সিরিয়ায় উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযান দ্রুত দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। যেখানে সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে আইএস’র মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হচ্ছিল সেখানে রুশ হামলা শুরুর পর এখন সর্বশেষ খবর হচ্ছে-আইএস’র বেশিরভাগ আস্তানা, বোমা তৈরির কারখানা, অস্ত্র ও গোলা বারুদ রাখার ডিপো, সাঁজোয়া যান, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং কমান্ড পোস্ট ধ্বংসের পাশাপাশি শত শত সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।

এছাড়া বহু আস্তানা ছেড়ে পালাচ্ছে সন্ত্রাসীরা; কোথাও কোথাও সন্ত্রাসী তৎপরতা অব্যাহত রাখতে মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেয়ার কৌশল নিচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রাশিয়া এমন কোন শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করছে যার কারণে তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে?

অনেকের মনেই এখন এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে-সন্ত্রাসীরা এতদিন বীরদর্পে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছিল তা কাজে লাগছে না কেন? এই শেষ প্রশ্নের সহজ জবাব হলো- সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে রাশিয়ার নিখুঁত বিমান হামলার কারণে সন্ত্রাসীদের এখন ত্রিশংকু অবস্থা। এবার নজর দেয়া যাক সিরিয়ায় রাশিয়া কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে তার দিকে।

সুখোই এসইউ-৩৪ জঙ্গিবিমান:

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রাশিয়া প্রধানত বিমান হামলা চালাচ্ছে। এ কাজে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অত্যাধুনিক সুখোই এসইউ-৩৪ জঙ্গিবিমান পাঠিয়েছেন সিরিয়ায়। এ বিমানকে ন্যাটো বাহিনী “ফুলব্যাক” বলে আখ্যায়িত করে। এ বিমান মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক বিমানের সমকক্ষ।

সুখোই এসইউ-৩০ জঙ্গিবিমান:

সিরিয়ার লাতাকিয়া বিমান ঘাঁটিতে রাশিয়া যে দুই ডজনের বেশি যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে তার মধ্যে চারটি রয়েছে সুখোই এসইউ-৩০ বিমান। এ ধরনের বিমান হচ্ছে রুশ বিমান বাহিনীতে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত জঙ্গিবিমানের একটি। সুখোই-৩০ জঙ্গিবিমান মার্কিন এফ-১৮ বিমানের সমপর্যায়ের এবং নিখুঁতভাবে বোমা হামলা চালাতে এদের জুড়ি নেই। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীকে ঘনিষ্ঠভাবে এয়ার সাপোর্টও দিয়ে থাকে।

সুখোই এসইউ-২৫ জঙ্গিবিমান:

রাশিয়া অবশ্য এক ডজন সুখোই এসইউ-২৫ ‘ফ্রগফুট’ জঙ্গিবিমানও মোতায়েন করেছে সিরিয়ায়। এ বিমান সাধারণত ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট মিশনে ব্যবহৃত হয়। এ বিমান খুব নিচু দিয়ে উড়ে যেতে পারে এবং স্থল লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারে। ক্ষমতার দিক দিয়ে এটি মার্কিন এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ বিমানের মতো। এ বিমান শত্রুর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও উড়তে পারে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এ বিমান রুশ ও সিরিয়ার বাহিনীকে অনেক বেশি স্বস্তি দিচ্ছে। ।বিমান সহায়তায় রুশ বাহিনী ও সিরিয়ার সেনারা ইদলিব ও আলেপ্পোর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। অথচ কিছুদিন আগেও এসব এলাকা বলা যায় একেবারেই আইএস সন্ত্রাসীদের দখলে ছিল।

সুখোই এসইউ-২৪ জঙ্গিবিমান:

