ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-কে কেউ পছন্দ করে না। সাম্প্রতিক এক জরিপে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত জরিপটি প্রকাশিত হয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম ব্রিটেনের দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টে। এর পাশাপাশি আরো একটি দেশে বর্বর এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কেউ পছন্দ করে না। সে দেশটি হলো লেবানন। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে- ইরান এবং লেবানন দুটি দেশেই শিয়া মুসলমানদের প্রাধান্য রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি মানুষ শিয়া মুসলমান।

জরিপে দেখা যাচ্ছে- সুন্নিপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়ার শতকরা মাত্র ৪ ভাগ মানুষ আইএস-কে পছন্দ করে। তবে আশার কথা হচ্ছে- বিশ্বের কোনো মুসলিম প্রধান দেশই আইএসকে- সমর্থন করে না। বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ায় এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার কিছু আগে জরিপ রিপোর্টটি বের হয়েছিল।

কথিত ইসলামি জিহাদ পরিচালনাকারী এই গোষ্ঠী ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আইএস যে তাণ্ডব চালাচ্ছে তারই অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ায় হামলা চালায় তারা।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রকাশিত জরিপ তালিকায় দেখা যাচ্ছে- সৌদি আরবেও শতকরা ৪ ভাগ মানুষ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-কে সমর্থন করে। তবে ইন্ডিপেন্ডেন্ট দাবি করেছে- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ যে দেশটিতে আইএস-কে সমর্থন করে সেটি হচ্ছে সিরিয়া। এ দেশের শতকরা ২১ ভাগ মানুষ আইএস’র প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

অবশ্য, সিরিয়ার বিরাট এলাকা এই গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে, সাধারণ মানুষের জীবনের ভয়ও সেখানে বেশি। সে কারণে এই সমর্থন কতটা স্বতঃস্ফূর্ত তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা সবাই জানি, সিরিয়ায় গত প্রায় ৫ বছরের সহিংসতায় আড়াই লাখের মতো মানুষ মারা গেছে এবং দেশটি থেকে ৪০ লাখ মানুষ উদ্বাস্ত হয়ে ভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে।

জরিপে দেখা যাচ্ছে- নাইজেরিয়া, তিউনিশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় তুলনামূলকভাবে এই উগ্রবাদের প্রতি সমর্থন একটু বেশি রয়েছে। ইরান ও লেবাননে আইএস’র প্রতি সমর্থনের পরিমাণ শতকরা শূণ্য ভাগ।

পিউ রিসার্চের জরিপ ফলাফলের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সে অনুযায়ী, সিরিয়ায় আইএস’র প্রতি সমর্থন শতকরা ২১ ভাগ। এরপরে রয়েছে নাইজেরিয়া। দেশটিতে এ গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন রয়েছে শতকরা ১৪ ভাগ। তিউনিশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ১১ ভাগ, সেনেগালে ১০, পাকিস্তানে ৯, বুরকিনা ফাসো এবং তুরস্কে ৮ ভাগ, লিবিয়া ও ইয়েমেনে শতকরা ৭ ভাগ, ফিলিস্তিনে ৬, ইরাকে ৫, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবে ৪ ভাগ; জর্দান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ ভাগ এবং মিশরে ২ ভাগ মানুষ সমর্থন করে আইএস-কে।

সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র প্রতি মানুষের এই ঘৃণার তথ্য-উপাত্তে অবাক হন নি ‘আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং কাউন্সিল’র পরিচালক ক্রিস দয়েলে। তিনি বলেছেন, “আমি মনে করি আরব বিশ্বের লোকজন আইএস-কে হুমকি মনে করেন, কারণ মুসলমানরাই আইএস’র প্রাথমিক শিকার।

