বিএনপি জামায়াতের একই জোটভূক্ত হয়ে পথ চলা শুরু হয় ২০০০ সালে ৪ দলীয় ঐক্যজোট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ২০০১ সালের অক্টোবরে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট বিপুল ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠনের পর এই ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়।

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি এবং ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে পরবর্তী কয়েক দফায় ৪ দলীয় জোট সম্প্রসারন করে ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে। তবে ২০ দলীয় জোটে ভোট ও মাঠের হিসেবে বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

৫ জানুয়ারির ১০ম নির্বাচনের পরে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের অবনতির সংবাদ একাধিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায় তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়- জোটের নেতৃত্বে থাকা দল হিসেবে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে বিএনপির পক্ষ যতটুকু শক্তি প্রর্দশন করার কথা বিএনপি বরাবরই তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ রয়েছে-নিজ দলের নেতাদের বিচারের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় যতটা শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠে নামে জোটের কর্মসূচিতে ততটা সরব নয় জামায়াত।

এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সত্যতা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজপথের দুই শক্তিশালী রাজনৈতিক মিত্রের মধ্যে মনস্তাত্মিক দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় যে বেশ স্বস্তিতে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

সূত্র মতে, বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য বিবৃতিতে শরিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে জামায়াতের সাবেক আমীর ও ৪ দলীয় জোটের অন্যতম রূপকার অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর পর বিএনপির কেউ তার মরদেহ দেখতে যাননি এবং জানাযায়ও অংশ নেননি বিএনপির কোনো নেতা। তাছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ না করা ও জানাজায় অংশ না নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের কাছে নানা যুক্তি তুলে ধরা হলেও জামায়াত বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি।

এছাড়া জামায়াতের বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলী ও সহকারী সেক্রটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও বরাবরের মতোই নিশ্চুপ রয়েছে বিএনপি। বিএনপির এই নীরবতায় জামায়াতের তৃনমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

যার বিচ্ছিন্ন বহি:প্রকাশও ঘটে জামায়াত-শিবিরের তূণমুল নেতাদের আচরণে। নীলফামারীতে ২০ দলীয় জোটের জনসভায় জামায়াতের নেতাকর্মীর উপস্থিতিই তার প্রমাণ। যদিও অন্য যে কোনো সভা-সমাবেশ সফল করতে সর্ব শক্তি নিয়োগ করে জামায়াত। কিন্তু নীলফামারীর জনসভায় জামায়াতের গাছাড়া ভাব ছিল চোখে পড়ার মত। যদিও পরবর্তীতে নাটোর ও কিশোরগঞ্জের জনসভায় জামায়াত পূর্ণ জনশক্তি নিয়ে উপস্থিত ছিল।

সূত্র জানায়, এই সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে ১০ম জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে সরকারের সংলাপ প্রশ্নে জামায়াতকে পরিত্যাগের শর্ত দেয়ায় বিএনপি কৌশলে জামায়াতকে কিছুদিন এড়িয়ে চলতে থাকলে। পরবর্তীতে বিএনপি বুঝতে পারে এটি সরকারের ২০ দলীয় জোটের ভাঙ্গণ সৃষ্টির অপকৌশল। যার ফলে আগের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় বিএনপি।

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় নিয়ে বিএনপির মধ্যে দুটি পক্ষ বিরাজমান। একটি পক্ষ এই নিশ্চুপ অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক মনে করছে।

তবে অন্য একটি পক্ষের মত হল এই নীরবতায় সরকারের লাভ হচ্ছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল বার্তা গেলে তারা আগামী দিনে ২০ দলীয় জোটের সরকার বিরোধী আন্দোলন কর্মসূচিতে আগের মত সক্রিয় নাও থাকতে পারেন।

এই পক্ষটি আরও মনে করে, সরকার কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েই বসে থাকবে না। পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলটির সিনিয়র নেতাদের নামেও মামলার চূড়ান্ত রায় দেয়ার পথে হাঁটছে। আর এখন যদি শরিক জামায়াতের নেতাদের রায়ে নিশ্চুপ থাকে তখন জামায়াতও সেই পথ অনুসরণ করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচন কেন্দ্রীক জোট আদর্শিক নয়। তবে বর্তমানে দুটি দলই গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করছে। তাদের নিজস্ব কিছু এজেন্ডা আছে যেগুলোর জন্য তারা আলাদা কর্মসূচি পালন করে।আমরাও আমাদের নিজস্ব কর্মসূচি পালন করি। তবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য জামায়াত বিএনপি একসঙ্গে কাজ করবে দেশের মানুষ সেটিই প্রত্যাশা করে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে গঠিত জামায়াতের সঙ্গে জোট আছে এবং শেষ পর্যন্ত থাকবে। এ জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক জোট। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ জাতীয় স্বার্থে আমরা আন্দোলন করছি। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আদর্শের মিল নেই। কিন্তু রাজনৈতিক জোটে আমরা আছি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আহমদ আজম খান                                            টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত বিএনপির সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবনতির কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক নিয়ে নিয়ে ভূল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই। সম্প্রতি নাটোরে ‍ও কিশোরগঞ্জে বিশাল জনসভা হয়েছে। সেখানে জামায়াত শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন। দুরত্ব তৈরি হওয়ার মতো কিছু এখনো ঘটেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চলমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে সফল করতে ও জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্টার জন্য বিএনপি-জামায়াতের সুদৃঢ় ঐক্য ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। জাতি এটাই প্রত্যাশা করে জামায়াত-বিএনপি ‘ঐক্য’ অটুট থাকবে। এই ‘ঐক্যে’ ফাটল অপশক্তিকেই সাহায্য করবে। জনতার আন্দোলনে তা হবে বড় আঘাত। বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ নিশ্চয়ই সেটা উপলব্ধি করবেন।

এমএইচ, কেবি