বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা শেষ হতে চলছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্বের ফুটবলীয় চূড়ান্ত সময়ের খুব কাছাকাছি। বাড়ি, গাড়ি থেকে শুরু করে মানুষ তার শরীর পর্যন্ত ঢেকে ফেলা প্রিয় দলের পতাকায় এবার বিদায় নেওয়ার পালা। সারা বিশ্বই ফাইনালের স্নায়ুস্পর্শী উত্তেজনা আর অপেক্ষা-আগ্রহে কাঁপছে। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে ২০১০ পর্যন্ত ১৯টি বিশ্বকাপের প্রতিটিই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে উন্মাদনা।

বলতে দ্বিধা নেই বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। গত শতকের তৃতীয় দশকেই জনপ্রিয় বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরটি প্রথমবারের মতো বসে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে। প্রতি ৪ বছর অন্তর এই আসর নিয়মিত বসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কখনও আমেরিকায়, কখনও ইউরোপে, কখনও আফ্রিকায়, কখনও এশিয়ায়। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ এই ২টি বিশ্বকাপের আসর বসেনি। প্রত্যেক আসরেই কে হবে চ্যাম্পিয়ন- এই নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে চলে মাতম।

১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিক উরুগুয়ে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৯টি বিশ্বকাপের মধ্যে মাত্র সবোর্চ্চ ৫ বার শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। তাদের পরেই রয়েছে ইতালি, জিতেছে ৪ বার। আর ৩ বার শিরোপা জিতে জার্মানি রয়েছে তাদের পেছনে। উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা জিতেছে ২ বার করে শিরোপা। একবারের তালিকায় ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-স্পেনও নিয়েছেন একবার করে শিরোপা।

১৯৩০-২০১৪ সাল এই সময়ের আঙিনায় বিশ্বকাপ আসর বসেছে ২০ বার। ২০১৪ ব্রাজিলের আসরেটি ২০তম। এর আগে সম্পন্ন হয়েছে উনিশটি আসর। সেই আসরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং আসরের চ্যাম্পিয়নদের কথা আসুন আবারও জেনে নিই-

প্রথম আসর ১৯৩০ : চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে

ফুটবল বিশ্বে এই মুহূর্তে উরুগুয়ের অবস্থান নিয়ে নানা হিসেব-নিকেশ থাকতে পারে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক ফুটবল যাত্রা-আরম্ভের সময় উরুগুয়েই ছিল সবচেয়ে সমীহ জাগানিয়া দল। বিশেষ করে ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালে পরপর দু’টি অলিম্পিকের স্বর্ণজয়ী উরুগুয়ানরা তখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বও পেয়েছিল তারা। প্রথম আসর জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তারা ফাইনালে প্রতিবেশী আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছিল। এই আসরে মাত্র ১৩টি দেশ অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ৪টি ছিল ইউরোপের এবং অন্য ৯টি লাতিন আমেরিকার। ফ্রান্স-মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচে ফরাসি স্ট্রাইকার লুঁসিয়ে লঁরে বিশ্বকাপের প্রথম গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখান। সেই সঙ্গে ফ্রান্স ৪-১ গোলের প্রথম জয় পায়। ফ্রান্স প্রথম ম্যাচ জিতলেও পরের দু’টি ম্যাচ হেরে প্রথমপর্ব থেকেই বিদায় নেয়। আর্জেন্টিনার কাছে ফ্রান্সের ১-০ গোলের পরাজয়টি ছিল বিতর্কিত। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৮৪ মিনিটের সময় ব্রাজিলিয়ান রেফারি খেলার শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন! পরে ফিফা কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ১৫ মিনিট পর খেলা আবার মাঠে গড়ালেও ফ্রান্স পরাজয় এড়াতে পারেনি। ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে পাত্তাই পায়নি ব্রাজিল। বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উরুগুয়ে শিরোপা জেতার পরদিন সমর্থকদের আনন্দ উল্লাস করার সুযোগ করে দিতে দেশটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে পাত্তাই পায়নি আর্জেন্টিনা। তারা ৪-২ ব্যবধানে হারিয়েছে বর্তমানে ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে।

