হাজারো বাঁধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই বাড়ছে কানাডায় মুসলমানের সংখ্যা। ধর্মীয়ভাবে একঘরে হওয়ার ঝুঁকি, পরিবারের দ্বারা প্রত্যাখ্যান ও মসজিদভিত্তিক গোষ্ঠীর অনাগ্রহের মধ্যেও ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন সেখানকার মানুষ। এমনকি তারা মুসলিম ধর্ম গ্রহণের পরও নিজেদের কানাডীয় বলে পরিচয় দিতেও কার্পণ্যবোধ করেন না। স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই তারা নিজেদেরকে একইসাথে মুসলমান ও কানাডিয়ান বলে দাবি করেন। এমন তথ্যই বেরিয়ে এসেছে কানাডার নতুন যুগান্তকারী একটি গবেষণায়।
অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ড. স্কট ফ্লাওয়ার বলেন, ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা সাধারণত মসজিদ সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ, তারা ভিন্ন নৃতাত্বিক গোষ্ঠি থেকে আসেন। তিনি বলেন, দায়িত্বের বশবর্তী হয়ে প্রথম দিকে মসজিদগুলো ধর্মান্তরিত করতে উষ্ণ এবং স্বাগতপূর্ণ হয়ে থাকে। তবে এ অবস্থা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।
কানাডার অটোয়ায় ছুটি চলাকালে ধর্মান্তরিতকরণ বিষয়ে একটি কর্মশালায় অস্ট্রেলিয়ান ওই গবেষক আরো বলেন, বেশিরভাগ মসজিদ পাকিস্তানী, তুর্কি, সৌদি বা যাই হোক না কেন ধর্মান্তরিতরা ওই সম্প্রদায়ের মধ্যে গৃহীত হচ্ছে না। সুতরাং তারা বহিরাগত। যদি তারা মসজিদ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত না হয় এবং তাদের পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তারা সব দিক দিয়েই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
স্কট ফ্লাওয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক। যিনি ইসলামে ধর্মান্তর বিষয়ে কানাডিয়ায় পরিচালিত প্রথম গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনিতেও একই ধরনের গবেষণা পরিচালনা করেছেন ফ্লাওয়ার।
সারাদেশে ধর্মান্তরিতদের অংশগ্রহণে ৭০টি প্রশ্ন বিশিষ্ট জরিপ এবং ইমামদের পৃথক সাক্ষাতকার সমন্বিত গবেষণার জন্য পাবলিক সেফটি কানাডা থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার অনুদান নিয়ে তহবিল গঠন করা হয়।
তবে আগামী বছরের প্রথম দিকে যখন এই গবেষণা সম্পূর্ণ হবে এবং বিশ্লেষণ করা হবে তখন এ থেকে পাবলিক সেফটি কর্মকর্তারা কি প্রত্যাশা করেন সে বিষয়ে তারা স্কট ফ্লাওয়ারকে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
ফ্লাওয়ার বলেন, কানাডায় মুসলিম ধর্মান্তরিতদের বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। কারণ, এখনও বিষয়টি নিয়ে এ দেশে কোন একাডেমিক জার্নালে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়নি। ধর্মান্তরের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য তারা কোন সাধারণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
স্কট বলেন, আমি আনন্দিত। কারণ, তাদের জগতে তারা শ্রেণীবদ্ধ তথ্য নামক এক তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সব কিছু মূল্যায়ন করে থাকেন। এটা অনেক বেশি বিস্তৃত এবং জটিল। ধর্মান্তরিতদের ৯৯ দশমিক ৯ ভাগ কখনোই চরমপন্থী হয় না, এমনকি রাজনৈতিকও নয়। তারা শুধু তাদের ধর্ম চর্চা করেন। যদি আপনি তাদের মাঝে চরমপন্থা খুজতে চান তাহলে তাদের অধিকাংশই যে ন্যূনতম চরমপন্থীও নয় সেটাও আপনাকে বুঝতে হবে।
ফ্লাওয়ার অবশ্য এ কথাও স্বীকার করেন যে, ‘৯/১১ পরবর্তী পরিবেশে’ কানাডিয়ান মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট সন্দেহ প্রবণতার কারণেএ বিষয়ে গৃহিত যে কোন গবেষণার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।

ইসলামে ধর্মান্তর একটি ক্রমবর্ধমান ঘটনা হিসেবে যখন সর্ব সাধারণের কাছে স্বীকৃত, তখন ফ্লাওয়ার বলছেন, ইমামদের কাছ থেকে সহযোগিতার অভাবে তিনি এবং তার গবেষকরা এ পর্যন্ত আসতে বার বার হোচট খেয়েছেন। তবে, স্কটের মতে, কানাডিয়ানদের ধর্মান্তরিত হওয়া বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়ে এক কথায় কোন সোজাসাপ্টা জবাব দেয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি সবসময়ই বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক স্কট বলেন, আমরা বলতে পারি না যে, এটা শিক্ষার অভাব। কারণ, আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা অধ্যাপক, মাস্টার্স ডিগ্রিধারীঅথবা গ্রেড ১২ শিক্ষাপ্রাপ্ত। বিষয়টি অর্থনৈতিকও নয়, এর সাথে অন্যকিছু জড়িত। আমাদের