দেশের গন্ডী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন ভারতীয় পর্যটকরা।কিন্তু এই পর্যটকরা বিশ্বে ভারতের বদনাম করছেন কি?  -তা নিয়েই এখন ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম!

আর এই বিতর্কের মূলে আছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুইটি ঘটনা।

প্রথম ঘটনাটিতে বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার বালির একটি হোটেলের ঘর থেকে শ্যাম্পু-সাবান, তোয়ালে, হেয়ার-ড্রায়ার, এমন কী রুমে সাজানো পেইন্টিং পর্যন্ত স্যুটকেসে ভরে নিয়ে যাওয়ার সময় এক ভারতীয় পরিবার হোটেল কর্মীদের কাছে ধরা খেয়েছেন।

তাদের জিনিসপত্র তল্লাসি আর বিব্রত পরিবারটির চরম লজ্জা আর অস্বস্তির মুহুর্তটাই মোবাইল ফোনের ভিডিওতে ধরা পড়েছে। আর সেই ভিডিওটি গত বাহাত্তর ঘন্টায় ভারতে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটিও সুইস আল্পসের শৈল শহর জিস্টাডে আর্ক-অন-সিয়েল নামে একটি হোটেলের।

সেই হোটেলে ভারতীয় অতিথিরা যাতে ব্রেকফাস্ট বুফে থেকে খাবার না সরান এবং হোটেলের করিডর ও ব্যালকনিতে প্রচন্ড চেঁচামেচি না করে অন্য অতিথিদের অসুবিধে না ঘটান, সেই মর্মে হোটেল কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ ঝুলিয়েছিলেন।

সেই নোটিশটি বিশিষ্ট ভারতীয় শিল্পপতি হর্ষ গোয়েঙ্কার চোখে পড়ার পর তিনি সেটির ছবি টুইট করেন এবং লেখেন সেটি দেখে তিনি কতটা ক্রুদ্ধ, অপমানিত বোধ করেছেন এবং কীভাবে তার প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন।

“তবে পরক্ষণেই আমার মনে হল ট্যুরিস্ট হিসেবে আমরা সত্যিই তো খুব উগ্র, চিৎকারবাজ (‘লাউড’), উদ্ধত (‘রুড’) এবং অন্যের সংস্কৃতির প্রতিও সংবেদনশীল নই।”

“আমাদের এই ছবিটা সত্যিই পাল্টানো দরকার”, টুইট করেন মি. গোয়েঙ্কা।  

ভারত যখন বিশ্বে একটি আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, তখন এই পর্যটকরাই যে দুনিয়ায় দেশের ‘সেরা রাষ্ট্রদূত’সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এই দুটো ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে ভারতীয় পর্যটকদের পক্ষে-বিপক্ষে চলছে ধুন্ধুমার তর্কবিতর্ক।

কেউ কেউ মেনে নিচ্ছেন, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়পড়তা ভারতীয় পর্যটকদের আচরণ সত্যিই লজ্জাজনক।

অনেকে আবার বলছেন, মাত্র কয়েকজনের স্বভাবের জন্য ঢালাওভাবে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ট্যুরিস্টকে দায়ী করা মোটেও ঠিক নয়।

বালির হোটেল থেকে জিনিসপত্র চুরির ঘটনাটির ভিডিও শেয়ার করে হেমন্ত নামে জনৈক টুইটার ব্যবহারকারী যেমন লিখেছেন, “ভারতের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে যারা সেখানে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন সরকারের উচিত তাদের পাসপোর্টই বাতিল করে দেওয়া!”

এই প্রস্তাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাকেও ট্যাগ করেছেন তিনি পোস্টে।

ওই একই ভিডিও শেয়ার করে ভারতের জনপ্রিয় পলিটিক্যাল স্যাটায়ারিস্ট, ‘দেশভক্ত’আকাশ ব্যানার্জি লিখেছেন, “আন্তর্জাতিক শক্তি হয়ে ওঠা মানে শুধু অর্থনীতির বহর বা পরমাণু বোমা নয়।”

“আমাদের মেনে নেওয়া উচিত কোথাও একটা সমস্যা নিশ্চয় আছে।”

হোটেল থেকে তোয়েল বা হেয়ার-ড্রায়ার চুরির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও একজন লিখেছেন, “যখন একজন বিদেশি হোটেল ম্যানেজার আমাদের মনে করিয়ে দেন এখানে প্রশ্নটা পয়সার নয়, বরং সম্মানের  -তখন একজন ভারতীয় হিসেবে আমার লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়।”

উল্লেখ্য,বালির হোটেলের ভিডিওতে যখন তল্লাসির সময় ভারতীয় ওই পরিবারটির স্যুটকেস থেকে একে একে হোটেলের নানা জিনিসপত্র বেরোচ্ছিল, তখন তাদের বারবার বলতে শোনা যায়, “আমরা ওগুলোর দাম মিটিয়ে দেব।”

তার জবাবেই হোটেলের ম্যানেজার বলেছিলেন, এখানে বিষয়টা তাদের সম্মানের - পয়সার নয়!

ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন হোস্ট ও অভিনেত্রী মিনি মাথুরও টুইট করেছেন, বিদেশের হোটেল থেকে এই ধরনের ‘ক্যাজুয়াল স্টিলিং’কে যারা কোনও অপরাধ বলেই মনে করেন না তারা দেশের কলঙ্ক।

ভিডিও’র একেবারে শেষ দিকে আরও দেখা যাচ্ছে পরিবারের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য হোটেল কর্মীদের একজনের কাঁধে হাত রেখে অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন- খুব সম্ভবত তাকে ‘ম্যানেজ’করার চেষ্টায়।

মিনি মাথুর লিখেছেন, “আর ওই আঙ্কল একজন হোটেল কর্মীর পিঠে হাত রেখে যেভাবে সরিয়ে নিয়ে গেলেন- সেটা তো জাস্ট অসহ্য!”

বালির ঘটনায় ভারতীয় পরিবারটিকে ‘ডিফেন্ড’করার মতো কন্ঠস্বর তেমন শোনা যাচ্ছে না।

এমবি