বেশি পেছনের ইতিহাস ঘাটাঘাটি না করে কেবলমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিগত ৭০ বছরের বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় এই সময়ে মুসলমানরা শুধু ইহুদি-খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধই নয় স্বজাতির হাতেও মার খেয়েছে বিস্তর। আর এ দুরবস্থার চিত্র যেন দিনকে দিন ভয়াবহতম রুপ ধারণ করছে।
একদিকে, ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হত্যাযজ্ঞ, আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার আগ্রাসন, অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি নারকীয় তান্ডব, কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাদের অমানবিক জুলুম-নির্যাতন, মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধদের চালানো স্মরণকালের ভয়াবহতম গণহত্যা কিংবা বসনিয়া-হার্জেগোভিনিয়ায় সার্বিয়ার হত্যাযজ্ঞের মতো বিষয়গুলো মানব ইতিহাসের পাতায় চিরকাল কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। অপরদিকে, শিয়া-সুন্নী রক্তাক্ত সংঘাতসহ মুসলমানদের নিজেদের গৃহযুদ্ধও ইতিহাসের পাতায় মুসলিম জাতির জন্য কলংকময় নজির হয়ে থাকবে।
একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এসব বড় বড় হত্যাযজ্ঞের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইহুদি-খ্রিস্টানরা কখনও মুসলমানদের একটি পক্ষকে নিজেদের সাথে নিয়ে অপর পক্ষকে ঘায়েল করেছে। আবার কখনও তারা একেবারে পর্দার আড়ালে থেকে মুসলমানদেরকে নানা উপায়ে বিশেষ করে ধর্মীয় আবেগকে উস্কে দিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমনে নামিয়ে দিয়েছে।
নিকট অতীতের আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে অদ্যাবদী (২০১৫) আমেরিকার একতরফা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানে হাজার হাজার মুসলমানকে প্রাণ দিতে হয়েছে, পঙ্গুত্বের শিকার হতে হয়েছে আরও লাখ লাখ নিরীহ আফগানবাসীকে।
উইকিপিডিয়ায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ এর অক্টোবর থেকে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর পর এ পর্যন্ত ২৬ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। এছাড়া, সেনা সদস্য ও সাধারণ জনগণসহ প্রায় ১ লাখ আফগানির প্রাণহানী হয়েছে এ পর্যন্ত। অপরদিকে, পরোক্ষভাবে যুদ্ধজনিত কারণে আরও অন্তত সাড়ে তিন লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভবনে চালানো এক ভয়াবহ ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় তিন হাজারের বেশি লোকের প্রাণহানীর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে একতরফা যুদ্ধ শুরু করে। টুইন টাওয়ারের ওই হামলায় প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আল কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ওই আত্মঘাতী হামলা চালায়।
“নাইন-ইলেভেন”-হিসেবে আখ্যায়িত ওই হামলায় দুটি বিমান আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভবনে। দুই ঘণ্টার মধ্যে এখানকার দুটি ভবন মাটিতে ধসে পড়ে। তৃতীয় বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর পেন্টাগনে আঘাত হানে।এতে ভবনের পশ্চিম পাশের কিছু অংশ ধসে পড়ে। চতুর্থ বিমানটির লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু যাত্রীদের প্রতিরোধের সময় বিমানটি পেনসিলভেনিয়ার শাঙ্খসভিলে বিধ্বস্ত হয়।
মুসলিম বিশ্বসহ সব প্রান্ত থেকেই ওই হামলার নিন্দা জানানো হয়। তবে, কোন ধরনের পরিপূর্ণ তদন্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলায় মুসলমানদের দায়ী করে তড়িঘড়ি করে ঘটনার পর একমাসও অতিবাহিত না হতেই আফগানিস্তানে একতরফা যুদ্ধ শুরু করে। শুরু হয় সীমাহীন আগ্রাসন। লাখ লাখ মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হয় আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা।
অথচ পরিবর্তিতে এমনও অভিযোগ পাওয়া যায়- খোদ আমেরিকাই ইহুদিদের পরিকল্পনায় “নাইন-ইলেভেন” হামলার ঘটনা ঘটায় শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে দমন করার লক্ষ্যে। “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এমন চটকদার প্রচারণার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে শুরু হয় আমেরিকান আগ্রাসন।
এরপর গত ১৫ বছর ধরে দখলদারিত্ব বজায় রেখে কখনও ওসামা বিন লাদেনকে খোঁজার নামে আবার কখনও লাদেনের কথিত “আল-কায়দা” সন্ত্রাসীদের দমনের আড়ালে ঠান্ডা মাথায় লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে আমেরিকা। অথচ আজও নাইন ইলেভেন হামলার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।
অধ্যাপক রেহমানের প্রশ্ন:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের লিখিত এক প্রবন্ধে এ বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করা হয়েছে। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত ওই প্রবন্ধের খানিকা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
“'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' নিয়েও নানা কথা আছে। কারা শুরু করল, কেন করল-অনেক প্রশ্নেরই কোনো জবাব নেই দীর্ঘ ১০ বছর পরও। একটি নয়, দুটি নয়, চার-চারটি বিমান ছিনতাই হলো। গোয়েন্দারা টের পেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে টুইন টাওয়ারে দুটি বিমান বিধ্বস্ত হলো। দেখা গেল, ভবন দুটি ধসে পড়েছে, অথবা গলে গেছে। কোনো ধরনের বিস্ফোরক ছাড়া কি এত উঁচু ভবন একসঙ্গে ধসে নিচে পড়ে যেতে পারে?