দ্বিতীয় আসর ১৯৩৪ : চ্যাম্পিয়ন ইতালি

১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় আসর বসে ইতালিতে। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলার জন্য রীতিমতো কাড়াকাড়ি শুরু করে বিভিন্ন দেশ। এই সুযোগে ফিফা বাছাইপর্ব চালু করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় ১৬টি দেশকে নিয়ে চূড়ান্তপর্ব আয়োজন করার। ৩২টি দেশ থেকে ২৫টি বাছাই ম্যাচের মাধ্যমে স্বাগতিক বাদে অন্য ১৫টি দল নির্ধারণ করা হয়। প্রথম আসরে ইতালি খেলতে না আসার ‘বদলা’হিসেবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে আসরে অংশ নেয়নি। এই আসরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ইউরোপের স্পেন ও সুইডেনের কাছে পরাজিত হয়ে প্রথমপর্বেই বাদ পড়েছে। টপ ফেভারিট জার্মানি অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়েছে। রোমে ৫০ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচটি পরিণত হয় সেই সময়ের বিখ্যাত দুই গোলরক্ষক জিয়ানপিয়েরো কম্বি ও ফ্লান্টিসেক প্লানিকার দ্বৈরথে। সেখানে ওরসি ও শিয়াতিওর গোলে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্বাগতিক ইতালি।

তৃতীয় আসর ১৯৩৮ : ইতালির শিরোপা অক্ষুণ্ন

ফুটবলের বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের তৃতীয় আসর বসেছিল জুলে রিমের দেশ ফ্রান্সে। এই আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইতালি। এই আসরে আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ের পর মেক্সিকোও শেষ মুহূর্তে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে আসরের জৌলুস অনেকটাই অবনমিত হয়। এই আসরেই এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে খেলার সুযোগ পায় ইন্দোনেশিয়া, যদিও তারা অংশ নিয়েছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ নামে। মোট ১৫টি দেশ অংশ নিয়েছে চূড়ান্তপর্বে। এই আসরেই ব্রাজিলকে নতুনভাবে খুঁজে পেয়েছেন ভক্তরা। আসরে মোট ১৮ ম্যাচের ৮টিতেই হয়েছে কমপক্ষে ৬টি করে গোল! কোয়ার্টার ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়া-ব্রাজিল ম্যাচটিতে মারামারি করে দু’জন আহত হন এবং লাল কার্ড দেখেন তিনজন। দু’দলের মধ্যকার খেলাটি ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকার পর রিপ্লে ম্যাচে ব্রাজিল ২-১ গোলে জয় পায়। ইতালি এবার যোগ্যতম দল হিসেবেই অক্ষুণ্ন রাখে শিরোপা। চ্যাম্পিয়ন কোচ সেই ভিট্টোরিও পোজো এবার রক্ষণাত্মক ফুটবল ছেড়ে নান্দনিক খেলা উপহার দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন। ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ২-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে ইতালি।

চতুর্থ আসর ১৯৫০ : আবার চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। চতুর্থ বিশ্বকাপের জমকালো আয়োজন বসে ব্রাজিলে। অনেক কারণেই ব্যতিক্রমী হয়ে আছে এই বিশ্বকাপ। এই প্রথমবারের মতো স্বাগতিকরা শেষ হাসি হাসতে ব্যর্থ হয়। অভিমান ভুলে ইংল্যান্ড প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে আসলেও ইউরোপিয়ান দলগুলোর অনাগ্রহে দল সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৩টিতে। ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে আর্জেন্টিনা-জার্মানি বাছাইপর্বই খেলেনি। ১৯৪৯ সালের মে মাসে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় তুরিনো ক্লাবের যে ১৭ জন ফুটবলার মারা যান সেখানে ইতালি জাতীয় দলের খেলোয়াড়ই ছিলেন ৮ জন। সেরা তারকাদের হারিয়ে বিশ্বকাপ খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত ভাঙ্গাচোরা দল নিয়েই ব্রাজিল গিয়েছিল ইতালি। আলোচিত-সমালোচিত লিগ পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত ওই আসরে ফাইনাল ম্যাচ বলে কিছু ছিল না! পয়েন্ট টেবিল বিবেচনায় বিশ্বকাপ আসরের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে উরুগুয়ে। এটা ছিল তাদের দ্বিতীয় শিরোপা।

