রোজার দ্বারা মানুষ নানাবিধ দৈহিক ও মানসিক উপকারিতা লাভ করে। রোজার দ্বারা আত্মা পবিত্রতা লাভ করে। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অভাবহীনতার কারণে অভাবগ্রস্থদের কষ্ট কখনো উপলব্ধি করেনি, তারা রোজা রাখার মাধ্যমে সামান্য হলেও অভাবগ্রস্থদের কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের প্রতি সহানুভুতি সৃষ্টির বাস্তব প্রেরণা লাভ করে।

রমজান মাসে রোজা রাখলে রুজি বৃদ্ধি পায়, ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়। রোজা রাখার ফলাফলের উপর ১৯৫৮-১৯৬৫ সালে ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো হয়েছিল। এ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছিল যে, রোজা রাখার মধ্যে সুস্পষ্ট দৈহিক উপকারিতা বিদ্যমান। এর সপক্ষে যুক্তি প্রদত্ত হলো

১. রোজা রাখলে শরীরের ভার আস্তে আস্তে কমে যায়, তবে তার ফলে কোন ক্ষতি হয় না। এভাবে শরীর ভার কমে যাওয়া খুবই উপকারী। শরীরের অধিক ভার কমানোর জন্য এটাও এক প্রকার থেরাপিউটিক ব্যবস্থা। দেহের অধিক ভারে ভারাক্রান্ত রোগী রোজার মাসের রাত্রে অধিক ভোজন থেকে নিজেকে দূরে রাখবে। শুধু তাই নয়, রোজাবিহীন মাসগুলোতেও সে অধিক খাদ্য গ্রহণ করবে না।

২. রমজান মাসে এক মাস রোজা রাখলে তার দ্বারা ঐুঢ়ড় ধহফ যুঢ়বৎপযষড়ৎযুফৎরধ পরিবর্তিত হয়ে সাধারণ অমলত্বে রূপান্তরিত হয়। যেহেতু রোজা রাখার জন্য গ্যাষ্ট্রিক অম্লত্ব স্বাভাবিকভাবে কমে যায়, সেহেতু রমজান মাসের রোজা উচ্চ অম্লত্ব কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রতিরোধ করতে পারে। এই উচ্চ অম্লত্ব থেকে সৃষ্টি হয় পেপটিক আলসার।

৩. পেপটিক আলসারের নজির মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে পরিলক্ষিত হয় না। এর কারণ হচ্ছে- মুসলমানগণ রমজান মাসে রোজা রাখেন এবং তাদের খাদ্যের মধ্যে মদ থাকে না।

৪. রোজার ফলে শরীরের যে পরিমাণে ওজন কমে যায় তা স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ নয়। বরং তা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

৫. শরীরের পাকস্থলীতে এক প্রকার কীট খাদ্য হজমে সাহায্য করে। বছরের ১১ মাস এ সকল কীট অনবরত খাদ্য হজমের কাজে লিপ্ত থাকার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক মাস রোজার ফলে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বিশ্রাম পায়। বিশ্রামের ফলে এরা এবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে বাকি ১১ মাস পুনরায় খাদ্য হজম কাজে লিপ্ত হয়।

রোজা শুধুমাত্র নবীজী (সাঃ)-এর উম্মতের উপরই ফরজ হয়েছে তা নয়, নবীজী সাঃ-এর পূর্ববর্তী উম্মতের উপরও ফরজ ছিল।

তাই মহান আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেন- হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগার হতে পার (সুরা বাকারা-১৮৩)।

যারা তোমাদের পূর্বে ছিল কথাটি ব্যাপক অর্থবোঁধক। এর দ্বারা হযরত আদম (আঃ) হতে শুরু করে নবীজী (সাঃ)-এর উম্মতের রোজার সময়সীমা, সংখ্যা এবং কখন তা রাখা হবে এসব ব্যাপারে পার্থক্য হতে পারে। বাস্তব ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।

অন্যান্য ধর্মে রোজা:

আরবে ইহুদী পৌত্তলিকদের মাঝে মহরম মাসে রোযার নিয়ম প্রচলিত ছিল। নবীজীও (সাঃ) আশুরায় রোজা রাখতেন। প্রাচীন মিসরীয়দের মধ্যে ধর্মীয় বিধানে রোজার উল্লেখ আছে। গ্রীকদের মধ্যে শুধু মেয়েদের রোজা রাখার হুকুম ছিল। পারসিক ধর্মের রোজার বিধান প্রমাণ পাওয়া যায়।

খ্রিষ্টধর্মে রোজার হুকুম ছিল। তবে তাদের রোজার সঠিক কোন রূপ আজ বর্তমান নেই।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে সারাবছর দ্বীনের কাজ আহকাম সঠিকভাবে পালন করার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নেয়া।

