পারিবারিক কলহের জের ধরে সংঘাত-সংঘর্ষ এমনকি নৃশংস হত্যার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের গত ৪ মাসে কুষ্টিয়ায় জেলায় শুধু খুন হয়েছে প্রায় ১০জন। এর বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে যৌতুক, পরকীয়া, দাম্পত্য সমস্যা, পারিবারিক কলহ, জমিজমা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে। নৃশংসতার শিকার হচ্ছে শিশুরাও।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পরিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণে জীবনে বাড়ছে হতাশা, মানসিক বিষণ্ণতা, আর্থিক দৈন্য। ফলে সমাজে বেড়ে চলেছে অপরাধও।
সুত্র মতে, চলতি বছরের গত ৪ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিখোঁজের ৬ দিন পর মারফত আলী (২৫) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের মধুগাড়ী গ্রাম সংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে থেকে লাশ উদ্ধার করে। সে মধুগাড়ী গ্রামের হযরত আলীর ছেলে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার মিরপুরে শেফালী খাতুন (২৫) নামের এক গৃহবধুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত শেফালী উপজেলার আমলা ইউনিয়নের কুশাবাড়ীয়া গ্রামের বুদোর স্ত্রী। গত ২১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তহুরা খাতুন (৩০) নামে এক গৃহবধুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। উপজেলার রিফায়েতপুর ইউনিয়নের শিতলাই পাড়া হিন্দিগাড়ি মাঠ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত গৃহবধু শিতলাই পাড়া গ্রামের হাসেম আলীর স্ত্রী।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় কাশেম আলী ওরফে বোম্বে কাশেম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। সদর উপজেলার ভাদালিয়া এসজিএস হ্যাচীর সংলগ্ন ক্যানেল থেকে তার হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ২ মার্চ কুষ্টিয়ায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে ইমরান নাজির (১৬) নামের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী খুন হয়। ইমরান জগতির রমজান খান হিটুর ছেলে। শহরতলীর জগতি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ঘটনা ঘটে।
গত ১৭ মার্চ কুষ্টিয়ার খোকসায় আজ্ঞাত এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উপজেলার ধোকড়াকোল মকলুর চর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। গত ১৯ মার্চ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রঞ্জু হোসেন (৩০) নামে এক তাঁত শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার বাটিকামারা রেলগেট এলাকায় রঞ্জুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া শহরের চরকুঠি পাড়ায় হুসাইন (৭) নামে এক এতিম শিশুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গড়াই নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত হুসাইন চরকুঠি পাড়ার মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। গত ১৫ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মৌসুমী খাতুন (২৪) নামে এক গৃহবধূকে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ হাসপাতালে ফেলে রেখে যায় তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন। সে উপজেলার তারাগুনিয়া কাচারীপাড়া গ্রামের নুরুজ্জামানের স্ত্রী।
গত ১৮ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রে আঘাতে উজ্জল হোসেন (৩০) নামের এক যুবক নিহত হয়। শহরের কালিশংকরপুরে এ ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। নিহত উজ্জল হোসেন সদর উপজেলার কালিশংকপুরের আজিজুল হকের ছেলে।
নুরুজ্জামান বিশ্বাস ডিগ্রী কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, মানবিক মূল্যবোধ কমে গেছে। বাড়িতে, রাস্তায় কোথাও মূল্যবোধ চর্চার সুযোগ নেই। মানুষ ক্রোধ সংযম করতে পারে না। এ কারণে পারিবারিক খুনের ঘটনা বাড়ছে।
সুলতানপুর মাদরাসার অধ্যাপক নারগিস আক্তার বলেন, দিন দিন আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আধুনিকতার দিকে যাচ্ছে। সম্পর্ক জটিল হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক ঐতিহ্য পরিবার থেকে সরে যাচ্ছে। নতুন নতুন বিষয় যোগ হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস কমছে। বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা। এসবসহ বেশ কিছু কারণে পারিবারিক খুনের ঘটনা ঘটছে। এ অবক্ষয় রোধ করতে পারিবারিক বন্ধন বাড়াতে হবে।
মনোবিজ্ঞানী ডা. সাদ্দাম হোসেন জুয়েল বলেন, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ। পরিবারে একে অপরের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় বাবা-মা মাদক সেবন করে ঘরে এসে ঝগড়া করছেন। এতে সন্তানদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। এসব কারণে পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে।
এআর