তাহলে কি কোনো শক্তি এমন কোনো বিস্ফোরক ব্যবহার করেছিল, যাতে করে পুরো ভবন ধসে পড়ে? কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে বড়জোর ওই ভবনের কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পুরো ভবনটি ধসে পড়ার কথা নয়। শুধু দুটি ভবনই ধসে পড়ল, পাশের ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকল, একটুও ক্ষতি হলো না কিংবা কাত হয়ে পড়ল নাএটা কি সম্ভব? ওই দুটি ভবন বেছে নেওয়ার কারণই বা কী? আশপাশে তো আরো অনেক ভবন ছিল। এটা করা হয়েছিল কী এ কারণে যে ভবন দুটি ছিল বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদর দপ্তর। এখানে যেকোনো হামলা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে”।
অধ্যাপক রেহমানের ওই প্রবন্ধে আরও বলা হয়: “পেন্টাগনে যে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো, ওই বিমানের যাত্রীদের কোনো ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া যায়নি। সাধারণত বিমান বিধ্বস্ত হলে মৃতদেহ পাওয়া যায়-এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে পাওয়া গেল না কেন? এমনকি বিধ্বস্ত বিমানের কোনো ছবিও দেখা যায়নি। পেনসিলভানিয়ার এক মাঠে চতুর্থ যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণও আমরা পাইনি কোনো দিন। ওই বিমানে কতজন যাত্রী ছিল, কয়টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে-এসব কোনো তথ্যই কারো কাছে নেই।
পাঠক লক্ষ করুন, কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে প্রথমেই খোঁজ পড়ে ব্লাক বক্সের, যেখানে সর্বশেষ কথোপকথন রেকর্ড থাকে।যতদূর মনে পড়ে, বিধ্বস্ত চারটি বিমানের একটিরও 'ব্লাক বক্স' উদ্ধার করা কিংবা পাওয়া যায়নি। এটা কি ইচ্ছাকৃত? নাকি কোনো তথ্য গোপন করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে”।
অধ্যাপক রেহমান সবচেয়ে ভয়াবহ যেই প্রশ্নটি করেছেন তার লেখায় সেটি হলো:“নিউ ইয়র্ক টুইন টাওয়ারে হামলায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারালেও (বাংলাদেশি পাঁচজনসহ) একজন ইহুদিও মারা যায়নি। এটা কি কাকতালীয়, নাকি অন্য কিছু? অভিযোগ আছে, বিমান হামলার পাঁচ মিনিট আগে সব ইহুদি এই ভবন ত্যাগ করে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব গত ১০ বছরে আমরা পাইনি”।
অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের এই লেখা প্রকাশের পর পেরিয়ে গেছে আরও প্রায় ৫ বছর। অথচ আজও এসব প্রশ্নের কোন জবাব দেয়নি আমেরিকা বা দেশটির ঘাড়ে বন্দুক রেখে বিশ্বজুড়ে মোড়লের আসনে সমাসীন ইহুদিবাদী ইসরাইল।
এছাড়া, নাইন-ইলেভেন ঘটনার সাথে সিআইএ ও মোসাদের সংশ্লিষ্টতার কথা খোদ মার্কিন বিশ্লেষকদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। এ সম্পর্কে নোয়াম চমস্কি এবং প্রফেসর মর্গান রেনল্ড’র মতো আরো অনেক মার্কিন পন্ডিত-গবেষকদের অভিমত এখনো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে।
নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে আল-কায়েদা, ওসামা বিন লাদেন এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আইডেনটিটি যেন এক হয়ে দাঁড়ায়। অথচ নিউইয়র্ক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র এবং পেন্টাগনে সন্ত্রাসী বিমান হামলার আগে থেকেই পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষী অপপ্রচার ও ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দেয়ার গোপন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যসহ ইসরাইলের সম্ভাব্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শত্রুদের দুর্বল করে, তার নিরাপত্তা নির্বিঘ্নরাখতেই এই উদ্যোগ নেয়া হতে পারে বলে কয়েকজন খ্যাতনামা পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষক মতামত দিয়েছেন।
