ সালে। তবে নানা জটিলতায় বারবার পিছিয়েছে কাজ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এটা একটা ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাতেই কাজ চলবে, সেটি সমস্যা না। সেখানে দিনে হোক আর রাতে হোক যখন ভারী উপকরণ বা সরঞ্জাম আপনি বহন করবেন, সেটা ক্রেনের মাধ্যমে হোক আর যেকোনো মাধ্যমে হোক না কেন, ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিসটা হচ্ছে অবশ্যই একটা নিরাপত্তা-বেষ্টনী তৈরি করতে হবে আগে। ‘কারণ, ক্রেন থেকে গার্ডার কিন্তু দুর্ঘটনাক্রমে পড়ে যেতেই পারে, সে কারণেই আপনাকে পূর্ব সতর্কতা নিতে হয়।

এরআগে গত ১৫ জুলাই গাজীপুরে একই প্রকল্পের ‘লঞ্চিং গার্ডার’ চাপায় এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক ও একজন পথচারী আহত হন। ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ঢাকার তেজগাঁও ও মালিবাগ মোড় এবং চট্টগ্রামেও প্রাণহানি হয়েছে। এরও আগে গত বছরের ১৪ মার্চ সকালে এই বি আরটিরই গার্ডার ভেঙে অন্তত চারজন আহত হন, যাদের মধ্যে দুজন বিদেশিও ছিলেন। এর মধ্যে ২০১২ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে ২৯ জনের প্রাণহানি হয়। এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা গণমাধ্যমে আসেনি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বি আরটি) প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চার বছরে। অথচ ১০ বছরেও কাজ শেষ হয়নি। এতে ওই সড়কে যাতায়াতকারীদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এর ওপর আবার একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে আলোচনায় বি আরটি প্রকল্প। তবে সোমবার বিকেলে উত্তরায় প্রাইভেটকারের ওপর গার্ডার পড়ে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় ফের আলোচনায় বি আরটি। এর আগেও এখানে দুইবার গার্ডার দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে একজন নিহত হন। বি আরটি প্রকল্পে গত এক দশকে এ ধরনের বড় দুর্ঘটনা তিনটি ঘটলেও এই সড়কে দুর্ভোগ নিত্যদিনের সঙ্গী। এই সড়কে চলাচলকারীরা বলছেন, এরকম দুর্ঘটনা দেখে পথ চলতে আতঙ্কে রয়েছেন তারা।