তাই সিয়াম সাধনার পাশাপাশি একজন মুমিন বান্দাকে যা করতে হবে তা হচ্ছে- ১. ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে। ২. হালাল রুজি খেতে হবে। ৩. মিথ্যাচার সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে। ৪. অন্যের বদনাম/গীবত করা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে। ৫. ঘুষ নেয়া-দেয়া বন্ধ করতে হবে। ৬. মানুষের জন্য অমঙ্গল সব কাজ বন্ধ করতে হবে। ৭. ফিতরা, যাকাত আদায় করতে হবে। ৮. সর্বোপরি ইসলামের যাবতীয় হুকুম আহকাম মেনে চলতে হবে।

দীর্ঘ ১ মাস রোজা রাখার ফলে পাপ-পাঙ্কিলতা থেকে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করে। সুন্দর নির্মল জীবন গঠনে সহায়তা করে। নানারকম ঝগড়া, ফাঁসাদ, হিংসা, বিদ্বেষ, মারামারি, আত্ম-কলহ ও নানাবিধ অমানবিক কার্যকলাপ দূর করে। রমজান মাস ত্যাগ ও তিতিক্ষার মা এ মাসে সিয়াম সাধনার ফলে মানুষের মাঝে ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, সবুর, সহনশীলতা সৃষ্টি হয়।

আর ঈমানের অর্ধেক অংশই হচ্ছে ধৈর্য ও সবুর। তাই নবীজী (সাঃ) বলেছেন- রোজা ঢালস্বরূপ। ঢাল যেমন শত্র“র আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি রোজা পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মানুষকে রক্ষা করে। অভাবের কারণে কেউ যদি বিবাহ করতে সক্ষম না হয় কিংবা স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ করতে অসমর্থ হয় সেক্ষেত্রে তাকে বেশি বেশি করে রোজা রাখতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ রোজা মানুষের রিপুকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণ করে।

রোজার দ্বারা মানুষ নানাবিধ দৈহিক ও মানসিক উপকারিতা লাভ করে। রোজার দ্বারা আত্ম পবিত্রতা লাভ করে। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অভাবহীনতার কারণে অভাবগ্রস্থদের কষ্ট কখনো উপলব্ধি করেনি, তারা রোজা রাখার মাধ্যমে সামান্য হলেও অভাবগ্রস্থদের কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের প্রতি সহানুভুতি সৃষ্টির বাস্তব প্রেরণা লাভ করে। রমজান মাসে রোজা রাখলে রুজি বৃদ্ধি পায়, ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়।

আসমান-জমিনের সকল ফেরেশতা আল্লাহতায়ালার দরবারে রোজদারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। শয়তানকে দলবলসহ বন্দী করা হয়। আল্লাহর দরবারে রহমতের দরজা খোলা থাকে। রোজাদারের জন্য বেহেস্তের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মূলত দুইটি কাজ সম্পাদিত হয়। এক ক্ষুধার যন্ত্রণার মধ্যেও আল্লাহর হুকুম পালন করা। দুই সিয়াম সাধনার মাধামে নিজের আত্মাকে পাপমুক্ত করা।

যারা ঈমানের সাথে সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রেখেছে, তার পেছনের সমস্থ ছগীরা গোনাহ মাফ করা হবে। মাহে রমজান ইবাদতের মাস। এ মাসে একটি নফল ইবাদত করলে অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান পুণ্য লাভ হয়।

যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল তাকে অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান নেকি দান করা হবে। প্রত্যেক নেক কাজের নেকি ১০ গুণ হতে ৭শ গুন পর্যন্ত আল্লাহ পাক দেবেন। নবীজী (সাঃ) বলেন, রমজানে আমার উম্মতগণকে ৫টি খাস নিয়ামত দেয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোন নবীর উম্মতকে দেয়া হয়নি।

তা হচ্ছে- (১) তাদের জন্য প্রতিদিন বেহেশত সাজিয়ে আল্লাহ বলেন, দুনিয়াতে আমার নেক বান্দাগণ সকল ক্লেশ ভুলে তোমার দিকে আসছে। (২) রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মৃগনাভির সুগন্ধি অপেক্ষা পছন্দনীয়। (৩) নদী ও সাগরের মৎস্যকুল আল্লাহর কাছে ইফতার পর্যন্ত রোজাদারের জন্য দোয়া করে।