নোয়াম চমস্কির মন্তব্য:
মার্কিন দার্শনিক নোয়াম চমস্কির মতে, এই পরিকল্পনা নব্বই দশকের শুরুতেই গ্রহণ করা হয়েছে। আশির দশকের শেষে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিজমের পতনের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের হাজার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার অর্থনীতিতে এক বিশাল অংশই দখল করে নিয়েছিল নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্ন।
আর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও হার্ডপাওয়ারের উৎপাদন ও রফতানির শতকরা নব্বইভাগের বেশির নিয়ন্ত্রণ মূলত পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর হাতে। অর্থাৎ অর্থনীতির এক বিরাট অংশই যুদ্ধ ও অস্ত্রব্যবসায়কে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।
আর মার্কিন অর্থনীতি ও এমআইসির বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রধান চালক শক্তি হচ্ছে জায়নবাদী ইহুদিরা। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অনুঘটকরা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনাময় দেশগুলো এবং ইসলামী দুনিয়াকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একটি নতুন শত্রু হিসেবে তুলে ধরার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, চূড়ান্ত পর্যায়ে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা তারই বাস্তব রূপ ধারণ করেছে।
এছাড়া, নিউইয়র্ক বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের লিজ গ্রহীতা ইহুদি ব্যবসায়ী ল্যারি সিলভারস্টেইনের রহস্যজনক ভূমিকা, সে সময়ে অ্যারিয়েল শ্যারনের পূর্ব নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত হয়ে যাওয়া, টুইন টাওয়ারে কর্মরত তিনহাজারের বেশি ইহুদি কর্মচারী-কর্মকর্তার সেদিন কাজে না যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোর বিচার বিশ্লেষণ করে নাইন-ইলেভেনের বিমান হামলার ঘটনা ইহুদিরা আগেই অবহিত ছিল বলে নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন অনেকেই।
তাদের যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণ অগ্রাহ্য করা যায় না বলেই মুসলিম বিদ্বেষী তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেররিজম’ সফল হয়নি।একইভাবে ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতবাদ হিসেবে ইসলামকে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ও হেয় করতে গড়ে তোলা ‘ইসলামোফোবিয়া’র ষড়যন্ত্র কার্যত পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বুমেরাং হয়েছে।
তবে, ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের আসল চেহারা পরিস্কার হলেও ততক্ষণে ঝরে গেল লাখ লাখ নিরীহ মুসলমানের প্রাণ। তথাকথিত আল-কায়দাসহ নানা নামে-উপনামের ছদ্মাবরণে জঙ্গিবাদের তকমা লেগে গেল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে।
পৃথিবীবাসীর কাছে ঘৃনিত সন্ত্র্রাসী হিসেবে মুসলমানদের চিহ্নিত করতে কতই না আয়োজন চলছে। অথচ সন্ত্রাসের প্রমান ছাড়াই আল-কায়দা, তালেবান বা হরকাতুল জিহাদ যতটা সন্ত্রাসীর কালো তালিকায় স্থান পেয়েছে, আমেরিকার অবস্থান কি তার নিচে হওয়া উচিত ছিল না?
