বাংলা সাহিত্য সৌধের কালজয়ী প্রতিভা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিমাখা কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে ভারতের শান্তি নিকেতনের আদলে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কোন প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি আজো। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পাঁচ বছর পার হলেও ঘোষণা শুধু কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিলাইদহের কুঠিবাড়িকে দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সে স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সত্বেও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কোন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরা হলে বিষয়টি তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনার আশ্বাস দেন।

পরবর্তীতে গত ২০১০ সালের ৮ মে ওসমানী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কবির জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্পষ্ট ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষনাকে বাস্তবায়নে ঢাকাস্থ্য কুষ্টিয়া জেলা সমিতির মহাসচিব আব্দুর রাজ্জাকসহ সমিতির নেতৃবৃন্দ তথ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মহাদ্বোয়ের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। সেময় কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুষ্টিয়ার সামনে সমিতির পক্ষে একটি সাইনকোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ কুষ্টিয়া সফরকালে কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আবুল কালাম আজাদ শিক্ষা মন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে একটি ডিও লেটার ও চিঠি লিখেন।

ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ এক মহান যুগ স্রষ্টা পুরুষ। তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতি বিশ্ব দরবারে বিপুল পরিচিতি লাভ করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালির স্বতন্ত্র জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই মহান কবির স্মৃতি ও কর্মের যোগ্য মর্যাদা দানের জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান শিলাইদহে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন কিংবা তদপূর্বে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে আমাদের জ্ঞান, ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হবে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী আমাকে আপনার সাথে পরামর্শ করে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সদয় নির্দেশনা দেন। চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বর্ণিত প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।

কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।

অথচ এই শিলাইদহেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যকর্মের উল্লেখযোগ্য অংশ রচনা করেছিলেন। এমন কী নোবেল জয়ী কাব্য ‘গীতাঞ্জলী’র মূল-সুর তিনি শিলাইদহেই পেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই কুষ্টিয়ার শিলাইদহেই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরী।

গবেষক ম. মনিরুজ্জামান বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের রস অন্বেষণের জন্য বারবার শিলাইদহে এসেছেন। অথচ ঐতিহাসিক এই কুঠিবাড়িকে কেন্দ্র করে সরকারের কোনো আগ্রহ নেই।

বঙ্গবন্ধুর সময় কুঠিবাড়িকে দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন আর আলোচনায় আসে না।

কুষ্টিয়ার কবি মতিউল আলম জানান, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এখানে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তথ্যমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে চিঠি দেয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়া ও প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় এলাকার মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৮৯১ সালে জমিদারী পরিচালনার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুঠিবাড়িতে আসেন। কবির নানা সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে শিলাইদহ গ্রাম, কুঠিবাড়ির বিশেষ অবদান ও ভূমিকা রয়েছে।

শিলাইদহের নিভৃত পল্লীতে বসে কবি প্রবন্ধ, কবিতা, গল্পসহ অসংখ্য গান রচনা করেছেন। এরমধ্যে গীতাঞ্জলী, চিত্রা, ক্ষণিকা, উর্বশী ও দুই বিঘা কবিতাসহ অসংখ্য গান লিখেছেন তিনি।

এমকে