পঞ্চম আসর ১৯৫৪ : পশ্চিম জার্মানির উত্থান

১৯৫৪ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায় সুইজারল্যান্ড। এবারই প্রথম টেলিভিশনে সরাসরি খেলা সম্প্রচার শুরু হয়। ফলে ফুটবল রোমাঞ্চে বিশ্ববাসীও শামিল হতে পারে। ৩৮টি দলের মধ্যে বাছাইপর্বের গণ্ডি টপকে মূলপর্বে খেলে ১৬টি দেশ। এই আসরে ফেরেঙ্ক পুসকাস, নান্দর হিদেকুটি, জোসেফ বোসিক, স্যান্ডর ককসিস ও জোলতান জিবোরের মতো সুপারস্টারদের নিয়ে গড়া হাঙ্গেরিয়ান দলটি ছিল এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। এবারও আর্জেন্টিনা অভিমান করে অংশ নেয়নি। ফলে আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো কালজয়ী তারকার নৈপুণ্য দেখা থেকে বঞ্চিত হয় বিশ্বকাপ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ০-৩ গোলে পিছিয়ে থেকেও সুইজারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত জয় পায় ৭-৫ গোলে। ওই ম্যাচে দুই খেলোয়াড়ের হ্যাটট্রিক হয়েছে। বিশ্বকাপে এক খেলায় সর্বাধিক গোলের রেকর্ড হিসেবে এই ম্যাচটি অম্লান রয়েছে। বিস্ময়করভাবে ওই আসরের ম্যাচপ্রতি গড়ে ৫.৩৮ হারে গোল হয়েছে। আসরে চমক দেখিয়ে শিরোপা জয় করে জার্মানরা। প্রথমপর্বে ৮-৩ গোলে পরাজয়ের নির্মম প্রতিশোধ নিয়ে পশ্চিম জার্মানি ফাইনালে হারায় হাঙ্গেরিকেই! অথচ ব্রাজিল উরুগুয়ে ও হাঙ্গেরির কাছে পাত্তাই পায়নি। ফাইনালে জার্মানি ৩-২ গোলে ব্যবধানে হারিয়েছে আসরের অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরিকে।

৬ষ্ঠ আসর ১৯৫৮ : ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন

১৯৫৮ সালে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় শৈত্যবহুল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেনে। তার আগেই পরপারে পাড়ি জমান বিশ্বকাপের স্বপ্নদ্রষ্টা ফিফা সভাপতি জুলে রিমে। মূল আসরে দল ১৬টি থাকলেও বাছাইপর্বে অংশগ্রহণকারী সংখ্যা অর্ধশত (৫৩টি) ছাড়িয়ে যায়। তবে ইতালি, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, উরুগুয়ে ও বেলজিয়ামের মতো দলগুলোর বাছাইপর্বে টপকাতে না পারা ছিল বিস্ময়ের! সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে। দলটির দুনিয়া কাঁপানো গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের উত্থানের আসরও ছিল এটি। এই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল! তাদের সাফল্যের মূল নায়ক পেলে। সঙ্গে ডিডি, স্যান্তোস, জাগালো ও গ্যারিঞ্চার মতো ফুটবলাররাও ছিলেন। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় স্বাগতিক সুইডেন। সুইডেন খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত হন রাজা গুস্তাভো অ্যাডোলফ। ৪ মিনিটের মাথায় সুইডেন এগিয়ে গিয়েছে, কিন্তু তখনও বাকি ছিল অনেক কিছুই। ভাভা, পেলের এবং জাগালোর মিলিয়ে ৫-২ গোলে জয় পায় ব্রাজিল। এই আসরেই পেলের আবিষ্কার হয়েছে।

৭ম আসর ১৯৬২ : আবারও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন

আসর বসেছিল লাতিনের গরিব রাষ্ট্র চিলিতে। যদিও আর্জেন্টিনা ও জার্মানি আয়োজক হওয়া বায়না ধরেছিল, কিন্তু চিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কার্লোস ডিটবর্নের যুক্তির কাছে হার মানে তারা। একপর্যায়ে রেকর্ড ৯.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের মুখেও পড়ে দেশটি। তারপরও তারা সাহস হারাননি। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে চিলি সফল এক বিশ্বকাপ আয়োজন করে সকলের মন জয় করে নেয়। গ্রুপপর্বে চিলি ও ইতালির মধ্যকার ম্যাচটি হানাহানির কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই আসরে এক ম্যাচ খেলেই কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে ইনজুরির কারণে পুরো আসরেই বনে যান দর্শক! আর্জেন্টিনার হয়ে সুযোগ না পাওয়া আলফ্রেডো ডি স্টেফানো স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসে চোটের কারণে একটা ম্যাচেও মাঠে নামতে পারেননি। ব্রাজিল কোনো ম্যাচ না হেরেই ফাইনালে উঠে। সেমিফাইনালে স্বাগতিক চিলি এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কঠিন বাধা টপকাতে হয়েছে ব্রাজিলকে। পাশাপাশি চেকোস্লোভাকিয়াও ছিল অপরাজিত। ফাইনালে চেকরা প্রথমে গোল করলেও পরে এমারিলডো, জিটো ও ভাবার গোলে পরাজিত হয় ৩-১ গোলে।