কিন্তু বাস্তবে কি তেমনটি হয়েছে? মাঝখান দিয়ে রক্ত গেল লাখো মুসলিমের, শত্রুতে পরিণত হলো এক মুসলিম আরেক মুসলিমের, চলছে গৃহযুদ্ধ, সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইহুদি-খ্রিস্টান চক্র।
ঝাঁপিয়ে পড়ছে হুইদি-খ্রিস্টান:
চিন্তা, গবেষণা ও ইতিহাস চর্চা থেকে অনকাংশেই বিস্মৃত পরায়ন ও অধ:পতিত মুসলমানদেরই বৃহত অংশের মৌন সমর্থন নিয়েই আজ মুসলিম হত্যায় একেক সময় পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে হুইদি-খ্রিস্টান জোট। ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ জোটের আগ্রাসনই যার প্রমাণ।
ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction) রয়েছে-দিনের পর দিন পশ্চিমা পদলেহী গণমাধ্যমের এমন একতরফা প্রচারণার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করে ২০০৩ সাল থেকে ইরাকে সামরিক হামলা শুরু করে আমেরিকা-ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন জোট। হত্যা করা হয় ইরাকের লাখ লাখ মুসলমানকে।
মার্কিন আগ্রাসনে ইরাকে হতাহতদের নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত যৌথ গবেষণা করেন আমেরিকা, কানাডা ও ইরাকের একদল চিকিৎসা গবেষক। ২০১৩ সালের ১৫ই অক্টোবর প্রকাশ করা হয় সেই গবেষণার ফল। বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএনসহ বিশ্বের সমস্ত প্রভাবশালী গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় সেই গবেষণা প্রতিবেদন।
এতে বলা হয়, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পর বিগত ১০ বছরে প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটে। এছাড়াও বিভিন্ন হিসাবে হতাহতের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। এসব প্রাণহানীর পাশাপাশি আরও কয়েক লাখ মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন আগ্রাসনের ফলে।
অথচ পরবর্তীতে দেখা যায়, ইরাকের বিরুদ্ধে যেই গণবিধ্বংসী অস্ত্রের দোহাই দিয়ে একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল তা ভুল ছিল। মাঝখান দিয়ে প্রাণ গেল ৫ লাখ ইরাকি মুসলমানের এবং পঙ্গু হলেন আরও কয়েক লাখ। নির্মমভাবে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হলো প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে। ডিক্টেটর সাদ্দামের অধীনে ইরাকিরা যেমন ছিলেন এখন কি তার চেয়ে ভালো আছেন স্বজনহারা, যুদ্ধ-বিধস্ত ইরাকের মানুষগুলো।
২০১২ সালের ৩০ জুলাই দৈনিক সমকালে “ইসরায়েল ইরান আক্রমণ করলে তার নিজের ধ্বংসের পথই প্রশস্ত হবে”-এমন শীরোনামে প্রকাশিত প্রখ্যাত কলামিস্ট বদরুদ্দিন উমরের নিবন্ধের খানিকটা হলো- “ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র যে ছিল না এটা যুদ্ধের আগে তাদেরই অনুগত জাতিসংঘের পারমাণবিক কমিশন তদন্তকরে রিপোর্ট দিয়েছিল।
ইরাক যুদ্ধ শেষে তদন্ত করেও সেখানে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি। তার থেকেই প্রমাণিত হয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার কারণেই সে দেশ আক্রমণ করেনি, আক্রমণ করেছিল ইরাকের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের উদ্দেশ্যে”।
মুসলিম বিশ্ব ইরাকে তাদের স্বজাতিকে নির্মূলের সেই নির্মম দৃশ্য দেখেছে আর গোপণে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু ঠেকাতে পারেনি সেই হত্যাযজ্ঞ, গড়ে তুলতে পারেনি কোন প্রতিরোধ।
পরবর্তীতে যখন ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া তথ্য ফাঁস হলো-তখনও মুসলিম বিশ্বের কিছুই করার ছিল না। তারা এ ব্যাপারে উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তুলবে কখন শিয়া-সুন্নী থেকে শুরু করে নানামুখী অন্তর্কলহ সামলাতেই তো আজ প্রাণ ওষ্ঠাগত মুসলমানদের। মুসলমানদের এ অসহায়ত্বে অট্টহাসিতে যেন ফেটে পড়ছে ইহুদি-খ্রিস্টান বলয়।