রাশিয়া সামরিক অভিযানের জন্য সিরিয়ায় যেসব বিমান বেশি পাঠিয়েছে তার মধ্যে সুখোই এসইউ-২৪ জঙ্গিবিমান অন্যতম। জানা গেছে রুশ সরকার এক ডজন সুখোই এসইউ-২৪ জঙ্গিবিমান পাঠিয়েছে সিরিয়ায়। এ বিমান ‘ফেন্সার জেট’ হিসেবে খ্যাত এবং স্থল বাহিনীকে যোগ্য সমর্থন দিতে পারে। মার্কিন বাহিনী থেকে বিদায় নেয়া এফ-১১১ অ্যাডভার্ক বিমানের সমান এর কার্যক্ষমতা।

এমআই-২৪ হেলিকপ্টার:

সিরিয়ায় রুশ বাহিনী অন্তত ১৪টি সামরিক হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে যার মধ্যে এমআই-২৪ অ্যাটাক হেলিকপ্টারও রয়েছে। ন্যাটো বাহিনী একে ‘হিন্দ’ বলে ডাকে। গত ৪০ বছরে বিশ্বের প্রায় সব যুদ্ধে বিশাল আকারের এ গানশিপ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এমআই-১৭ হেলিকপ্টার:

সিরিয়ায় এমআই-১৭ হেলিকপ্টারও মোতায়েন করেছে রাশিয়া। এ হেলিকপ্টারকে ন্যাটো বাহিনী ‘হিপ’বলে ডাকে। দুই পাখা বিশিষ্ট এ হেলিকপ্টারে যদিও গানশিপ ভার্সন রয়েছে তবে এটি সাধারণত সেনা পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়।

এসএ-২২:

স্যাটেলাইট তথ্যচিত্রের ভিত্তিতে মার্কিন ফক্স নিউজ চ্যানেল খবর দিয়েছে যে, সিরিয়ার লাতাকিয়ার কাছে বাসেল আল-আসাদ বিমানঘাঁটিতে এসএ-২২ ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার দেখা গেছে। এ ধরনের লাঞ্চারে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা হয়। ন্যাটো বাহিনী একে ‘গ্রেহাউন্ড’ বা ‘ধূসর কুকুর’ বলে অ্যাখ্যায়িত করে থাকে।

গাইডেড মিসাইল ক্রুজার মস্কভা:

সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে ভূমধ্যসাগরে নেয়া হয়েছে মস্কভা নামে রুশ গাইডেড মিসাইল ক্রুজার। সিরিয়ার উপকূলে এটি অবস্থান নিয়েছে যা লাতাকিয়া বিমানবন্দর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এর আগে মস্কভা কৃষ্ণসাগরে মোতায়েন রুশ নৌবহরের আওতায় ছিল।

টি-৯০ ট্যাংক:

রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর কারণে সম্প্রতি আরো তিনটি টি-৯০ ট্যাংক নেয়া হয়েছে সিরিয়ায়। এ নিয়ে নয়টি টি-৯০ ট্যাংক মোতায়েন করা হলো সিরিয়ায়। বাহ্যত এসব ট্যাংক লাতাকিয়া বিমানবন্দরে মোতায়েন সেনাদের রক্ষার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। এ ট্যাংক মার্কিন এম-১ আব্রামস ট্যাংকের মতো শক্তিশালী।

ড্রোন:

সিরিয়ায় বিমান হামলা খুব বেশি কার্যকর করে তুলতে রুশ বাহিনী ড্রোনের সাহায্য নিচ্ছে। ড্রোন দিয়ে রুশ বাহিনী সহজেই গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে যাচ্ছে আর সে অনুযায়ী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিখুঁতভাবে বিমান হামলা চালাচ্ছে। যার কারণে রুশ হামলা তৃতীয় সপ্তাহে গড়ালেও আজ পর্যন্ত সিরিয়ায় বেসামরিক নাগরিক হত্যার খবর পাওয়া যায় নি। তবে রাশিয়া ঠিক কী ধরনের ড্রোন মোতায়েন করেছে তা জানা যায়নি। অবশ্য, মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন যে, মস্কো হয়ত প্রেডেটর ড্রোন মোতায়েন করেছে। তবে একজন রুশ ব্লগার ধারণা দিয়েছেন যে, ইয়াকভলেভ পিচেলা-ওয়ান টি মডেলের ড্রোন মোতায়েন করেছে রাশিয়া।