৮ম আসর ১৯৬৬ : চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড

অষ্টম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল জন্মভূমি ইংল্যান্ডে। নিজ দেশে আয়োজিত আসরটি ইংলিশরা স্মরণীয় করে রাখে শিরোপা জয়ের মাধ্যমে। দুই বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ১-০ তে হারিয়ে উত্তর কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চারিদিকে হৈ চৈ ফেলে দেয়। বিস্ময়করভাবে দুই বারের চ্যাম্পিয়ন তারকাসমৃদ্ধ ব্রাজিলের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেওয়া! প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ান ডিফেন্ডারদের বাজে ট্যাকলের শিকার হয়ে ইনজুরির কারণে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে পারেননি পেলে। ‘বাঁচা-মরার’পরের খেলায় পর্তুগালের বিপক্ষে নামলেও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নিষ্ঠুরতায় অসহ্য মার খেয়ে অসহায় পেলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমি আর কখনই বিশ্বকাপ খেলব না!’কোয়ার্টার ফাইনালে এলোপাথাড়ি ফাউল করে ইংল্যান্ডকে ঠেকানোর কৌশল নিয়েও ১-০ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড-পশ্চিম জার্মানি। ১২ মিনিটে হেলমুট হেলারের গোলে জার্মানরা এগিয়ে গেলেও হার্স্টের লক্ষ্যভেদে দ্রুতই সমতা ফেরে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয়ার্ধের ৭৮ মিনিটে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন মার্টিন পিটার্স। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার কয়েক মুহূর্ত আগে ওয়েবারের নিশানা ওয়েম্বলির দর্শকদের হৃদয় ভেঙে দেয়। অতিরিক্ত সময়ের খেলায় আবারও গোল করে বসেন হার্স্ট। কিন্তু তার শর্ট নেওয়া বলটি গোলবারে লেগে নিচে পড়ে আসলেই গোল লাইন অতিক্রম করেছিল কিনা, এই নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের শেষ নেই! বিতর্কিত এই গোলের পর শেষ সময়ে আরেকটি গোল করে জিওফ হার্স্ট হয়ে যান বিশ্বকাপ ফাইনালে এখন পর্যন্ত হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার!

নবম আসর ১৯৭০ : ব্রাজিলের হ্যাটট্রিক

অভিমান ভেঙে পেলে জীবনের সেরা খেলাটা খেলেছেন এই আসরে। তার কল্যাণেই ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাশ শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল! এটা তো শুধুই একটি শিরোপা জয় নয়, ছিল হ্যাটট্রিক শিরোপাও। বিশ্বকাপজয়ী পেলে-জোয়ারজিনহো-টোস্টাওদের ব্রাজিল পেয়ে গেছে সর্বকালের সেরা ক্রীড়া দলের স্বীকৃতি। ফাইনালে দুই বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৪-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে পেলের ব্রাজিল। এই আসর থেকেই পেলে বিশ্বকাপকে গুডবাই জানিয়েছেন। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, তিনবার বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিলকে স্থায়ীভাবে ট্রফিটি দিয়ে দেওয়া হয়! পরে ফিফা ওই নিয়মে পরিবর্তন আনে। মধ্য আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে আয়োজিত আসরে খেলেছে ১৬টি দেশ। আর্জেন্টিনা ও আগের আসরের চমক পর্তুগাল বাছাইপর্বই উৎরাতে পারেনি! এই আসরে জার্মানির ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ারের খেলা নজর কাড়ে সবার। তবে গোল সংখ্যায় সবাইকে টেক্কা দেন গার্ড মুলার। পশ্চিম জার্মানির এই স্ট্রাইকার ৬ ম্যাচে দু’টি হ্যাটট্রিকসহ করেন ১০ গোল!