প্রপাগান্ডার আড়ালে চলছে মুসলিম নিধন:
আবার কখনও কখনও মুসলিম বিশ্বের হুমকি-ধমকি কিংবা অনুরোধকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডার আড়ালে চলছে মুসলিম নিধন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো অমানবিক হত্যাযজ্ঞই এ দাবির পক্ষে স্বাক্ষর বহন করে।
অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের আগুনে পুড়ে মারা হয়েছে, সমুদ্রে লবনাক্ত পানিতে ভাসতে ভাসতে তারা মরেছে, অথচ তাদেরকে একটু আশ্রয় দেয়ার মতো কোন মুসলিম দেশও যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
অপরদিকে, দশকের পর দশক ধরে আমরা দেখে আসছি শিয়া-সুন্নী রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ, ইরান-সৌদি অশ্বস্তিকর শত্রুতা, পাকিস্তানে একের পর আত্মঘাতি হামলা এবং আফগানিস্তানে নিজেদের মধ্যে লড়াই। দেখতে হচ্ছে সৌদি-ইয়েমেন লড়াই, ইরান-তুরস্কের বৈরি সম্পর্ক এবং সিরিয়া ইস্যুতে একেক মুসলিম দেশের একেকমুখি অবস্থান। একদিকে, ইরান-তুরস্কের মার্কিনমুখী অবস্থান এবং ইরানের রাশিয়া-চীনমুখী অবস্থান।
সবশেষ সবকিছুকে ছাড়িয়ে মুসলিম বিশ্বের জন্য রীতিমতো ভয়াবহ বিষফোঁড়ার মতো আইএস কিংবা আইএসআইএলের উত্থান। সবাই সবার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, সবাই এক আল্লাহর দোহাই দিয়ে নিজ অবস্থান পাকাপোক্ত করতে যারপরনাই চেষ্টা-তদবীর চালিয়ে যাচ্ছেন।
খেই হারিয়ে ফেলছে মুসলিম সমাজ:
আর এরই মধ্যে একটু অসচেতন তো দূরের কথা; সচেতন ও শিক্ষিত মুসলিম সমাজও খেই হারিয়ে ফেলছেন, বুঝতে পারছেন না কি করবেন, কোথায় অবস্থান নিবেন, কিংবা কার হয়ে কাজ করবেন।
উদাহরনস্বরুপ বলা যায়, বৃটেন ও আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মুসলিম ছাত্ররা আজ সন্ত্রাসী ও ইহুদী-খ্রিস্টানদের সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে তৈরি আইএস বা আইএসআইএল-এর মতো সংগঠনে জিহাদি জোশ নিয়ে যোগদান করছে।
সব কিছুতে সঠিক তথ্য পাওয়ারও কোন উপায় নেই। কারণ বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা, রয়টার্স, সিনহুয়া, এপি, এএফপি ও এপিটিএন থেকে শুরু করে বিশ্বের সমস্ত প্রভাবশালী গণমাধ্যমই পরিপূর্ণভাবে বা বহুলাংশেই ইহুদি-খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রেণে।
তারা মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে বস্তুনিষ্ঠতার তকমা লাগিয়ে জনসম্মুখে হাজির হলেও আসল জায়গায় গিয়ে অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্ধ-সংঘাত সৃষ্টি কিংবা মুসলমানদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি বানানোর ক্ষেত্রে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে হর-হামেশাই।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যেমন ফেসবুক বা টুইটারের কল্যাণে অথবা ইউটিউবের বদৌলতে হয়তো বা কিছুটা সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন বিশ্ববাসী। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবের মতো শক্তিশালী মাধ্যমগুলোও পুরোপুরি ইহুদি-খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে।
সিরিয়ায় আইএস (ইসলামিক স্টেট), আফগানিস্তানে তালেবান, ইরাকে আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যন্ড দ্য লিভান্ট), ফিলিস্তিনে হামাস, লেবাননে হিযবুল্লাহ, আফ্রিকায় বোকো হারাম কিংবা লাদেনের আল-কায়দা এবং হরকাতুল জিহাদের মতো সংগঠনকে যেভাবে ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের প্রতীকে পরিণত করার প্রয়াস চালানো হয়েছে তার সিকিভাগও কি সন্ত্রাসের তালিকায় খোদ আমেরিকা, ইসরাইল কিংবা সবশেষ মিয়ানমারের খুনি বৌদ্ধদের রাখা সম্ভব হয়েছে?
