ইরাক ও সিরিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশ নিয়ে নিজেদের স্টাইলে কথিত খেলাফত কায়েম করেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইএস। কিছুতেই যেন থামানো-দমানো যাচ্ছে না এ গোষ্ঠীকে।

প্রায় এক বছর ধরে এদের বিরুদ্ধে ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোটের বিমান হামলা চলছে। কিন্তু এ গোষ্ঠী নির্মূলের কোনো নামগন্ধ নেই। অনেকেই এ হামলাকে ‘লোকদেখানো’ বলে মনে করছেন।

তারপরও আইএস-বিরোধী জোট বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে আমেরিকা। এ প্রেক্ষাপটে আইএস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কথিত আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ওবামা প্রশাসন। মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস গত মাসে এ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

পাকিস্তানের কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি এ আমন্ত্রণ জানান। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সুসান রাইস পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এ জোটে যোগ দেবে কিনা সে বিষয়ে এরইমধ্যে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তান। বিষয়টি নিয়ে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে ইসলামাবাদকে।

এই স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে পাকিস্তান। সরাসরি অসম্মতি করতে পারে নি দেশটি, আবার উগ্রবাদী এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগও দিতে পারবে বলে মনে হয় না।

জাতিসংঘের ৭০তম বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য নওয়াজ শরীফ গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। এ সফরের সময় হয়ত তাকে জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।

এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে নওয়াজ অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়েই আমেরিকা গেছেন। এপ্রসঙ্গে পাকিস্তান সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, “আমেরিকার দাবি ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের মাঝে আটকে গেছে পাকিস্তান।”

পাক প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের অবস্থান:

প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ এক কাতারে অবস্থান নিয়েছেন এবং তারা আইএসআইএল-বিরোধী কথিত আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে চান না বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের ওই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, পাকিস্তান এ জোটে যোগ দেবে বলে মনে করছে আমেরিকা এবং শিগগিরি নতুন জোটের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে।

অন্যদিকে, পাকিস্তান মনে করছে- অভ্যন্তরীণ উগ্র তালেবান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইসলামাবাদ হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় সিরিয়া ও ইরাকে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না। তাতে ঝুঁকির মুখে পড়বে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ।

এরইমধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ বলেছেন, সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী বার বার অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও তিনি ভারতের সেনাদের এসব প্রচেষ্টাকে তিনি ব্যর্থ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভারত সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে বৃহস্পতিবার একটি ঘাঁটি পরিদর্শণের সময় এ কথা বলেছেন জেনারেল রাহিল।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের সেনারা দুটি ভিন্নধর্মী যুদ্ধ মোকাবেলা করছে। এই দুটি ভিন্নধর্মী যুদ্ধ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন- সীমান্তে ভারতের অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের জবাব এবং অভ্যন্তরীণভাবে তালেবানসহ বিভিন্ন উগ্রগোষ্ঠীকে মোকাবেলা করা।

ভারত সীমান্তে পাকিস্তানের লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ উগ্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দাবি যথেষ্ট ন্যায্য। কিন্তু আমেরিকা কী তা কানে নেবে- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পাকিস্তান মনে করছে- তালেবান ও আল-কায়েদাবিরোধী লড়াইয়ের জন্য আমেরিকা যে বার্ষিক তহবিল দিচ্ছে তা স্থগিত করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ইসলামাবাদকে আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে বাধ্য করাতে চাইছে।

এখানে চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হলো সন্ত্রাবাদবিরোধী লড়াইয়ের তহবিল। অনেকটা জুজুর ভয় দেখনোর মতো। নওয়াজের নিউ ইয়র্ক সফরের সময় এ ইস্যুটি নিশ্চিতভাবে বড় হয়ে দেখা দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এছাড়া, অক্টোবর মাসে পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যে যে কৌশলগত সংলাপ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে সেখানেও তা উঠবে বলে জোরালোভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন অনীহা পাকিস্তানের ?

আইএস-বিরোধী জোটে যোগ দেয়া নিয়ে সত্যিই পাকিস্তান উভয় সংকটে পড়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে- ২০০১ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর আমেরিকায় কথিত সন্ত্রাসী হামলার নাম করে তৎকালীন বুশ প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ডাক দেন। এর অংশ হিসেবে আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা চালায়।

সে সময় আন্তর্জাতিক জোট হয়েছিল এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মুশাররফ বিনা বাক্য ব্যয়ে মার্কিন জোটে যোগ দেন। তারপর থেকে জ্বলছে পাকিস্তান। শুধু পাকিস্তানই জ্বলছে না বরং বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্রই পাল্টে গেছে।

এ মুহূর্তে পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে একসঙ্গে সীমান্তে ভারতকে এবং অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদ মোকাবেলা করছে। সে ক্ষেত্রে আইএস-বিরোধী জোটে যোগ দিলে মুসিবত বেশি হতে পারে সে আশংকা রয়েছে।

