মুক্তিযুদ্ধকালীন  মানবতা-বিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬টি রায় নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

তাছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ১টি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষমান রয়েছে।

শহীদ পরিবার সহ দেশবাসী প্রশ্ন কেন হচ্ছে না নিজামীসহ অন্যান্য মানবতা বিরোধীদের রায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী টাইমনিউজবিডি'কে জানান, 'নিজামীর রায় আদালত যখন চাইবে তখন দিতে পারে।এখন তো আর আদালত বন্ধ নাই, তাছাড়া নিজামী সাহেব সুস্থ্য আছেন।আশা করছি দ্রুত নিজামীর রায় হবে।'

মাওলানা নিজামীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম জানান, 'রায় দেয়ার ক্ষেত্রে কোন আইনী বাধা নেই।আদালত যখন চাইবে তখন দিতে পারে।তবে সময় ক্ষেপণের ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।'

এ বিষয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন,' গোটা জাতীর প্রশ্ন,৩০ লাখ শহীদ পরিবারের প্রশ্ন,৪২ বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করছি মানবতা বিরোধীদের বিচারের জন্য।"

রায় ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা ট্রাইব্যুনালের ৬ মামলার আসামিরা হলেন-জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলী, ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার আওয়ামীলীগ নেতা মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, বিএনপি নেতা ফরিদপুরের নগরকান্দার মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ওরুফে খোকন রাজাকার।

তাদের মধ্যে খোকন রাজাকার পলাতক রয়েছেন, অন্যান্যরা কারাগারে।এদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রেখেছে আপিল বিভাগ।

প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী আরো বলেন, বিচারিক কার্যক্রম শেষে এসব মামলা রায় ঘোষনার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে।তিনি বলেন, অনেক প্রতিকুলতা কাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।

হায়দার আলী বলেন, এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১৯৭৩ সালের (অ্যাক্ট) আইনে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাস্ট্রপক্ষের আপিলের সূযোগ ছিলনা।ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনে সংশোধণী এনে উভয়পক্ষের আপিলের সংযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায় সব পক্ষ সমান আইনি সুবিধা ভোগ করছে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম প্রধান অঙ্গিকার ছিলো যুদ্ধপরাধীদের বিচার করা।ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বধীন মহাজোট দুই তৃতীয়াংশের বেশী আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।সরকার গঠনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যুদ্ধপরাধীদের বিচারে সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়।

পরে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ  ট্রাইব্যুনাল, তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিম গঠন করা হয়।প্রথমে ১টি ট্রাইব্যুনালে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।পরে এই বিচার কাজকে তরান্বিত করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

বিচারিক কার্যক্রম শেষে পৃথক দুটি ট্রাইবুনালে ইতোমধ্যে ৯টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে।এসব মামলায় আনীত অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকে ৯০ বছরের জেল, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী , সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজামান, সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় অবস্থানরত চৌধুরী মঈনুদ্দিন, আশরাফুজ্জামান খান ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়া হয়।

ইতোমধ্যে আব্দুল আলীম কারাগারে থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।বাচ্চু রাজাকার, চৌধুরী মঈনুদ্দিন, আশরাফুজ্জামান খান বিদেশে অবস্থান করায় তাদেরকে মামলায় পলাতক দেখানো হয়েছে।

জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে রায় দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল-২।এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও আসামি উভয়পক্ষে করা আপিল শুনানী শেষে দন্ড বাড়িয়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দেয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।পরে এ দন্ডাদেশ কার্যকরও করা হয়।

সাঈদীকে দেয়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষে করা আপিল নিষ্পত্তি করে তাকে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।

এছাড়াও উভয় ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুস সুবহান ও জাতীয় পার্টির নেতা পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

কেএ