অথচ এদের হাত বেশি নিরাপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে নাকি উপরে উল্লিখিত ওইসব সংগঠনের হাতে বেশি রক্তের হোলিখেলা হয়েছে-বিশ্ব বিবেক তা খুব ভালো করেই বুঝতে সক্ষম।
সবচেয়ে বড় দু:খজনক বাস্তবতা হলো-বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান বর্তমান সমস্ত বড় বড় সংকটের ফলে রক্ত ঝড়ছে এক তরফা মুসলমানদের। আই এস কিংবা আইএসআইএলের হাতে যারা মরছেন-একদিকে তারা সবাই মুসলিম (হাতে গোনা কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক বা অন্য পেশার লোক ব্যতীত)।
অপরদিকে, এদেরকে দমনের নামে আমেরিকান জোট বা রাশিয়ার চালানো হামলায়ও যারা মরছেন তারাও মুসলিম। ইহুদি-খ্রিস্টানদের সুদূরপ্রসারি চক্রান্তের ফসল আইএস বা আইএসআইএলে প্রতিনিয়ত অসচেতন আবেগি মুসলমানরা জেহাদের প্রেরণা নিয়ে প্রতিনিয়ত যোগ দিচ্ছেন।
অসময়ে নিভে যাচ্ছে আশার আলো:
আগামী দিনের মুসলিম বিশ্বের আশার আলো তরুণদের কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজেদেরই ধর্মের লেবাসে বিপথগামী করে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মৃত্যুর দিকে। আবেগের তাড়নায় দিশেহারা তরুণরা বুঝতেই পারছেন না নিজেদের বন্দুক তারা তাদেরই স্বজাতির দিকে তাক করে অনর্গল ফায়ার করে যাচ্ছেন।
ইহুদি-খ্রিস্টান গংরা ঐক্যবদ্ধভাবে দীর্ঘ গবেষণা চালিয়ে যে কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে একের পর এক তার সফল বাস্তবায়ন চলছে। একদিকে, মুসলমানদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে তারা লাভবান হচ্ছেন। অপরদিকে, সেই অস্ত্রই আবার মুসলমানের ওপর প্রয়োগ করে তারা মুসলামের হাতে মুসলমান নিধনের পরকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছে।
লক্ষ্য করুন, নানা মতানৈক্য ও টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল-আমেরিকার সম্পর্কে কখনো সেই অর্থে ভাটা পড়ছে না; কিংবা তাদের মূল এজেন্ডা অর্থাৎ মুসলিম হত্যা ও মুসলমানদের সন্ত্রাসী বানানোর কাজ কখনো থেমে নেই। অথচ প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর শত্রুতা দিনে দিনে চরম আকার ধারন করছে।
সৌদি-ইরান কেন এক টেবিলে বসছে না?
এটা একটা আশ্চর্যজনক রহস্য, কেন সৌদি-ইরান মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণ সাধনে এক টেবিলে বসতে পারছে না? কেন ইরান-তুরস্কের শত্রুতা দিনকে দিন বেড়েই চলছে? এরকম আরও বহু “কেন” বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে চলেছে।
একই আল্লাহকে প্রভূ হিসেবে মানা, একই ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনকে অনুসরণ করা, একই নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে রাসূল হিসেবে গ্রহণ করার পরও মুসলমানদের এমন দূরত্ব বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, শিয়া-সুন্নী-আহলে হাদীস-কুর্দি-এমন নানা নামে এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীর ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সত্যিই এ এক বড় অবাক করা বিষয়!
অথচ কখনও কি এমন শোনা যায়- খ্রিস্টানদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে এতজন মারা গেছে? অথবা এমন খবর কি গণমাধ্যমের শীরোনাম কখনও হয়েছে-ইহুদিদের অমুন গোত্র অমুন গোত্রের ওপর আত্মঘাতি হামলা করেছে; কিংবা হিন্দু বা বৌদ্ধদের বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে?
অথচ মুসলিম বিশ্বের চিত্র কতটাই অস্বাভাবিক, আত্মোপলব্ধি ও সচেতনতাবোধ কতটা নিচে নেমে গেলে মুসলমানদের এই পরিণতি হয় বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়কে এখনই তা ভেবে দেখা দরকার।
কেবি





