বাংলাদেশ থেকে পাচার হাজার হাজার কোটি টাকায় ভারতে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলছে পিকে হালদার (প্রশান্ত কুমার হালদার)। নামে বেনামে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাগানবাড়ি, বিশাল জলাসায় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজনের নামেও কেনা হয়েছে বাড়ি-গাড়ি সম্পদ। হাজার হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করে সেখানকার ব্যাংকে রাখা হয়েছে।

২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া কোম্পানির নামে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নেন পি কে হালদার এবং সেই অর্থ তিনি ভারতে পাচার করেন। হালদারের এসব কোম্পানির কোনও অস্তিত্ব নেই। 
পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো হালদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারে এবং বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগ দায়ের করে। পরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এই বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি)।  

কিন্তু দেশের টাকা এভাবে অবাধে পাচার করা হলেও দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসেনি। এমনকি বিপুল পরিমান টাকা পাচারের পর দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। 
তবে এ ঘটনায় দেশে হৈচৈ পড়ে গেলে বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে রেড আ্যালার্ট জারি করে ইন্টার পোল। এরপর পি কে হলদার এতদিন কোথায় ছিল তা জানা ছিল না দেশের নিরাপত্তা সংস্থার। এমনকি ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পরই কেবল বাংলাদেশ গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারে।

ঢাকার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত পি কে হালদারসহ পাঁচজনের আরও ১০ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছে। তিনদিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (১৭ মে)  আবারও ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 
অন্যদিকে তাদের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া এক নারীকে ১০ দিনের হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  এর আগে পি কে হালদারসহ পাঁচজনকে  ব্যাঙ্কশাল সিবিআই স্পেশাল কোর্টে হাজির করে ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তাদের তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছিল ভারতীয় এই সংস্থাটি।

ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ এ তথ্য জানিয়েছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন,  এ ব্যাপারে ভারত জানালেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনামাত্র বিচার শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। 

এছাড়া ভারতে তার পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হবে বলেও জানান তিনি। তবে বাংলাদেশের সাথে বন্ধিবিনিময় চুক্তি থাকলেও অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২২ অক্টেবর রাত পর্যন্ত দেশেই ছিলেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। ২৩ অক্টোবর সকালে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চিঠি দেয় ইমিগ্রেশনকে। দুপুর ২টা ৪৩ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপে আবারও তার বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে বলে দুদক। দুদক এবং ইমিগ্রেশন বিভাগ যখন চিঠি চালাচালি করছে তখনো সীমান্ত পাড়ি দেননি পি কে হালদার। আদালতে জমা দেওয়া ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য বলছে, দুদকের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার দুই ঘণ্টা আগে যশোরের বেলাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়েন পি কে হালদার। বিষয়টি শুধুই কাকতালীয় ছিল, নাকি প্রশান্ত কুমারকে পালাতে কেউ সহায়তা করেছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

যদিও ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং দুদক একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে আসছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, দেশ ত্যাগের পর পি কে হালদারের অবস্থান নিয়ে একেক সংস্থা একেক রকম তথ্য দিয়ে আসছে। কখনো বলা হয়েছে তিনি কানাডায় আছেন, আবার কখনো শোনা গেছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের কথা। একবার দেশে ফেরার ইচ্ছা পোষণ করলেও নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন গ্রেফতার না করার।

গ্রেফতারের পর ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) জানতে পারে পি কে হালদার ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌঁছান। ভুয়া ভারতীয় ভোটার, প্যান এবং আধার কার্ড সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।

শিব শঙ্কর হালদার নামে উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগরে বিপুল সম্পত্তি গড়েছেন তিনি। ইডির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তার সহযোগীরাও একই ধরনের ভুয়া ভারতীয় ভোটার, প্যান ও আধার কার্ড সংগ্রহ করে অশোকনগরে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। ভারতীয় এই গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, পি কে হালদারকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের পেছনে দুটি বিষয় রয়েছে।

এর মধ্যে একটি হলো, বাংলাদেশের আর্থিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুরোধ, অন্যটি তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট। এর আগে ইডির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশি নাগরিক প্রশান্ত কুমার হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার, প্রাণেশ কুমার হালদার এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রশান্ত কুমার হালদার নিজেকে শিব শঙ্কর হালদার নামে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতেন।

হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, বাংলাদেশি এই নাগরিকরা প্রতারণার মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসায়িক কোম্পানি চালু করেন। কোম্পানি পরিচালনার পাশাপাশি কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার অন্তত তিনটি বাড়ি রয়েছে অশোকনগরে। এই এলাকায় তিনি মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এর আগে, দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পি কে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন। পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দুদকের তথ্য বলছে, পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

কলকাতার স্থানীয় প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, শুধু পি কে হালদার নন, পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরে প্রাসাদসম বাড়ি করেন তার স্বজনরাও। আছে বিলাসবহুল গাড়ি, পুকুর। চোখের সামনে ম্যাজিকের মতো দু-তিন বছরে সবকিছুই হতে দেখেছেন এলাকাবাসী। তবে ভয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেননি তারা। শনিবার পি কে হালদারকে গ্রেফতারের পর স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে কৌতূহল।

কলকাতা থেকে আনুমানিক ৬২ কিলোমিটার দূরের অশোকনগর এলাকাটিতে মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষেরই বসবাস বেশি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত শহর বনগাঁ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরের এ এলাকায় থাকার সুবিধা হচ্ছে সীমান্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসা।

খুব সহজেই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগও করা সম্ভব। এসব কারণেই পি কে হালদার ঘাঁটি গাড়েন এ এলাকায়। প্রথমে তার ভাই প্রীতেশ এবং প্রাণেশ হালদারের নামে সম্পদের পাহাড় গড়েন। এরপর তাদের আত্মীয়স্বজনের নামেও প্রাসাদসম বাড়ি করা হয়। কেনা হয় জমি, পুকুরসহ অনেক কিছু। পিকে হালদারের ব্যক্তিগত সহকারি সুকুমার মৃধার মেয়ের বাড়িতেও সেদিন অভিযান চালায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বাড়িটি এখন বন্ধ রয়েছে।

এ বাড়িতে সুকুমার মৃধার বড় মেয়ে থাকতেন। গোয়েন্দারা বলছেন, ২০২১ সালে বাবার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়ার পর অদিতি মৃধাকে রাজসাক্ষী করার প্রস্তাব দিলে তিনি অশোকনগরের বিশাল সম্পদের খবর ফাঁস করেন। আর প্রাসাদসম এই বাড়ি দেখে ভয়ে অনেকেই বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বলতেন না। সেখানকার এক প্রতিবেশী বলেন, ‘উনি এখানে নির্দিষ্টভাবে থাকতেন না, তবে ওনার বড় মেয়েজামাই এখানে থাকতেন।

আরেক প্রতিবেশী বলেন, এসব মানুষের সঙ্গে কথা বলা তো আমাদের মানায় না। অশোকনগরের বিল্ডিং মোড় থেকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটার ভেতরে দক্ষিণ পল্লিতে রয়েছে প্রাণেশ হালদারের বাড়ি। ভাইয়ের নামে কেনা হলেও এখানেই মূলত থাকতেন পি কে হালদার এবং তার পরিবারের সদস্যরা।