দশম আসর ১৯৭৪ : আবারও জার্মানি চ্যাম্পিয়ন

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত এই আসরেই প্রথম ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়। এই নিয়ে বাধে বেজায় হৈ চৈ। ফেভারিট হিসেবেই ফাইনালে খেলে পশ্চিম জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। সব ঘাট মাড়িয়ে ডাচদের ২-১ গোলে হারিয়ে ঠিক ২০ বছর পর শিরোপা পুনরুদ্ধার করে জার্মানরা। আগের জুলে রিমে ট্রফি ব্রাজিল নিয়ে যাওয়ায় ইতালির শিল্পী সিলভিও গ্যাজানিগার নিপুন নকশায় গড়া সোনার নতুন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে পায় স্বাগতিকরা। পশ্চিম জার্মানির নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। সঙ্গে শেপ মেয়ারের মতো দক্ষ গোলরক্ষক ও গার্ড মুলারের মতো গোলমেশিন থাকায় সব দিক থেকেই ব্যালেন্সড দল ছিল স্বাগতিকরা। অন্যদিকে আসরের সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা পাওয়া ইয়োহান ক্রুয়েফের নেতৃত্বে ডাচদের স্কোয়াডে সে রকম তারকা ছিল না। ছিল টোটাল ফুটবল উপহার দেওয়ার মতো এক ঝাঁক তারুণ্যের সমাহার। তবুও মিউনিখের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে দুই দলের মধ্যকার ফাইনালটা হয় প্রাণবন্ত। আসরে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, স্পেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো আটকে যায় বাছাইপর্বেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভক্ত দুই জার্মানি একই সঙ্গে খেলে বিশ্বকাপ। গ্রুপপর্বে সেরা অঘটন ঘটিয়ে পূর্ব জার্মানি হারিয়ে দেয় পশ্চিম জার্মানিকে!

একাদশ আসর ১৯৭৮ : আর্জেন্টিনা শিরোপা

প্রথম বিশ্বকাপেই শিরোপার কাছে মাত্র এক ম্যাচের দূরত্বে চলে এসেছিল আর্জেন্টিনা। সেই একটি মাত্র ম্যাচের দূরত্ব ঘোচাতে লাগল ৪৮ বছর। ১৯৭৮ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত একাদশ বিশ্বকাপ পর শিরোপা জিতে দীর্ঘদিনের অতৃপ্তি ঘোচায় আর্জেন্টিনা। সেই সাথে নিজেদের দাঁড় করায় ফুটবলের আরেক পরাশক্তি হিসেবে।

এই বিশ্বকাপে নিয়ে আর্জেন্টিনারাও অত বেশি আশাবাদী ছিল না। কারণ তাদের প্রিয় খেলোয়াড় বিস্ময়বালক ডিয়োগো ম্যারাডোনাকে যে দলে নেননি কোচ লুই সিজার মেনেত্তি। বয়স কমের অজুহাতে ১৮ বছরের ম্যারাডোনাকে না নেওয়াতে কোচের ওপর দারুণ খেপেছিল সমর্থকরা। বিশ্বকাপ জয় শেষে এই কোচই অবশ্য জাতীয় বীর। ম্যারাডোনা নেই, তাতে কি হয়েছে? আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ তো জিতেয়েছেন তিনি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা নির্ধারিত সময়ে নেদারল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে অমীমাংসিতভাবে খেলা শেষ করে। ফলে ম্যাচ চলে যায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ে ক্যাম্পোসের আরেকটি গোলের সাথে সাথেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। এই আসরেও ১৬টি দল অংশ নিয়েছে।

দ্বাদশ আসর ১৯৮২ : ইতালির শিরোপা

এই আসরে আমুল বদলে যায় বিশ্বকাপের চেহারা! দল সংখ্যা ১৬ থেকে ২৪-এ উন্নীত হয়। ইউরোপ থেকে ১০টি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৩টি, আফ্রিকা থেকে ২টি, এশিয়া ও ওশেনিয়া থেকে ২টি এবং কনকাকাফ থেকে ২টি দল চূড়ান্তপর্বে কোয়ালিফাই করে। ১৯৮২ সালে দ্বাদশ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া স্পেনের ১৭টি ভেন্যুতে মাঠে গড়ায় ৫২টি ম্যাচ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন তারুণ্য নির্ভর ইতালি ৪৪ বছর পর লাভ করে তৃতীয় শিরোপা। অথচ প্রথম রাউন্ডে তিন ড্রয়ে কোনোক্রমে ৩ পয়েন্ট পাওয়া ‘আজ্জুরিরা’আরেকটু হলে বাদই পড়ে যেত! ইতালিয়ানরা দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর সেমিফাইনালে পোল্যান্ড এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়েছে। আসরে ফেভারিট বিবেচিত হয়েছিল সক্রেটিস, জিকো ও ফ্যালকাওদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ‘ড্রিম টিম’ব্রাজিল, কিন্তু তারা দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়ে। প্লাতিনি এবং ম্যারাডোনা এই আসরে খেললেও আলো ছড়াতে পারেনি। অখ্যাত আলজেরিয়া পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করে। আগের দুই আসরের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডসের মূলপর্বে খেলার যোগ্য পেতে ব্যর্থ হওয়া ছিল বিস্ময়কর ঘটনা।