নমুনায় অনেক মানুষ আছেন যারা অবিশ্বাস্য ভাবে ধনী অথচ ধর্মান্তরিত। আবার ধর্মান্তরিত অনেকেই আছেন যারা কোন ধরনের ঝামেলায় পড়ে এই সিদ্ধান্ত নেননি; বরং তারা একটি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করা অবস্থাতেই ঠাণ্ডা মাথায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ফ্লাওয়ার বলেন, তার গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য ইসলামকে বোঝা এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ৬ থেকে ১২ মাস বা এক বছর সময় লেগে যায়। সুতরাং এটা না স্বতস্ফূর্ত, না অপরিণামদর্শী। অধিকাংশ মুসলিম ধর্মান্তর সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এটা একটা বড় প্রতিশ্রুতি।
ইসলামে ধর্মান্তর মূলত আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে আল্লাহর রসূল বলে স্বীকৃতি দেয়াকে বুঝায়।
এদিকে, ২০১৩ সালের ৮ মে প্রকাশিত জাতীয়ভিত্তিক পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কানাডিয়ান কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস-এর নির্বাহী পরিচালক ইহসান গার্দি বলেন, জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাওয়া মুসলমানরা কানাডার মূল অধিবাসীদের তুলনায় বেশি হারে নিজেদের কানাডীয় বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। তারা কানাডীয়দের সঙ্গে মিশে গিয়ে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকতে চান।
ওই গবেষণা জরিপে দেখা যায়গত এক দশকে কানাডায় মুসলিম জনসংখ্যা ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১ সালে দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৯ হাজার। ২০১১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১০ লাখের উর্ধ্বে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে কানাডার মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ২ শতাংশ হচ্ছে মুসলমান। অথচ ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ ছিল মুসলিম।
টরন্টো বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্রপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম এবং সম্প্রতি শহুরে নিরাপত্তা ওপর ইকোনোমিস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বসবাসের উপযোগী সবচেয়ে ভাল জায়গাগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।
টরেন্টোতে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলমান বাস করে। এখানে তাদের সংখ্যা হচ্ছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৯শ এবং মন্ট্রিলে ২ লাখ ২১ হাজার ও ভ্যাংকুবারে ৭৩ হাজার ২শ। এছাড়াও মন্ট্রিল ও ভ্যাংকুভারেও বেশি সংখ্যক মুসলমানের বসবাস।
২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমান কানাডায় এসেছেন। সর্বাধিক সংখ্যক মুসলমান এসেছেনপকিস্তান থেকে। জরিপে দেখা গেছে, কানাডার দুই তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ খৃষ্টধর্মের অনুসারী। তারা হচ্ছেনমোট জনসংখ্যার ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
খৃস্টান ছাড়াও এখানে মুসলিম, হিন্দু, শিখ ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। এই কয়টি ধর্মের অনুসারীরা বর্তমানে কানাডার মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ এক দশক আগে ২০০১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী তাদের গড় হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্ব জনসংখ্যার উপর পরিচারিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী ২০ বছরে কানাডার মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে তিনগুণ হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ কানাডায় মুসলমান জনসংখ্যা হবে ২.৭ মিলিয়ন। যা কানাডার মোট জনসংখ্যার ৬.৬ শতাংশে দাঁড়াবে।
সমীক্ষার তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনসংখ্যার পরিমাণ ৩৫ শতাংশ হারে বেড়ে ২.২বিলিয়ন হবে। অমুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় বৃদ্ধির এই হার দ্বিগুণ।
এ দিকে এই সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবার পর এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কানাডার মুসলমানদের একটি সংগঠন আশংকা প্রকাশ করেছে, মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই চিত্রটি কানাডার ‘খ্রীস্ট ধর্মালম্বীদের’ উদ্বেগের মধ্যে ফেলতে পারে।
এআর/ কেবি





