ইজিবাইক ও রিকশাসহ ব্যাটারিচালিত বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আমদানীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার।এরইমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় “আমদানী নীতি ২০১৫-২০১৮” এর একটি খসড়া তৈরি করেছে।প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই এটি কার্যকার করা হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত যানবহান প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ নষ্ট করে এবং এগুলো সড়ক দুর্ঘটনারও কারণ।মূলত বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করতেই নতুন এই নীতিমালা করা হচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ঈদুল ফিতরের আগে এবং পরে মহাসড়কগুলোতে ব্যাপকহারে দুর্ঘটনা ঘটে। দেখা গেছে এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই হয়েছে অটোরিকশার সঙ্গে। এ কারণে অটোরিকশাকে মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছে সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন মহাসড়কে যত্রতত্র অটো চলাচল বন্ধ করতে পারলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে। সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার পরই মূলত নড়েচড়ে বসে সরকার।

গত ২২ জুলাই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে তদারক কমিটির পর্যালোচনা সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশার অবাধ চলাচল। এসব অটোরিকশা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাই জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ঈদের ছুটি চলাকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বেপরোয়া গাড়ি চালনাকে দায়ী করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে আগামী দুই মাসের মধ্যে চারটি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে গতি নিয়ন্ত্রক ও সড়ক বিভাজক স্থাপন করা হবে।

এদিকে সরকারের প্রস্তাবিত এই নতুন নীতিমালা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধ করা কখনই সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।কারণ, মানুষের সুযোগ-সুবিধার বাড়ানোর জন্যই গ্রাম-গঞ্জে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ।

তাছাড়া, মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ইজিবাইক ও অটোরিকশা বন্ধের চিন্তাও সঠিক নয়।কারণ, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ এসব যান চলাচল বন্ধ করলে ভোগান্তি আরো বাড়বে।

সরকারের প্রস্তাবিত আমদানী নীতিতে ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিষিদ্ধের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আমিনুল ইসলাম রাসেল বলেন, প্রস্তাবটা ঠিক আছে তবে, হঠাৎ করেই এই নীতি বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না।

কারণ, মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার জন্য ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে দায়ী করা হলেও এগুলো বন্ধে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়বে।বরং পরিবেশবান্ধব এ ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য মহাসড়কের পাশাপাশি আলাদা রাস্তা তৈরি করে দিলেই এর সমাধান সম্ভব।

হেলাল নামে আরেকজন বলেন, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে অনেক বেশি।কারণ, এসব ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত ইজিবাইক ও রিকশাসহ ব্যাটারি চালিত বিভিন্ন ধরণের যানবাহন ব্যবহার করে।

তাছাড়াও সামান্য কিছু দূরে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় যাত্রীবাহী বাসগুলো যখন মহাসড়কে যত্রতত্র টপিজ দেয়া শুরু করবে তখন দূরপাল্লার পরিবহণের যাতায়াতে সমস্যা সৃষ্টি করবে এবং দুর্ঘটনার পরিমাণ আরো বাড়বে।

আবার জরুরি প্রয়োজনের সময়ও মানুষকে বাসের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়।এবং অনেক সময়ই দেখা যায় সিট বুক না হওয়া পর্যন্ত বাসগুলো স্টেশন ছাড়ে না।যা অনেকের জন্যই ভোগান্তি বয়ে আনে।

অটোরিকশা চালক শাজাহান আলী প্রস্তাবিত এই নীতির প্রতিবাদ করে বলেন, “৫৫ বছর ছাড়িয়েছে আমার বয়স।এ অবস্থায় একটা রিকশায় দু’জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করাটা আমার জন্য কঠিন।তবে, মটরওয়ালা রিকশা হওয়ায় সংসারটা টেনেটুনে চালাতে পারছি।সরকার যদি এটা নিষিদ্ধ করে তাহলে আমার খাওয়া-পরার খরচ যোগাবে কে?”।

নতুন এই আমদানী নীতিমালার খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, গুণগত মান, পরিবেশবান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে ৭৫ ডেসিবলের ওপরে হর্ণ আমদানী নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই নীতিমালায়।

খাদ্য নিরাপদ করতে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ও কীটনাশকের আমদানি নিষিদ্ধ করে একটি প্রস্তবনা তৈরি করা হয়েছে।অন্যদিকে পোল্ট্রি ফিড, মাছের খাবার এবং গবাদিপশুর জন্য পশুখাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদন ও মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মাছের খাবার এবং প্রোটিন কনসেনট্রেট আমদানীর ক্ষেত্রে রপ্তানিকারী দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে উপজাত ক্রোমিয়াম ও ট্যানারিসহ ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্তের সার্টিফিকেট সরবরাহ করতে হবে।

প্রস্তাবিত নীতিমালার খসড়ায় এর প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে- আমদানী প্রক্রিয়াকে ব্যবসাবান্ধব ও উপযোগী করা এবং বিশ্বায়নের পদক্ষেপ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা।এছাড়াও আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানী সহজ করাও এই নীতির উদ্দেশ্য।

নতুন এই নীতিমালায় আমদানী পণ্যের তালিকায় সফটওয়্যারকে সংযুক্ত করা হয়েছে।সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট ট্রেড বডির সুপারিশ নিয়ে সফটওয়্যার আমদানী করতে হবে।

পাশাপাশি, ঋণপত্র (এলসি) না খুলেই নিজস্ব একটি কারখানায় ব্যবহারের জন্য অনির্ধারিত পরিমাণ কাচামাল অথবা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানী করা যাবে বলেও এই নীতিমালায় বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমলা অনুসারে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে সর্বোচ্চ দুই লাখ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানী করা যাবে।যেখানে প্রচলিত নীতিতে সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার অনুমোদন দেয়া আছে।

আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সর্বোচ্চ তিন লাখ ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানী করা যাবে।যেটা আগে ছিল মাত্র দু’লাখ ডলার।

“আমদানী নীতি ২০১৫-২০১৮” কার্যকর হলে বিদেশী কোন ফিল্ম আমদানির জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে।যেটা বর্তমানে প্রচলিত নীতিমালায় উল্লেখ নেই।

এআর/ কেএইচ