ত্রয়োদশ আসর ১৯৮৬ : ম্যারাডোনাময় শিরোপা

এই আসরটি ছিল একান্তই দিয়োগো ম্যারাডোনার। তার অবিস্মরণীয় জাদুকরী নৈপুণ্যে উদ্ভাসিত একটি আসর। ম্যারাডোনার অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে চমক দেখায় আর্জেন্টিনা। অথচ আসরে ব্রাজিলের জিকো ও সক্রেটিস, ফ্রান্সের প্লাতিনি, জার্মানির রুমেনিগো, ইতালির রসি, বেলজিয়ামের অ্যাঞ্জে শিফো ও ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকারের মতো এক ঝাঁক তারকার অভাব ছিল না। আগের আসরের মতো ২৪ দলের বিশ্বকাপের ফরম্যাটে খানিকটা পরিবর্তন এনে দ্বিতীয় রাউন্ডে নকআউট পর্ব এবং তারপর কোয়ার্টার ফাইনাল যুক্ত করা হয়। সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে বিদায় করে দেওয়া ফ্রান্স। চমক দেখানো বেলজিয়াম সেমিফাইনালে হারে ম্যারাডোনার জোড়া গোলে। ফাইনালে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়েছে জার্মানি। ম্যারাডোনা একক কারিশমায় আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোলের করার ঘটনাটিও এই আসরের আলোচিত বিয়ষবস্তু। আবার নিজেদের প্রান্তের ডান দিক থেকে ম্যারাডোনা বল পেয়ে একে একে পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, গ্যারি স্টিভেন্স, টেরি বুচার ও টেরি ফেনউইককে কাটানোর পর গোলকিপার পিটার শিল্টনকেও ঠাণ্ডা মাথায় পরাস্ত করার ঘটনাও ঘটে এই আসরে। এই গোলটি সর্বকালের সেরা গোল হিসেবে মনে করা হয়। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মোট করেন ৫টি গোল, ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট পেয়েছেন ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার।

চর্তুদশ আসর ১৯৯০ : জার্মানির হ্যাটট্রিক

বিরক্তিকর আসর বলতে ১৯৯০ বিশ্বকাপ এখনও রেকর্ডবুকে। কারণ ম্যাচপ্রতি মাত্র ২.২১ গোল, লাল কার্ড সর্বোচ্চ ১৬টি ও হলুদ কার্ড ১৬৪টি। এতে করে গতির খেলা ফুটবলে বেশ ভাটা পড়ে। আয়োজক ইতালির দৌড় থেমে যায় সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে। ইতালি সালভাটর শিলাচি ৬ গোল করে হন সর্বোচ্চ গোলদাতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি প্রত্যেকটি গোলই করেন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে! টানা তৃতীয়বারে মতো ফাইনালে খেলে আগের দুই আসরের হতাশার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তৃতীয় শিরোপা জিতে নেয় পশ্চিম জার্মানি। রোমে অনুষ্ঠিত ফাইনালে কার্ড সমস্যার কারণে ক্যানিজিয়া, ওলার্তি কোয়েচিয়া ও জিউস্তির মতো পরীক্ষিত যোদ্ধারা খেলতে না পারলেও দারুণ ফাইট দিয়েছে আর্জেন্টিনা, কিন্তু ৮৫ মিনিটে রুডি ফোলারকে ফাউল করার অপরাধে পশ্চিম জার্মানিকে পেনাল্টি দিয়ে দেন মেক্সিকান রেফারি কোডেসাল। ওই এক গোলের ব্যবধানেই জয় পেয়েছে জার্মানি। এটা ছিল তাদের তৃতীয় শিরোপা। রুড খুলিত, মার্কো ফন বাস্তেন ও ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডদের মতো সুপারস্টারদের নিয়ে গড়া দল নেদারল্যান্ডস ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু ডাচরা দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘জার্মান যন্ত্রের’সামনে পড়ে আর টিকতে পারেনি।