বিটিআর-৮২এ আরমর্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার:

সিরিয়ার সামরিক বাহিনীকে এ ধরনের অত্যাধুনিক সেনাবহনকারী গাড়ি দিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার সেনারাও এ ধরনের সামরিক যান ব্যবহার করছে।

গ্যায টাইগার জিপ:

সেনা বহনকারী বড় বড় যানের পাশাপাশি রাশিয়া বহু ছোট ছোট জিপ পাঠিয়েছে সিরিয়ায়। এ ধরনের জিপ সিরিয়া ও রাশিয়া -দু দেশের সেনারাই ব্যবহার করেছ।

এএন-১২৪ কার্গো বিমান:

রাশিয়ার এসব সামরিক সরঞ্জাম কীভাবে এত দ্রুত সিরিয়ায় পৌঁছালো? স্যাটেলাইট তথ্যচিত্রের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে-চারটি রুশ অ্যান্তোনভ এএন-১২৪ সামরিক পরিবহন বিমান লাতাকিয়া বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ন্যাটো এ বিমানকে ‘কনডোর’ বলে থাকে। কিছুদিন আগে মার্কিন সরকার রুশ বিমানের জন্য গ্রিসের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানানোর পর মস্কো এসব সামরিক সরঞ্জাম ইরান ও ইরাকের ওপর দিয়ে এএন-১২৪ সামরিক পরিবহন বিমানে করে সিরিয়ায় নিয়ে গেছে। এএন-১২৪ অ্যান্তোনভ বিমান হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক পরিবহন বিমান।

জার কুনিকভ:

ভূমধ্যসাগর দিয়ে রাশিয়া কোনো সামরিক সরঞ্জাম সিরিয়ায় নিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায় নি। তবে, রাশিয়ার একজন বিশ্লেষক বলেছেন, রুশ সেনারা জার কুনিকভ নামের ল্যান্ডিং শিপ নিয়ে গেছে সিরিয়ায়। তুরস্কের একজন ব্লগার বলেছেন, উভচর শ্রেণীর এ জাহাজ বসফরাস প্রণালী দিয়ে সিরিয়ার দিকে গেছে।

সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্র:

সিরিয়ায় তৎপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও বেশ উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছ মার্কিন ও ইসরাইলের তৈরি অস্ত্র। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে- এসব অস্ত্র আসছে সৌদি আরব ও মার্কিন মিত্র দেশগুলো থেকে।

তবে আমেরিকা বা সৌদি আরব প্রকাশ্যে এসব অস্ত্র দেয়ার কথা স্বীকার করে নি। এর মধ্যে রয়েছে ‘ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’। এ রকেট দিয়ে আগে সন্ত্রাসীরা সিরিয়ার জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করত। এখন তাদেরকে রুশ অত্যাধুনিক বিমানকে টার্গেট করতে হচ্ছে। রুশ সুখোই এসইউ-২৫ বিমান খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম রকেট দিয়ে এমন বিমান ভূপাতিত করা বেশ সহজ। তবে এখন পর্যন্ত সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের রকেটের আঘাত রুশ বিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা শোনা যায় নি।

সন্ত্রাসীরা এ রকেট দিয়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে বড় বেশি কাবু করে ফেলছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এ কারণে সন্ত্রাসীরা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল লড়াই করে যেসব অঞ্চল দখল করেছিল সেসব এলাকায় বিমান হামলার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে রাশিয়া। সিরিয়ার সন্ত্রাসীদেরকে যেসব আঞ্চলিক দেশ সমর্থন করছে তাদের মধ্যে অন্তত একটি দেশের কাছ থেকে ৫০০ রকেট পেয়েছে আইএস। এর প্রতিটি রকেটের দাম পড়ে ৬০,০০০ ডলার।

১৯৭০ সালে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ম্যান পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহৃত হয়। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি দেশে যুদ্ধের সময় এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।