এছাড়া, আল-কায়েদার বিষয়টিও রয়েছে। তাদের বর্বর কর্মকাণ্ড, তারা যেভাবে নারীর সঙ্গে ব্যবহার করছে, মস্তক বিচ্ছ্ন্নি করার সব ঘটনা-কোনোকিছুই তাদেরকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে নি। এছাড়া, জরিপে অংশ নেয়া লোকজন জানে যে, আইএস সন্ত্রাসীরা মুসলিম বিশ্বকে অমুসলিম বিশ্বের কাছে শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।”

গত বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়াতে আইএস সর্বপ্রথম হামলার দাবি করেছে। এর আগে দেশটিতে আল-কায়েদা বোমা হামলা চালিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় আল-কায়েদা জেমা ইসলামিয়া নামে পরিচিত।

বৃহস্পতিবারের হামলায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ জন হামলাকারী, ইন্দোনেশিয়ার এক পুলিশ ও হল্যান্ডের এক নাগরিক ছিল। বন্দুকধারীরা একটি ব্যস্ত শপিংমলে হামলা চালিয়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ ৩ জনকে আটক করেছে। এক হামলাকারীর কাছ থেকে আইএস’র একটি পাতাকা উদ্ধার করা হয়।  

ইন্দোনেশিয়ায় ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী- দেশটিতে ২০ কোটির বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে যার মধ্যে শতকরা ৮৭ ভাগ সুন্নি মুসলমান।

এই যখন এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জনপ্রিয়তা তখন এটা পরিষ্কার যে, মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে বিশেষ মহলের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তৎপর রয়েছে এই গোষ্ঠী। যে কাজ হয়ত সরাসরি রাষ্ট্রের নামে করা যাচ্ছে না সেই কাজ করা হচ্ছে আইএস’র নামে; তাদের মাধ্যমে। এর বিরুদ্ধে ইরাক ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোকে জীবন-মরণ লড়তে হচ্ছে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে।

সম্প্রতি এমনই লড়াই করেছে ইরাকের সামরিক বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সদস্যরা। তীব্র হামলায় গত সপ্তাহে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-আনবার প্রদেশের রামাদি ছেড়ে পালিয়েছে সন্ত্রাসীদের অনেকে। রামাদিকে মুক্ত ঘোষণা করার পর শুরু হয় ‘ক্লিনআপ’ অভিযান। এ অভিযানের সময় কিছু সন্ত্রাসী রামাদির হাদিসা ও বারওয়ানা এলাকায় ইরাকি বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এ চেষ্টায়ও পায়ের তলায় মাটি পায় নি তারা। পরবর্তী ঘটনা ঘটেছে বাগদাদির শোক ঘোষণার মাধ্যমে। ঘটনাটি বেশ মজার।

রামাদিতে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র ২৩৭ সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর এ গোষ্ঠীর কথিত খলিফা আবু বকর আল-বাগদাদি তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে- রামাদি মুক্ত করার পর নতুন লড়াইয়ে বারওয়ানা এলাকায় ইরাকের সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর হামলায় অন্তত ২৩৭ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এছাড়া, সন্ত্রাসীদের বহু গাড়ি দখল করে ইরাকের সেনা ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সদস্যরা।

গত সপ্তাহে রামাদি মুক্ত করার পরও শত শত সন্ত্রাসী সেখানে প্রতিরোধের চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তাদের সে প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে ইরাকের গোলন্দাজ ইউনিট হাদিসা ও বারওয়ানা এলাকায় হামলা চালায়। এতে সমর্থন দিয়েছে ইরাকের বিমান বাহিনী। একটি সূত্র জানিয়েছে, ২৫০ জনেরও বেশি সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে এ অভিযানে।

গত মে মাসে ইরাকের রামাদি শহর দখল করে নিয়েছিল এই উগ্রবাদী গোষ্ঠী। কিন্তু শহরটি এখন সন্ত্রাসী মুক্ত হয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-এবাদি ঘোষণা করেছেন, রামাদি মুক্ত করার পর তার সেনাবাহিনী এখন মসুল শহরের দিকে নজর দেবে এবং শিগগিরি সে শহরও মুক্ত হবে। এই মুসল এলাকাতেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সম্প্রতি সেনা মোতায়েন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান