স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বলতে ১৯৭১ সালের পর নির্মিত চলচ্চিত্রকেই বোঝায়। বাংলাদেশে ১৮৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এই অঞ্চলে ১৯০০-এর দশকে নির্বাক এবং ১৯৫০-এর দশকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়।
১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট আবদুল জব্বার খান পরিচালিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায়। পরিচালক নিজেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। নায়িকা চরিত্রে ছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেন।
চলচ্চিত্র মঞ্চের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০-এর দশকেই। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খেতে চলচ্চিত্রের প্রায় ৫০ বছরের মত সময় লেগেছে।
১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেতো। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এ হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড়ই বলা যায়, যদিও এশিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে তা অনেকটাই উপেক্ষিত।
স্বাধীনতার পরে আবির্ভূত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে আলমগীর কবির (১৯৩৮-১৯৮৯) উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র হলো ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্য কন্যা (১৯৭৬), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), মোহনা (১৯৮২),পরিণীতা (১৯৮৪) ও মহানায়ক (১৯৮৫)।
স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে এদেশে ৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের স্বরলিপি, অশোক ঘোষের নাচের পুতুল, আলমগীর কুমকুমের স্মৃতিটুকু থাক এবং খান আতাউর রহমানের সুখ দুঃখ সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ২০০৩ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না ছবিটি সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পেশ করা হয়। চূড়ান্ত পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হলেও এটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ এটিই প্রথম বাংলাদেশী ছবি যা অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করা হয়।
গত ৩০ বছরের মধ্যে ২০১১ সালটা ছিল ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পের সবচেয়ে মন্দার বছর। এ বছর ১০টি সেরা ব্যবসাসফল ছবিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ৪৭টি বাংলা এবং একটি ভারতীয় ছবি মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে।
যে পাঁচটি ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে, সেগুলো হলো—তোর কারণে বেঁচে আছি, মাটির ঠিকানা, মনের জ্বালা, টাইগার নাম্বার ওয়ান ও প্রিয়া আমার জান।
অন্যদিকে মোটামুটিভাবে ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে যে ছবিগুলো, তার মধ্যে আছে—বস নাম্বার ওয়ান, এক টাকার ছেলে কোটি টাকার মেয়ে, হৃদয় ভাঙা ঢেউ, জান কোরবান।
গত বছর প্রায় অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। যা গত চার বছরের তুলনায় বেশি। চলচ্চিত্রকাররা বলছেন, এটি আশার কথা হলেও আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে মুক্তির সংখ্যা বাড়লেও ব্যবসায়িক চিত্র হতাশাজনক। লগ্নিকৃত অর্থও ফেরত আসছে না।

চলচ্চিত্রে এই মন্দা কেন জানিয়েছেন চার চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব-
চাষী নজরুল ইসলাম বলেছেন, চলচ্চিত্রের মূল উপাদান হলো গল্প। বর্তমানে ঢালিউডে গল্পের খরা চলছে। উন্নত গল্পের অভাবে দর্শক ছবি দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ৩৫ মিলিমিটারে শুট করার বিকল্প নেই। এই পদ্ধতিতে চিত্রায়ণ করে পরে তা ডিজিটালে ট্রান্সফার করতে হবে। বিশ্বে এই নিয়মই চালু আছে। তাই উন্নত গল্প এবং ৩৫ মিলিমিটারে শুট করতে পারলে চলচ্চিত্রের মন্দাবস্থা কাটানো যাবে।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, প্রকৃত চলচ্চিত্রের জন্য উপযুক্ত গল্প প্রয়োজন। তা ছাড়া গল্প বলার ঢংয়েও পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে সব ধরনের গল্পের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। এটি চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সুখবর বটে। আসলে গল্পে কমপেক্ট থাকতে হবে। গল্প বলায় নতুনত্ব আনতে হবে। না হলে একঘেঁয়েমির কারণে দর্শক দেশীয় চলচ্চিত্রবিমুখ হতেই থাকবে।
তাদের নতুন গল্প ও ভিন্ন আঙ্গিকের নির্মাণ উপহার দিতে হবে। তা হলেই তারা ছবি দেখবে এবং চলচ্চিত্র শিল্পের মন্দাবস্থা কাটানো যাবে।
অনুপম হায়াৎ বলেছেন, আমি মনে করি চলচ্চিত্রে মন্দার মূল কারণ প্রযুক্তি। এখন প্রযুক্তির কারণে মোবাইলেও ছবি দেখতে পাওয়া যায়। ফুতপাতে স্বল্পমূল্যে সিডি কিনতে পাওয়া যায়। নেট থেকে ছবি ডাউনলোড করা যায়। পাশাপাশি খোলা আকাশ সংস্কৃতির কারণে দর্শক ঘরে বসে বিশ্বের ছবি দেখতে পায়। ফলে তারা বেশি টাকা ব্যয় এবং যানজটসহ নানা অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যাবে কেন। প্রযুক্তিতো হাতের মুঠোয়।
তাই বলব একাধারে অর্থনেতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণে দেশীয় চলচ্চিত্র মন্দাবস্থায় পতিত হয়েছে।
নার্গিস আকতার বলেছেন, বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা বেড়েছে সত্যি, কিন্তু মান বাড়েনি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এখন যারা নির্মাণে আসছে তাদের বেশিরভাগই প্রকৃত চলচ্চিত্রকার নয়, নাটক নির্মাতা। তারা স্বল্প বাজেটে চলচ্চিত্রের নামে নাটক তৈরি করে দর্শকের মধ্যে বিরক্তির উৎপাদন ঘটাচ্ছে।
চলচ্চিত্র ও নাটক কিংবা বড় ও ছোট পর্দা যদি একই হতো তাহলে প্রেক্ষাগৃহের কোনো দরকার হতো না। চলচ্চিত্রের উপাদান ভিন্ন। নির্মাণে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সচেতন না হলে সত্যিকারের চলচ্চিত্রের অভাব থেকেই যাবে এবং মন্দা অবস্থা কাটানো যাবে না।
দেশে দ্রুত কমছে সিনেমা হলের সংখ্যা। নানা কারণে দেশীয় চলচ্চিত্রের দর্শক না থাকায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলগুলো।
বর্তমানে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্রের পরিবর্তে নাটক দেখতে হচ্ছে। এতে তারা হতাশা নিয়ে প্রেক্ষাগৃহবিমুখ হচ্ছে। ফলে চলচ্চিত্র ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।
তাই চলচ্চিত্রনির্মাতা দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। এককথায় চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রকৃত চলচ্চিত্রনির্মাতা প্রয়োজন।
এমকে





