দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের বিএনপি রাজনীতি দুইটি বলয়ে বিভক্ত। একটি বলয়ের নেতৃত্ব ছিল সমশের মবিন চৌধুরীর অপরটি নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর। কিন্তু গত বুধবার সমশের মবিন চৌধুরীর আকষ্মিক পদত্যাগে বেকায়দায় পড়েছেন তার অনুসারীরা।
এ অবস্থায় ভবিষ্যতে তার অনুসারীদের রাজনীতির পরিণতি কি হবে তা নিয়ে চলছে নানা পর্যালোচনা।এমনকি ভবিষ্যত রাজনীতির গুরু হিসেবে কাকে মেনে নেবেন, নাকি আপাতত নীরব থাকবেন তা নিয়েও চলছে বিস্তর আলোচনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলিট বিএনপির নেতারা মনে করছেন-তিনি দলের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন সেটা অনেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পদত্যাগ করতে পারেন এটি তার অনুসারীরা কল্পনাও করতে পারেনি।
তবে তার পদত্যাগে সিলেট বিএনপির ইলিয়াস অনুসারী নেতারা ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।
অন্যদিকে, সমশের মবিন চৌধুরীর দল থেকে পদত্যাগের একদিন পর আকস্মিক সিলেট সফরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি থেকে সমশের মবিনের চৌধুরীর পদত্যাগে দলের কোনো ক্ষতি হবে না।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, সিলেট বিএনপির একটি বড় অংশ সমশের মবিন চৌধুরীকে নেতা মেনেই রাজনীতি করতেন। সমশের মবিন সিলেটে আসলে ওসমানী বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করাসহ তাকে নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন ওই নেতারা। সব সময় সমশেরের আশপাশে থাকতেন তারা। সিলেট বিএনপি কিভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়েও পরামর্শ দিতেন তিনি।
জানা যায়, এক সময়কার সিলেটের প্রভাবশালী নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর সিলেটে তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত আরিফুল হক চৌধুরী, ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীসহ ওই বলয়ের নেতারা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সিলেট বিএনপিতে তখন চাঙা হয়ে ওঠেন এম ইলিয়াস আলী অনুসারীরা। এমন অবস্থায় সমশের মবিন চৌধুরী সিলেট বিএনপি ধীরে ধীরে তার বলয় তৈরি করতে থাকেন। পরবর্তীতে খুব দ্রুতই সাইফুর অনুসারীদের অভিভাবক হিসেবে আর্বিভুত হন।
এরপর থেকে সাইফুর অনুসারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সমশের মবিন চৌধুরী আর ইলিয়াস আলী নেতৃত্ব দেন তার অনুসারীদের। যার প্রভাব পড়ে বিগত জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি করার সময়ও।এই দুই বলয়ের আধিপত্য বজায় রাখতে জেলা বিএনপির নেতৃত্ব ছিলেন ইলিয়াস অনুসারীদের দখলে আর মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব চলে যায় সমশের মবিন চৌধুরী অনুসারীদের দখলে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হলে ইলিয়াস অনুসারীরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন সিলেটের রাজনীতিতে। পরে অবশ্য ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা ওই পক্ষের হাল ধরেন।
এ অবস্থায় বুধবার বিএনপি থেকে সমশের মবিনের আকস্মিক পদত্যাগে এবার হতাশ সাইফুর-সমশের অনুসারী নেতারা। ইলিয়াস অনুসারী নেতারা অবশ্য সমশের মবিনের পদত্যাগে উল্লসিত। তারা এখন অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। এই অংশের নেতারা বলছেন সমশের মবিন দল থেকে বিদায় হওয়ায় সিলেটের ওয়ান ইলেভেনের সুবিধাভোগী নেতারা এখন দল থেকে চলে যাবেন। ফলে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।
সিলেটে সমশের মবিনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আবুল কাহের শামীম বলেন, সমশের মবিন চৌধুরী এভাবে পদত্যাগ করায় সিলেটবাসী ক্ষুব্ধ ও হতবাক। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশের বাইরে-দলের এমন দুঃসময়ে এখন এসব না করলেও পারতেন তিনি। দলের ভেতর ভিন্নমত-মতবিরোধ থাকতেই পারে, তাই বলে পদত্যাগ মেনে নেয়া যায় না।
সমশের মবিনের পদত্যাগে সিলেটবাসী মর্মাহত বলে মন্তব্য করেছেন তার অনুসারী সিলেট মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি বলেন, সিলেটবাসী একজন হেভিওয়েট রাজনীতিবীদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। জাতীয় পর্যায়ে সিলেট নেতৃত্ব শূন্য হবে। তিনি সর্বশেষ সিটি নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের অবদান রেখে বিএনপিকে এর সফলতা এনে দিয়েছেন। তাই তার এভাবে রাজনীতিকে বিদায় বলে দেয়ায় আমরা হতাশ।
সমশের মবিন বলয়ের নেতারা এখন কোন পথে রাজনীতি করবে এমন প্রশ্নের জবাবে কয়েছ লোদী বলেন, জাতীয় পর্যায়ের একজন নেতার সিলেটে কোনো বলয় নেই। আমরা মনে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী, সকল নেতাকর্মীই সমশের মবিন চৌধুরীকে শ্রদ্ধা করতেন। তাই তার কোনো বলয় থাকতে পারেনা।
সিলেটে সমশের মবিন অনুসারী নেতারা হলেন, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ হক, বর্তমান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান সেলিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসিম হোসেইন, জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আবুল কাহের শামীম, মাহবুবুর রব ফয়সল, ফয়সল আহমদ চৌধুরী, জেলা যুবদলের সভাপতি আব্দুল মান্নান, সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ চৌধুরী, ডা. নাজমুল ইসলাম।
ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক রেজাউল করিম নাচন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাফেক মাহবুব, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী, মহানগর ছাত্রদল নেতা মাহবুবুল করিম জেহিন প্রমুখ। তারা কাকে নেতা মেনে সিলেটে রাজনীতি করবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এমএইচ