পঞ্চদশ আসর ১৯৯৪ : ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা

আয়োজনের মুন্সিয়ানায় দেখিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই আসর থেকেই বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রচলন শুরু হয়। অবশ্য দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের কাছে হেওে বিদায় নেয় স্বাগতিকরা। ২৪ বছর পর ব্রাজিল শিরোপা জিতে নেয়। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ইতালি। প্রথম দল হিসেবে চতুর্থ ট্রফি জয়ের রেকর্ডও গড়ে ব্রাজিল। নতুন নিয়মে প্রবেশ করে ফুটবল। প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি টপকাতে পারেনি রাশিয়া। তারপরও দলটির স্ট্রাইকার ওলেগ সালেঙ্কো ৬টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন! সালেঙ্কো ক্যামেরুনের বিপক্ষে ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ একাই করেন ৫ গোল, যা বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড! ওই খেলাতেই একমাত্র গোল করে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা হিসেবে রেকর্ডের পাতায় নাম লেখান ক্যামেরুনের রজার মিলা! বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টইচকভ এই আসরে আলো ছড়িয়েছেন। তার নৈপুণ্যে দলটি সেমিফাইনালে ইতালির কাছে হারলেও সবার প্রশংসা পায়। ডোপ টেস্টে মূত্র নমুনায় নিষিদ্ধ এফিড্রিন পাওয়া গেলে সাসপেন্ড করা হয় ম্যারাডোনাকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে নানা বির্তক রয়েছে। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়েও গোলশূন্য ড্র থাকলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে নিষ্পত্তি হয়। পেনাল্টি শ্যুটআউটে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতে ব্রাজিল জয় করে চতুর্থ বিশ্বকাপ।

১৬তম আসর ১৯৯৮ : জিদানের ফ্রান্সের শিরোপা

আগের দুই আসরের চূড়ান্তপর্বেই খেলতে ব্যর্থ হওয়া ফরাসিরা। স্বাগতিক হওয়ার সুযোগে সেই বৈতরণী পেরুনোর প্রয়োজন হয়নি। সঙ্গে ৬০ বছর পর নিজ দেশে আয়োজিত আসরে ট্রফি জিতে প্রয়াত জুলে রিমের আত্মার প্রতি সম্মান জানায়। ফ্রান্সের এই উত্থানের মহানায়কের নাম জিনেদিন জিদান। সঙ্গে বার্থেজ, দেশম, অঁরি, ডুগারি, ব্লাঁ, থুরামও ছিলেন। ফাইনালে তারা সে পর্যন্ত সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। ফাইনালে ব্রাজিলকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ৩-০ গোলের ব্যবধান জয় তুলে নেয় স্বাগতিক ফ্রান্স। ১৭০টি দেশের মধ্যকার বাছাইপর্ব শেষে ৩২টি দল চূড়ান্তপর্বে অংশ নিয়েছে। আসরে জায়ান্ট-কিলার ক্রোয়েশিয়া জার্মানির মতো দলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। দলটির স্ট্রাইকার ডেভর সুকেরের ৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়াও ছিল বিশেষ কিছু। উপর্যুপরি দু’টি বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন গ্যাব্রিয়েলা বাতিস্তুতা। সেমিফাইনালে লিলিয়াম থুরামের জোড়া গোলে ক্রোয়েশিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আর ফাইনালে তো রোনালদো, বেবেতো, রবার্তো কার্লোস, দুঙ্গা, ডেনিলসন, লিওনার্দো ও তাফারেলদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলকে মাঠের খেলায় হলুদ জার্সি ছাড়া চেনাই যায়নি! ওই তারকার হাট এক জিদানেই হুমরি খেয়ে পড়েছে। জিদান নিজের ২ গোলের সঙ্গে আরেবটি। সব মিলিয়ে ৩-০ গোলের ব্যবধান ছিল ফাইনালে।