এছাড়া, আইএস সন্ত্রাসীদের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য মদদ রয়েছে। সেসব দেশের সঙ্গে আবার পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো। পাকিস্তানের জন্য এ দিকটি বেশ সংবেদনশীল।  

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক:

ইতিহাসের পরিক্রমায় সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে অনেকটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের। এরইমধ্যে দু দেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং রাশিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম কিনছে ইসলামাবাদ। সেই রাশিয়ার সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে। সেখানে রাশিয়া ও আমেরিকার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।

এছাড়া, আফগানিস্তানে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর জন্য সব রকমের সরবরাহ সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া। এখন পাকিস্তানকে জোটে টেনে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে আমেরিকা।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান হচ্ছে পরমাণু শক্তিধর দেশ। তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে আমেরিকা। তবে এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথাও ভাবতে বাধ্য হচ্ছে পাকিস্তান।

আমেরিকার কাছ থেকে নানা বঞ্চনার পর মূলত পাকিস্তান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। সেই সম্পর্ক ভাঙার একটা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে আমেরিকা।

এছাড়া, চীনের সঙ্গেও রয়েছে পাকিস্তানের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এসব কারণে মার্কিন প্রস্তাব পাকিস্তানের জন্য খুবই বিব্রতকর।

আবার প্রতিবেশি ইরানও আইএস-বিরোধী লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দেশ। তার অবস্থানও সঙ্গত কারণেই আমেরিকার বিপরীতে। মার্কিন জোটে যোগ দিলে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কে খারাপ হতে পারে -সে কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে পাকিস্তানকে।

অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় পাকিস্তান যখন অনেকটা সফলতার দ্বার প্রান্তে তখন ইসলামাবাদকে আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

এখানে এ কথা ধরে নেয়া খুব অসঙ্গত হবে না যে, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তান যাতে পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে না পারে সে জন্য এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় নিতে চায় আমেরিকা। এছাড়া, অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়- পাকিস্তানকে জোটে নিয়ে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে নতুন ফাটল ধরাতেও চায় মার্কিন সরকার।

সিরিয়ায় আইএস’র বিরুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ বিমান হামলার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করছে। এরপর এককভাবেই অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

সিরিয়ার অভ্যন্তরে রাশিয়া সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘসময়ের মিত্র দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি সমর্থনের ধারাবাহিকতায় সিরীয় সেনাবাহিনীকে আরো অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করছে রাশিয়া।

ক্রেমলিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে ব্লুমবার্গ টেলিভিশনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা ও তার মিত্ররা রাশিয়া, ইরান এবং সিরীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আইএস বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্মত হবে এমনটাই পছন্দ পুতিনের।

কিন্তু একটি সূত্র ব্লুমবার্গকে জানিয়েছে, মার্কিন যথাযথ সাড়া না পাওয়ায় হতাশ পুতিন প্রয়োজনে এককভাবেই সিরিয়ায় অভিযান চালানোর ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এ নিয়ে দুই শক্তির মধ্যে একটা প্রকাশ্য উত্তেজনা চলছে। এখানে বলে রাখা ভালো- সিরিয়া ও ইরাকে আইএস সন্ত্রাসীদেরকে মদদ দিচ্ছে আমেরিকা। আবার আইওয়াশ করার জন্য কথিত আন্তর্জাতিক জোট রয়েছে। এখন সে জোটকে আরো বাড়তে চায় যা কিনা ?

স্রেফ ক্ষমতার দাপট দেখানো ছাড়া প্রকৃত লড়াই নয়। তা না হলে এক বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন বিমান হামলার পরও কিভাবে আইএস দিন দিন শক্তিশালী হয়?

সামরিক সহযোগিতা দিয়ে রাশিয়া আসাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিও এক ধরনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। এই অবস্থায় পাকিস্তানের মতো মিত্র দেশকে মার্কিন সামরিক জোটে ভিড়িয়ে রাশিয়াকে এক হাত নিতে চায় আমেরিকা। চীনকেও আলাদা বার্তা দিতে চায়।

তবে আমেরিকার দাবার গুটি হবে কিনা পাকিস্তান সেটা বড় প্রশ্ন। এসব কারণে ভারতের সঙ্গে সীমান্তে দ্বন্দ্ব এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার কথাই বলছে পাকিস্তান। এ ইস্যু দুটি বড় করে পাকিস্তান আমেরিকাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে, দুই ফ্রন্টে আটকে আছে তারা।

এখান থেকে পিছিয়ে গেলে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে দীর্ঘ দিনের অর্জন নস্যাৎ হবে। কিন্তু আমেরিকা পাকিস্তানের বক্তব্য গ্রহণ করবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সে কারণে আইএস এবং পাক-চীন-ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্কের কারণে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক পরিমণ্ডলে বড় কোন পরিবর্তনও আসতে পারে। এমনটি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।

এসএইচ