মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর রায় নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে শহীদদের পরিবারসহ দেশবাসীর মধ্যে। রায় কবে হবে, নাকি হবে না, নাকি সরকার জামায়াতের সাথে আতাঁত করছে এসব বিষয় নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু করেছে বিচার প্রত্যাশীরা। চার দফা রায় অপেক্ষমাণ রাখার পর এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াত বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই সরকার এই রায় দিতে গড়িমসি করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, সরকারের শীর্ষ মহলেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে কোনো কোনো মহল এমন অভিমত দিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজামীর রায় দেয়া হলে জামায়াত বড় ধরনের কোন সহিংসতা ঘটাতে পারবে না। তাদের মতে, জামায়াত হরতাল, অবরোধ ও ভাংচুরসহ যেকোন ধরণের বিঘ্ন সৃষ্টি করলে সরকার তা কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম।
গত ২৪ জুন, ২০১৪ অর্থাৎ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের আগের দিন যদি নিজামীর মামলার রায় ঘোষণা করা হতো তাহলে দেশে হরতাল, ধর্মঘট, ভাংচুরসহ অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতো।
সে সময় সরকারের শীর্ষ মহলের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মাওলানা নিজামীর রায় ঘোষণা করা হলে এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। এ অবস্থায় ভারত সরকার এমন ধারণাও করতে পারে যে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে কোন জনগণ নেই।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এসব ঝামেলা এড়াতেই কৌশলে নিজামীর রায় পিছিয়েছে।
জানা গেছে, গত ৩ জুলাই নিজামীকে হাসপাতাল থেকে কারা সেলে পাঠানো হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি বিষয়ক প্রতিবেদন সেদিনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। এর পর থেকেই তিনি সুস্থ আাছেন বলে কারা সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মাওলানা নিজামীর সুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্র্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী টাইমনিউজবিডি'কে জানান,নিজামী সাহেব সুস্থ আছেন। রায় ঘোষণার দিন সকালে তার উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং স্বাভাবিক হয়। এখন তিনি ঢাকা কারাগারে নেই। সুস্থ হওয়ার পরেই তাকে গত ৩ জুলাই কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
কাশিমপুর কারাগার সূত্রও বলছে,তিনি বেশ সুস্থ আছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তার প্রেসার, ডায়াবেটিসসহ সব পরীক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্টগুলো থেকে জানা গেছে, তার সব কিছুই ঠিক আছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী টাইমনিউজবিডি'কে জানান, 'নিজামীর রায় আদালত যখন চাইবে তখন দিতে পারে। এখন তো আর আদালত বন্ধ নাই, তাছাড়া নিজামী সাহেব সুস্থ্য আছেন। আশা করছি দ্রুত নিজামীর রায় হবে।'
মাওলানা নিজামীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম জানান, 'রায় দেয়ার ক্ষেত্রে কোন আইনী বাধা নেই। আদালত যখন চাইবে তখন দিতে পারে। তবে সময় ক্ষেপণের ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।'
এ বিষয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন,' গোটা জাতীর প্রশ্ন,৩০ লাখ শহীদ পরিবারের প্রশ্ন,৪২ বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করছি মানবতা বিরোধীদের বিচারের জন্য।"
তিনি আরও বলেন,'নিজামীর রায়ের সঙ্গে আরও ঝুলে রয়েছে আপিল বিভাগে সাঈদীর রায়। আর দশটা আপিল মামলার মতো করে বোধহয় সাঈদীর মামলা দেখা ঠিক হবে না। আমাদের বোঝা উচিত সাঈদী কিংবা নিজামীর মামলা আর দশটা সাধারণ খুন,লুণ্ঠন,ডাকাতির মতো নয়। তাদের অপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধ। তাদের অপরাধের ব্যাপকতা,নৃশংসতা,ভয়াবহতা অন্যান্য আর দশটা মামলার মতো নয়।'
এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের সংগঠক ইমরান এইচ সরকার বলেন, মানবতাবিরোধীঅপরাধে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিচারের রায় নাহওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে।
এরায় এতদিন দেরি করারপেছনে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সরকারের কোনো সমঝোতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবেবলেও অভিমত ব্যক্ত করেন ইমরান।
আওয়ামী ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো: আবুল হাসানজানান, দেশের ওলামা সমাজ '৭১ এর ঘাকতদের বিচার নিয়ে সময়ক্ষেপণ চায় না। তারা এ বিচার দ্রুত কার্যকর দেখতে চায়।
গত ২৬ জুন বৃহস্পতিবার বিকালে মতিউররহমান নিজামীর স্বাস্থ্যগত রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।সেদিন সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী জানিয়েছিলেন নিজামীর শারীরিক অবস্থার‘কিছুটা উন্নতি’ হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ জুন নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওদিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি।
ওইদিন কারা কর্তৃপক্ষের লোকজন সকাল ১০টার পর ট্রাইব্যুনালে আসেন চিঠি নিয়ে। কারা কর্তৃপক্ষের পাঠানো সেই চিঠিতে জানানো হয়,মতিউর রহমান নিজামী অসুস্থ হওয়ায় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা যাচ্ছে না। নিজামীর অনুপস্থিতিতে রায় হবে কী না এ নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যে বেলা ১১টায় ট্রাইব্যুনাল বসে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি, মেডিকেল রিপোর্ট চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের কাছে পড়ার জন্যহস্তান্তর করেন।
এরপর তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা মতামত দিন এ চিঠির বিষয়ে। আসামির অনুপস্থিতিতে রায় দেয়া কি ঠিক হবে?এ সময় মোহাম্মদ আলী রুল ৪৩ ‘এ’,‘বি’ পড়ে শোনান।
তখন চেয়ারম্যান ইনায়েতুর রহিম বলেন,রুল ৪৩-এ বলা আছে আসামি যদি পলাতক থাকে,আদালতে আসতে অস্বীকার করে অথবা দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ থাকে তাহলে তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চালানো যায়। কিন্তু চিঠিতে কি বলা আছে যে,আসামি আসতে অস্বীকার করেছেন? বা তিনি তো দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থও না। হঠাৎ অসুস্থ হলেন। তাহলে এ ধারা কেন পড়ে শোনালেন আপনি? এটা তো এখানে প্রযোজ্য নয়। এরপর মোহাম্মদ আলী রুল ৪৬ পড়ে শুনিয়ে বলেন, আদালত তার সহজাত ক্ষমতাবলে রায় ঘোষণা করতে পারেন।
তখন ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন করেন দেশে প্রচলিত নিয়ম কী? আসামির উপস্থিতিতে রায় হয় না অনুপস্থিতিতে? তখন গোলাম আরিফ টিপু ও মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রচলিত বিচারিক আদালতে আসামির উপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হয়।
এরপর নিজামীর পক্ষের আইনজীবীদের মতামত জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন,যেখানে কোনো বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ আছে সেখানে আদালত তার সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। রুল ৪৩-এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে আসামির উপস্থিতিতে বিচার চলবে এবং কোন ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতিতে বিচার চলবে তাও স্পষ্ট। কাজেই তার অনুপস্থিতিতে রায় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত বিচারে রায় ঘোষণা করাও বিচার প্রক্রিয়ারই অংশ।
উভয় পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি শেষে আদালত বলেন,আসামির অনুপস্থিতিতে রায় দেয়া যুক্তিযুক্ত মনে করছি না আমরা। নিজামীর শারীরিক অবস্থারবিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চাচ্ছি জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। এরপর আমরা আবার রায় ঘোষণার বিষয়ে জানিয়ে দেবো। তত দিন তার রায় অপেক্ষমাণ রাখা হলো।
ঢাকা, কেএ, ৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর, জেএ