এই সময় আসমান জমিনের সব ফেরেশতা, কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখী, এমনকি তরুলতা, ঘাস-পাতা, মাটির টিলাও রোজাদারের মাগফেরাত কামনা করে। (৪) রমজানে পাপিষ্ট শয়তানকে বন্দী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, তাই রোজাদার কোন পাপ করতে পারে না। (৫) রমজানের শেষ রাত্রে রোজাদারদের গোনাহ মাফ হয়। রমজান মাসে রোজাদার যত হালাল খাবার খাবে তা ইবাদতের মধ্যে গন্য হবে।

পবিত্র রমজান মাসকে শাহরুল কোরআনও বলা হয়। কোরআনের মাস এ রমজান কোরআনের জন্যই নিবেদিত। রমজান মাসেই মহান আল্লাহপাক হযরত জিব্রাইল (আঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর প্রিয় বন্ধু নবীজী (সাঃ)-এর ওপর কোরআন যতটুকু নাজিল হতো রোজার মাসে সবটুকু একে অপরকে পাঠ করে শোনাতেন। কিন্তু এক রমজান মাসে পবিত্র কোরআন নবীজী (সাঃ)-এর নিকট দুইবার পাঠ করে শুনতে চাইলে তখন তিনি বুঝতে পারেন যে, এ পৃথিবীর বুকে সম্ভবত এটাই শেষ রমজান।

এ রমজানের শুধুমাত্র আল কোরআনই নাজিল হয়নি তাওরাত রমজানের ৬ তারিখের যবুর রমজানের ১২ তারিখে, ইঞ্জিল রমজানের ১৩ তারিখে নাজিল হয়েছে। অন্যান্য সহীফা এ মাসেই নাযিল হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর সহীফা এ রমজান মাসেরই ১ তারিখে নাজিল হয়েছে।

মুসাফিরের রোজা:

কোন মুসাফির দীর্ঘ সফরে গেলে রোজ না রাখার বিধান রয়েছে। কোন মুসাফির নিজ স্থান হতে সফরে ৪৮ মাইল দূরে, ৩ মঞ্জিল দূরে, ১৫ দিন অতিবাহিত করবেন- এমন স্থানে গেলে রোজা না রাখার বিধান রয়েছে।

রোজা সম্পর্কিত নবীজী (সাঃ)-এর কতিপয় হাদিস: নবীজী (সাঃ) বলেন, পবিত্র রমজানে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন, আর আমি সুন্নত হিসেবে রেখে যাচ্ছি (তারাবী) নামাজ। যে ব্যক্তি রমজান লাভ করল, এর দিবসে রোজা পালন করল এবং রজনীতে নামাজ আদায় করল তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। নবীজী (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে সকল পাপ বর্জন করতে পারল না তার রোজা কোন কাজে আসবে না।

নবীজী (সাঃ) বলেছেন, মানুষের আমলের ১০ গুন হতে ৭শ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, রোজা এ নিয়মের ব্যতিক্রম। কেননা, রোজা একান্ত আমার জন্য নিবেদিত এবাদত এবং এর প্রতিদান আমি নিজ হাতে দেব। কেননা, বান্দা একমাত্র আমার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই ইন্দ্রিয় তৃপ্তি এবং খাদ্য, পানীয় ত্যাগ করে। অতঃপর বলেন, রোজাদারের জন্য দুইটি মওকা রয়েছে। একটি সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করার সময়ে। অন্য খুশিটি আসবে যখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধ থেকেও উত্তম বিবেচিত। রোজা একেধারে পাপ-পঙ্কিলতা এবং দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢালস্বরূপ। তোমরা যখন রোজা রাখবে, তখন অশ্লীল বাক্যালাপ করবে না। চেঁচামেচি করবে না। যদি কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে বা তোমাকে গালাগালি করে, তবে বলে দেবে, আমি রোজাদার।

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। (বুখারী মুসলিম)। নবীজী (সাঃ) এরশাদ করেছেন, অসুস্থতা বা শরীয়ত অনুমোদিত কোন কারণ ছাড়া যদি কেউ একটা রোজা ছেড়ে দেয়, তারপরও যদি সে রোজাটি কাযা করে নেয়, তবে কাযা আদায় হযে যাবে, কিন্তু সমগ্র জীবন রোজা করেও সেই রোজার ফজিলত লাভ করতে পারবে না। (আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত)। নবীজী (সাঃ) এরশাদ করেছেন, রোজার ইফতার করার সময়, রোজাদারের দোয়া কবুল হয় (আবু দাউদ)। হযরত আবু সাঈদখুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলে করীম (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে লোক একদিন আল্লাহর পথে রোজা রাখবে, আল্লাহ তার মুখমণ্ডল জাহান্নাম হতে দূরে সরিয়ে রাখবেন (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি)।

এআই /কেবি