১৭তম আসর ২০০২ : ব্রাজিলের পেন্টা শিরোপা জয়

প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে এশিয়া মহাদেশ। ১৭তম আসরটি যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান আয়োজন করে। এর আগে কখনই যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন হয়নি। বহুল আলোচিত কোচ লুই ফিলিপ স্কলারি নিজের মন মতো দল গড়ে শেষ পর্যন্ত ঠিকই চ্যাম্পিয়ন করান ব্রাজিলকে। ফাইনালে রোনালদোর জোড়া গোলে পাত্তাই পায়নি জার্মানি। আসরে ৮টি গোল করে ‘সোনার জুতা’ছিনিয়ে নেন আগের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইনজুরিতে পড়ে দিকভ্রান্ত হওয়া রোনালদো! সঙ্গে ৩টি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার রেকর্ড গড়েন ব্রাজিলের কাফু। অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে আসরের সেরা ফুটবলারের খেতাব গোল্ডেন বল জিতে নেন জার্মানির গোলরক্ষক অলিভার কান! আসরে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফেভারিট ফ্রান্সের কোনো ম্যাচ না জিতেই প্রথমপর্ব থেকে বিদায়! আর্জেন্টিনার মতো জনপ্রিয় দলও ছিটকে পড়ে গ্রুপপর্ব থেকেই!

১৮তম আসর ২০০৬ : চ্যাম্পিয়ন ইতালি

পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ার পর একীভূত জার্মানি পায় ২০০৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব। সেবার শিরোপা জিতলেও এবার স্বাগতিকরা তৃতীয় স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স এবং ইতালি। ফাইনাল গড়ায় টাইব্রেকারে। ইতালি ২৪ বছর পর জিতে নেয় নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ। ৭ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন জিদান। তা মাতেরাজ্জি পরিশোধ করে দেন ১৯ মিনিটেই। এরপর বাকি সময়ে এবং অতিরিক্ত সময় আর কোনো গোল হয়নি। ফেভারিট না হয়েও কৌশলী ফুটবলের কল্যাণে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইতালি! আসরে অংশ নিয়েছে ৩২টি দল। ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্বাগতিক বাদে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলকেও বাছাইপর্ব খেলে আসতে হয়েছে। এবার ৩টি গোলের সুবাদে তিন আসরে সব মিলিয়ে ১৫টি গোল করে রোনালদো ভেঙে দেন জার্মানির গার্ড মুলারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৪ গোলের রেকর্ড। আসরে জিদান মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুঁতা মেরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেন। অতিরিক্ত সময়ে ১১০ মিনিটের সময় হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে ফেলে মাতেরাজ্জিকে ষাঁড়ের মতো ঢুঁশ মেরেছেন। হত-বিহ্বল রেফারি জিমানকে লালকার্ড দেখিয়েছেন। বিষয়টি ফুটবলপ্রেমীদের খুবই আহত করেছে। জিদান নিজের ওই অনভিপ্রেত কাণ্ড সম্পর্কে বলেছেন, ‘মাতেরাজ্জি আমার মা-বোনকে নিয়ে বাজে কথা বলেছে।’

১৯তম আসর ২০১০ : স্প্যানিশ সৌরভ

২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আসর বসে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ধারাবাহিক ঐতিহ্য ভেঙে ফাইনালে উঠে স্পেন-নেদারল্যান্ডস। ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপের রানার্স-আপ নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। ইউরো জেতা স্প্যানিশরা ফেভারিট হিসেবেই শৈল্পিক ফুটবল উপহার দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যদিও স্প্যানিশ যাত্রা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে ১-০ গোলে হেরে। সেমিফাইনালে জার্মানিকে পরাজিত করে। স্পেনে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ, জেরার্ড পিকে, সার্জিও বুসকেটস, পেদ্রো ও টোরেসের মতো এক ঝাঁক তারকা স্পেনকে নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠত করে। বিশ্বকাপের রোল অব অনারে নাম লেখানোর মিশনে স্প্যানিশ শিল্পকলার উৎকর্ষের ‘নেপথ্য নায়ক’ছিলেন বর্ষীয়ান কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক। রানার্স-আপ নেদারল্যান্ডসের রবেন, স্লাইডার, ফন পার্সি ও কুইটদের মতো তারকারা তীরে এসে তরী ডুবিয়েছেন। প্রথম ও ১৯৫০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ফুটবলের ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত হওয়ার পর এই আসরে আবার আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠে জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় হয়। উরুগুয়ের ডিয়োগো ফোরলান ৫ গোলের পাশাপাশি আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান, কাড়েন নজরও।

ঢাকা, ১৩ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